পরিবার
মাহজাবিন আলমগীর
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৪৮ পিএম
মানুষ মাত্রই সামাজিক জীব। সভ্যতার আদিকাল থেকেই ব্যক্তি সমাজে তার সামষ্টিক পরিচয়েই খুঁজে পায় আত্মরক্ষার ভিত্তি, একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা বোধ থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার সোপান। এভাবেই মানুষের মাঝে তীব্র হয় সমাজে সামষ্টিকভাবে সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার প্রবণতা। কিন্তু বর্তমান যুগে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার রূপটি ধীরে ধীরে সামষ্টিক জীবনযাত্রায় বিচ্ছিন্নতা প্রকট আকার ধারণ করতে শুরু করেছে; যা ব্যক্তিকে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে এবং পারস্পরিক সহনশীলতা আর সহমর্মিতার বোধটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার চোরাগলিতে রীতিমতো ঠেলে দিচ্ছে।
যৌথ পরিবার ব্যবস্থা অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। এখনকার পরিবারগুলো বেশিরভাগই বাবা-মা আর সন্তানকে নিয়েই সীমাবদ্ধ। একই ছাদের নিচে বসবাস করলেও পরিবারের সদস্যরা সবাই যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। আগের যুগে দেখা যেত বাড়ির কিশোরী মেয়েটি স্কুল থেকে ফিরে মায়ের সঙ্গে স্কুলের গল্পে মেতে উঠত, এখন স্কুলপড়ুয়ারাও বাড়ি ফিরে স্মার্টফোন হাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বসে থাকা দম্পতিদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় নিজেদের ডিভাইসে তারা এতটাই মগ্ন যে পরস্পরের মানসিক নৈকট্যের তাগিদ অনুভব করে না। যান্ত্রিক সম্পর্কে মনের উষ্ণতার পরশ কোথায়? ভার্চুয়াল জীবনটাই যেন আজ গুরুত্বপূর্ণ সবার কাছে। এমন অনেক পরিবার আছে যারা খাবার টেবিল ছাড়া সারা দিনে একত্র হয় না। অনেক পরিবারে আজকাল সে চলও উঠে গেছে। টক-ঝাল-মিষ্টি পারিবারিক সম্পর্কের খুনসুটিগুলো হারিয়ে গেছে। পরিবার বলে আগে সমাজে যে একটা সমষ্টিগত চিন্তাচেতনা কাজ করত আজ সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘আমি’ আর ‘আমার’। নাটক, সিনেমা কিংবা গান পরিবারের সবার সঙ্গে বসে উপভোগ কোর যে ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে ছিল, তা একেবারেই হারিয়ে গেছে স্মার্টফোনের যুগের আগমনে। পারিবারিক সুখ-দুঃখগুলো পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি কোর যে ব্যাপারটি ছিল, তা আর মোটেই নেই। অথচ স্মার্টফোনে কি না পাওয়া যায়। এ যেন আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ, সুইচ টিপলেই যা হুকুম করা হবে সব এসে হাজির সামনে! কেবল যা পাওয়া যায় না, সেটা সামাজিক চিন্তাচেতনার মতবিনিময়ের একাত্মবোধের বন্ধন। স্মার্টফোন নামক আলাদিনের চেরাগটি মানুষকে সব দিয়েছে কিন্তু বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে সামাজিকতা সম্পর্কের বন্ধনগুলো, কেড়ে নিয়েছে সমষ্টিগত জগৎকেও। মানুষ যে সামাজিক জীব, এ কথা ক্রমাগত ভুলতে বসেছে। বেড়েছে সমাজে বিচ্ছিন্নতাবোধ আর বিষণ্নতার প্রকোপ। ক্রমাগত বেড়েছে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আর আত্মহত্যার প্রবণতা।
পরিবারে কেউ গুরুতর অসুস্থ, বাড়ির উঠতি বয়সি ছেলেটির সেদিকে মন নেই, কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে ব্যস্ত। রাস্তায় ছিনতাই হচ্ছে, লোকটিকে বাঁচানোর তাড়না কারও নেই, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়, তাকে উদ্ধারের বিপরীতে ওই দৃশ্য সবাই ভিডিওধারণে ব্যস্ত। একসময় স্কুল-কলেজপড়ুয়ারা ছুটির দিনে বন্ধুদের নিয়ে ভিড় করত, একে অপরের বাড়িতে মিলিত হতো। এখন যায় কফিশপ, রেস্টুরেন্টে। সন্তান কার সঙ্গে মেলামেশা করছে, বাবা মাদের জানার সুযোগও নেই।
একুশ শতকের বিশ্বায়নের যুগে আমরা নিজেদের যতই গ্লোবাল সিটিজেন ভেবে গর্ববোধ করি না কেন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বোধ কিন্তু ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েই চলেছে। মানুষ তার শিকড়কে ভুলতে বসেছে। আগে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে যাতায়াতের চল ছিল। এখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়া কেউ আর একত্র হয় না। পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতের মিলনমেলা হিসেবে আত্মীয়দের কারও মৃত্যু এবং সামাজিক অনুষ্ঠানই একমাত্র উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইলে খোঁজখবর যতটুকু নেয়, পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের তাগিদ অনুভব করে না। ঈদ পার্বণ কিংবা কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া গ্রামের বাড়িতেও যায় না। আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনার বাইরে মানুষ এখন যেন কিছুই ভাবতে পারে না। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণেই শামুকের মতো খোলস পাল্টায়।
পুঁজিবাদী আত্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতি আমাদের চিরায়ত সমাজ ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। মানুষের মানবিক বোধ-বিবেচনাকে বদলে দিন দিন ভোগসর্বস্ব জীবনযাপনে আকৃষ্ট করছে। একটা সময় ছিল মানুষ সামাজিক সুখ-দুঃখের ভালো-মন্দের বিনিময়ের জন্য প্রিয়জনের সান্নিধ্য কামনা করত। এখন দুঃখ ভুলতে এবং সুখ কিনতে গর্হিত পন্থা অবলম্বন করে। মাদকাসক্তের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণও তাই ঘটে চলেছে। পারস্পরিক নৈকট্যের মাঝে যে মানসিক প্রশান্তি আর সৌর্হাদ্য-সম্প্রীতির আশ্রয় ছিল, তা একেবারেই হারিয়ে গেছে। আত্মকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থায় অর্থের মানদণ্ড পারস্পরিক সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করে। শ্রেণিগত অবস্থার ভিত্তিতেই নিকটজন দূরবর্তী এবং দূরবর্তী নিকটবর্তী হয়ে যায়।
অথচ মাত্র দুই দশক আগেও আমাদের মধ্যবিত্ত পাড়ামহল্লাগুলো মানুষের সামাজিক প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল। সন্ধ্যা নামলেই বাড়িতে বাড়িতে স্কুলপড়ুয়াদের পড়ার আওয়াজ শোনা যেত, বিকালবেলা চা-মুড়ি খেতে খেতে সবার সঙ্গে পারিবারিক আড্ডা কিংবা ক্যারম, লুডু খেলার মজার স্মৃতি আজ মানুষকে কেবলই নষ্টালজিক করে তোলে। পাড়ামহল্লার সামাজিক কর্মকাণ্ডের ক্লাবগুলো মুখরিত থাকত সদস্যদের সরব উপস্থিতিতে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া, লাইব্রেরি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ইত্যাদি এখন কালে-গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে সেই সব প্রাণচাঞ্চল্য। কৃত্রিম ও যান্ত্রিকতার ভিড়ে মানুষ মনুষ্যত্ববিহীন অসামাজিক প্রাণীতে পরিণত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করলেও কেউ কাউকে চেনে না, কারও সঙ্গে নেই কারও সামাজিক সম্পর্ক-সম্প্রীতি।
পাড়ামহল্লাগুলোয় প্রতিবেশীদের মাঝে যে সৌজন্যতা বিনিময়ের চল ছিল, তাও হারিয়ে গেছে বিদ্যমান ব্যবস্থার বদৌলতে। প্রতিবেশীদের সুখে-দুঃখে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাশে থাকত। তাদের আনন্দে আনন্দিত হতো। আবার শোকে হতো শোকাহত। আজকাল নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া কেউ প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগ করে না। অথচ সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার গুণাবলি মানুষকে সত্যিকার অর্থে মানবিক করে তুলত আর এখন নগর সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতার প্রকোপে হারিয়ে যাচ্ছে সামাজিক সংহতি। পাশাপাশি সমাজে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক উগ্রতা আর অসহিষ্ণুতা। বিচ্ছিন্নতার প্রভাবে আরও বাড়ছে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আর নৃশংসতা। মানুষ ক্রমেই হারিয়ে ফেলেছে তার মনুষ্যত্বের গুণাবলি।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়ে মানুষ বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। ঝুঁকছে মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফি আর অনলাইন জুয়ার মতো বিধ্বংসী নেশায়। সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণায় জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার অতি ব্যবহার সমাজে বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। কেননা এতে মানুষের স্বাভাবিক মানসিক সংযোগ এবং ঘনিষ্ঠতা হ্রাস করে। তখন কেবল ভার্চুয়াল জগৎই গুরুত্ব পায়। আর সমাজবিজ্ঞানী ক্যানলীর মতে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ক্রমেই মানুষের মাঝে মানসিক এক প্রকার চাপ তৈরি করে, যাতে বিচ্ছিন্নতার শিকার মানুষটি অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। যেমনÑ মদপান, মাদকাশক্তি, জুয়া প্রভৃতিতে।
আন্তরিকতা, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির যে অটুট বন্ধনের ঐতিহ্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান ছিল, তা আজ আমরা হারাতে বসেছি। কেননা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনার প্রভাবে সমষ্টিগত ঐক্যবোধের চেতনার কোনো অবকাশ আর থাকছে না। সমাজজুড়ে অসুস্থ মনমানসিকতা আর বিকৃত চিন্তাচেতনার প্রভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা আজ বিবেকের আয়নায় নিজেদের দেখতে ভয় পাই। কারণ এই বিচ্ছিন্নতার করালগ্রাস থেকে আমরা কেউ মুক্ত নই। সমাজে বিষণ্ন অনিশ্চয়তা আমাদের অস্তিত্বকে ক্রমেই বিপন্ন করে তুলেছে। কিন্তু মানুষ যে সামাজিক জীব। সামাজিক হয়েই তাকে বাঁচতে হবে। নতুবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ব্যাধির এই প্রকোপ দিন দিন বাড়তেই থাকবে, যার শেষ কোথায় সেটা আমরা এখন উপলব্ধি করছি না বটে। তবে পরিণতি যে ভয়াবহ, সেটা কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না।