গণঅভ্যুত্থান
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৫৯ পিএম
দীর্ঘ শাসনে সবাইকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন শেখ হাসিনা। তার সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আর রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বাইরে অন্য সব দল সরকারবিরোধী অবস্থানে চলে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র ও জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশজুড়ে অশান্তির পর প্রধানমন্ত্রী পদ এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ছাত্র-জনতা-মেহনতি মানুষের অভ্যুত্থানের মুখে ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এ বছর এক বছর পূর্ণ হলো। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয় এই দিন। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঐতিহাসিক এ পটপরিবর্তনের দগদগে স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বাস্তবে কার্যত একটি ‘একনায়কতান্ত্রিক’ সরকারে পরিণত হয়েছিল। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে বাস্তবিক অর্থে আর কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। এই সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের দুটি হয়েছে অনেকটা একতরফা নির্বাচন। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনটি হয়েছে একেবারেই আমি-তুমি-ডামি নির্বাচন। জনগণের ভোটাধিকারের কফিনে শেষ পেরেক মারা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের গত ১৫ বছরে মানুষ আসলে ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার বা মতামত জানানোর কোনো অধিকার পায়নি।
১৫ বছরে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের আমলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, বিরোধী গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমেও বিরুদ্ধ মত দমন করা হয়েছে কঠোর হাতে। বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, দখল নেওয়া হয়েছে অথবা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে। বাংলাদেশে গত বহু বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমেও শেখ হাসিনা বা শেখ মুজিববিরোধী বক্তব্য পোস্ট করার জের ধরে মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই দমনের জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো আইন করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনার সরকার ও পুলিশ বাহিনী মিলে পুরো দেশকে একটা ‘মাফিয়া স্টেট’ তৈরি করেছিল। আর এসবের জন্য সবসময়েই সরকারি প্রশাসন যন্ত্র, পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনী এমনকি বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা হয়েছে।
১ আগস্ট থেকে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত দেশবাসীর মতো আমাকেও থাকতে হয়েছিল দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মাঝে। নিজে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সরকারি বাহিনী ও সরকারি দলের সমর্থকদের হুমকির মুখে ছিলাম, ঠিক তেমনই একজন পিতা হিসেবেও সর্বক্ষণ এক আতঙ্কের মাঝে প্রতিটি সময় পার করতে হয়েছে। জ্যেষ্ঠপুত্র গোলাম মোস্তকিন ভুইয়া মাহিন ও একমাত্র কন্যা সুমাইয়া ভুইয়া মাহিমা দুজনই ছাত্র অভ্যুত্থানের সাধারণ কর্মী হিসেবে মাঠে অবস্থান করছিল। ফলে আহত হচ্ছে আমার সন্তানের মতো অন্য সন্তানরাও। সে এক শাসরুদ্ধকর অবস্থা। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা এরই মাঝে অন্য বাবা-মায়ের মতো করে নিজ সন্তানদের জন্য চিন্তা করা। তখন পরিস্থিতিটা এমনই ছিল নিজের সন্তানদেরও আন্দোলনে যেতে বাধা দেওয়ার মতো নৈতিক অবস্থান ছিল না কোনো বাবা-মায়েরই। মাহিন-মাহিমার প্রশ্ন ছিল বাবা আমার ভাইবোন, সহযোদ্ধারা মাঠে আমরা তো ঘরে থাকতে পারি না। অন্যদিকে আমাদের আরেক রাজনৈতিক সহকর্মী মিতা রহমানও ছিলেন একইভাবে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়। কারণ তার একমাত্র ছেলে মির্জা রাফিউ আহমেদও ঘর থেকে বের হয়ে আন্দোলনে।
৪ আগস্ট গভীর রাতে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানির সঙ্গে। তিনি অনেকটা নিশ্চিভাবেই বললেন সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী। এই ফ্যাসিবাদী সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে পারবে না। তিনি কারাবন্দি এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, সিনিয়র সহকারী সদস্য সচিব এবিএম খালিদ হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদাসহ বিরোধী দলের নেতাদের খোঁজখবর নেন। ৫ আগস্ট সকালেও সরকারের পেটোয়া বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হামলা অব্যাহত রাখে। এ সময় খবর আসে আমার ছেলে ছররা গুলিতে আহত। খুব চিন্তিত হয়ে যখন চোখ দিয়ে অশ্রু বের হচ্ছে ঠিক তখনই খবর আসে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করছেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ঢেউয়ে রাজপথ যেন জনতার স্রোতে পরিণত হয়। সবার চোখেমুখে সে কী আনন্দ! আমার চোখের অশ্রু তখন আনন্দ নাকি বেদনার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল।
ইতিহাসে লেখা হলো, ৫ আগস্ট ২০২৪, শেখ হাসিনার পতন। সঙ্গে একটি নতুন বাংলাদেশের সূচনা। অনেকের জন্য এটা ছিল নতুন আশা, নতুন শুরু আর পুনর্গঠনের সুযোগ। তবে দিনটি একই সঙ্গে অন্য কিছুরও সূচনা করেছিলÑ বিশৃঙ্খলা। প্রতিটি সূচনার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজস্ব একটি ঝড় আসে। অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার জয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও হাসিনা ও তার পরিবার পিছিয়ে থাকতে রাজি হয়নি। পুরো শেখ পরিবার দেশ ছাড়লেও বারবার হয়েছেন সংবাদের শিরোনাম। দেশের বাইরে থেকেও তৈরি করেছেন বিশৃঙ্খলার ঘূর্ণিঝড়। রহস্যময় ফোনকল, উদ্ভট অভিযোগ, রাজনৈতিক নাটকীয়তা এবং ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা! কী ছিল না গত এক বছরে?
শোনা যায়, দেশ ছাড়ার আগে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রেকর্ড করার অনুমতি চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এদিন বেলা আড়াইটার দিকে গণভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ‘নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে’ পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এ সময় সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষিপ্ত জনতা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করে। পুরো গণভবনকে একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। ৭৬ বছর বয়সি শেখ হাসিনা, যিনি ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। সোমবার (৫ আগস্ট) জনগণের রোষানলে পড়ে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে ভারতে আশ্রয় নেন। এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিরল এবং অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
একসময় শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানও জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। আর সেখানে তিনি পৌঁছেছিলেন ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই। ইতিহাসে এ রকম দৃষ্টান্ত বিরল; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এমন পরিবর্তন হলো, যেটা অনেকেই ভাবতে পারেননি। শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা একেবারে শূন্যের কোঠায় চলে আসে। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো পাঁচ দশক পরেÑ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। মোসাহেব ও মৌলভীদের দ্বারা ঘেরা শেখ হাসিনা ভেবেছিলেন দিন এভাবেই যাবে। কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কী ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটা সম্ভবত ২৪ ঘণ্টা আগেও তিনি বুঝতে পারেননি।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ থেকে গণঅভ্যুত্থানে জুলাই মাসজুড়ে আন্দোলন ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে প্রবল জনরোষের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ভারতের দিল্লিতে পালিয়ে যান। তার পতনের দিন ঢাকাসহ সারা দেশে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং আনন্দ প্রকাশ করে।
শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদেরই কেউ কেউ মনে করছেন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে নিজের এত দিনের রাজনৈতিক অর্জন ধ্বংস করলেন। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বকেও হুমকিতে ফেলেছেন। ৫ আগস্ট এটাই প্রমাণ করেছে যে, কোনো স্বৈরাচারী শাসনই শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছার কাছে পরাজিত হয়, হতে বাধ্য হয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন রূপ নেয় একটি পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে, যা দীর্ঘদিনের একটি স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। যদিও আন্দোলনের পথ রক্তাক্ত ছিল, তবুও এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনাকে নতুন করে জাগ্রত করেছে।