পর্যবেক্ষণ
জিবলু রহমান
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৫ ১১:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
কারসাজি করে টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা হাসিনা রেজিম যত অন্যায়, অনাচার ও অপরাধ করেছে তার জন্য মানবতা ও ইতিহাসের কাছে তাদেরকে দায়ী থাকতেই হবে। ন্যায়বিচারে নির্ধারিত উপযুক্ত সাজার মাধ্যমেই কেবল এ দায় শোধ করা সম্ভব। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হোন শেখ হাসিনা। প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীও হোন তিনি। মাথায় কালো পট্টি পরা সেই সময়কার বিভিন্ন ছবিতে তাকে মনে হয়েছিল ইসলামের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো কাজ তার হাতে আর হবে না। পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে। সেনা-সমর্থিত ১/১১ সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের কারসাজির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর হাসিনা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। শুরু করেন বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন। সেই সঙ্গে ক্ষমতাও দীর্ঘায়িত করতে থাকেন, যার স্থায়িত্বকাল দেড় দশক।
শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ মনে করেছিল, তাদের দল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই এবং তাদের বিশ্বাস ছিল এই রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকাটা তাদের ঐতিহাসিক অধিকার। যখন একজন সরকারপ্রধান মনে করেন যে সেই রাষ্ট্রের জনগণের জনমতের ভিত্তিতে নয় বরং অধিকারের বলে তিনি ক্ষমতায় আছেন এবং এই জোর করে টিকে থাকাকে তারা সবার বিরুদ্ধে একটা অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত করেন, তখন সেই রাষ্ট্রে শোষণ-নিষ্পেষণ নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায় এবং তা-ই হয়েছিল। নিজেদের পক্ষে আওয়ামী লীগের যুক্তি ছিলÑ ‘রাজনৈতিক স্বার্থে নয় বরং আমরা যা করার তা দেশের স্বার্থে করছি।’
চেচেন গেরিলাদের হত্যা করার সময় রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন বলেছিলেন- ‘পাগলা কুকুরকে গুলি করে মারতেই হয়’। সেই বিশ্বাস থেকেই তখন রাশিয়ায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছিল। সেই পথ ধরে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার মানুষকে কুকুরের মতো গুলি করেই শেষ হয়নি বরং দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ, হত্যা, গুম, কুরআন-হাদিস পোড়ানো, ইসলামকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো অসংখ্য অপরাধ করেছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে হাসিনা সংবিধান সংশোধন করেন। অবসান ঘটান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার। অথচ বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি এ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিলেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থার অনুপস্থিতি দেশে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তার কর্তৃত্ববাদী আচরণ বাধাহীনভাবে অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দেয়।
হাসিনার কর্তৃত্ববাদী আচরণ বিরোধীদের দমন করা থেকে এতটুকু দমায়নি তাকে। একপর্যায়ে শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সাজানো দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি করেন। তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুর্বল করার চেষ্টা করা হয় বিএনপিকে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি সংগঠিত থাকে।
শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবকে ‘দেবতাতুল্য’ করে তোলার চেষ্টা ত্বরান্বিত করেন এবং এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে সরকারের সমালোচনা সহ্য করা হয়নি। ১৫ বছরের শেখ হাসিনার শাসনামল বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রাষ্ট্র থেকে আইনের শাসন উচ্ছেদ করে আওয়ামী লীগ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদেরকে দলীয় কর্মী বানাতে চেষ্টা করে অনেকটা সফলও হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং দলগত স্বার্থে ব্যবহারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা ছিলেন বিরল। অর্থনীতি-রাজনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি সর্বত্র হাসিনার আগ্রাসী স্বৈরতন্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো।
কোনো প্রতারক রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে তার সন্তানদেরও প্রতারক বানায়, তার উদাহরণ শেখ হাসিনা। কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ঢাকার পূর্বাচলে নিজের সন্তান এবং আত্মীয়স্বজনদের প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। শেখ হাসিনা পতনের দিন অবধি বাংলাদেশের এমন একজন ‘স্বৈরাচারী’ শাসক ছিলেন, যিনি নিজেকে এবং তার আত্মীয়স্বজনদের সমৃদ্ধ ও সুবিধা দিতে ভুলতেন না। হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ভার্জিনিয়ার একজন ‘উদ্যোক্তা’। এমনকি জয় শেখ হাসিনার ‘প্রযুক্তি উপদেষ্টা’ হিসেবে পতনের দিন অবধি কাজ করেছেন। হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটেনের লেবার পার্টির এমপি। তিনি এর আগে থেকেই হাসিনার আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং নানা সুবিধা নেন।
দীর্ঘ দুঃশাসন যে জনরোষ তৈরি করেছিল তা থেকে বাঁচার জন্য হাসিনা একমাত্র উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ব্যাপক হারে দমনপীড়নকে। প্রশাসনকে দলীয়করণ, পুলিশকে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে পরিণত, র্যাবকে ভিন্নমত দমনের নামে নিষ্ঠুর সংস্থায় অধপতিত করা এবং সামরিক বাহিনী ও সুশীল সমাজকে ভোঁতা বানিয়ে, টাকাওয়ালা গোষ্ঠীকে নিজের কব্জায় এনে, বিরোধী দলগুলোকে অকার্যকর করে, রাষ্ট্রযন্ত্রের পরতে পরতে অনুগতদের বসিয়ে আর ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে তিনি ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করেন। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই শেষ অব্দি তার গদি টিকিয়ে রাখতে পারে নি।
র্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত কঠোর বার্তা’ বলে প্রমাণিত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ফলে বেশ কিছু ‘জীবন রক্ষা’ পেয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন লবিং ফার্মের পেছনে টাকা নষ্ট করেছে। বেনজীর আহমেদকে দেশের পুলিশ প্রধান করে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে দিয়েছে।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত ছিল নিষ্ঠুর, বেপরোয়া ও দুর্নীতিবাজ। সহিংসতা ছাড়া আর কোনো উপায় নেইÑ এই ভেবে সহিংসতার পথ বেছে নিয়ে কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার সকল পথই হারিয়ে ফেলেছিল।
আওয়ামী লীগের আমলে পুলিশ যে ‘জনগণের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি’ তা জুলাই-আগস্টে পুলিশি নির্যাতনের চিত্র থেকেই প্রতিফলিত। বিভিন্ন সময় ঘুষ-দুর্নীতি-ধর্ষণের মতো নানা ন্যক্কারজনক ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ বাহিনীর নেতিবাচক এই প্রবণতা ১৫ বছরে এতটাই বেড়েছিল যে, তা এই বাহিনীর অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল বললেও অত্যুক্তি হয় না। ইয়াসমিন ধর্ষণ-হত্যা থেকে শুরু করে ছোটোখাটো অনেক অপরাধের সঙ্গেই পুলিশের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে, জড়িতদের সাজাও হয়েছে। কিন্তু এরপরও বন্ধ হয়নি পুলিশি নির্যাতন। রাজধানীতে রাব্বী নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা পুলিশের হাতে মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে পুলিশের কর্মকাণ্ড আলোচনায় আসে। এ ঘটনার রেশ কাটতে-না-কাটতে পুলিশের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মেডিকেলে ভর্তি হন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিদর্শক বিকাশচন্দ্র রায়।
বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে শেখ হাসিনা একজন স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি তোষামোদকারীদের দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত রাখেন, যারা তাকে খুশি করতে সারাক্ষণ তাই বলত যা তিনি শুনতে চান এবং এরাও হাসিনার মতোই ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য মরিয়া ছিল। ২০২৪ সালের জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের পর যখন হাসিনা ক্ষমতায় আসেন, তখন ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তিনি আরও পাঁচ বছর দেশ শাসন করবেন। কিন্তু সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ব্যাপক দমনপীড়নের ফলে তা গণ-রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার ক্ষমতার কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
শেখ হাসিনার পতনের প্রাক্কালে ইন্ডিয়া টুডের নিবন্ধে ডালাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি সদস্য ও বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বির একটি বক্তব্য প্রকাশ পায়। তাতে তিনি বলেন, ‘৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রায় এক মাস তরুণ শিক্ষার্থীদের পেছনে তাড়া করার পর সারা দেশে পুলিশ ক্লান্ত এবং শ্রান্ত। এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ করছে না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কিছু সদস্য (আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্র সংগঠন), যারা পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল তারা নিজেরাই হাতে আইন তুলে নিয়েছে এবং প্রায় ৪০ জন ছাত্রকে হত্যা করেছে।’ শাফকাত রাব্বি বলেন- ‘বাংলাদেশের রাস্তায় প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিবাদে নেমেছে।’
আন্দোলনে কী ধরনের ভয়াবহ নির্মম পাশবিকতা চালিয়েছে হাসিনা সরকার যে উপস্থিত ছিল সেই বলতে পারবে। কারও মুখ নষ্ট হয়ে গেছে। কারও দুই হাত উড়ে গেছে। কারও দুই পা কেটে ফেলা হয়েছে। কারও চোখের কর্নিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। জীবন যেন তাদের কাছে এখন অভিশাপ।
ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শাসকের সংখ্যা খুবই কম। সেই বিরল নজিরই গড়েছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন মাত্রার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বাংলাদেশের জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করতে পারেনি- মাথা নত করা তো আরও পরের কথা। যারা হত্যা করেছে, হাত কেটে দিয়েছে, মুখ উড়িয়ে দিয়েছে তাদের বিচার বাংলাদেশে হতেই হবে। যারা নির্দেশ দিয়েছে শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে প্রত্যেকের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।