মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৪৭ এএম
বিশ্বজুড়ে যে অমানবিক অপরাধটি নীরব ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, তা হলো মানব পাচার। জাতিসংঘ ঘোষিত ৩০ জুলাই পালিত হয়েছে বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। এই দিনটি মানব পাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেয়। উন্নত হোক বা অনুন্নতÑ প্রায় প্রতিটি দেশই কোনো না কোনোভাবে মানব পাচারের শিকার, উৎস বা গন্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মানব পাচার বলতে বোঝায় জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণে এনে শ্রম, যৌন বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনসহ নানা নিষিদ্ধ কাজে ব্যবহার করা। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার চরম লঙ্ঘন নয়, বরং মানবাধিকারের ভয়াবহ অবমাননা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাচারের শিকার হয় নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
মানব পাচার আজ বহুরূপী এক বৈশ্বিক সংকট। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑ যৌন বাণিজ্যের জন্য পাচার ও জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিতকরা, বিয়ের নামে প্রতারণা করে বিভিন্ন নিষিদ্ধ পল্লীতে পাচার কিংবা শারীরিক অঙ্গ পাচার, গৃহকর্মে জবরদস্তিমূলক নিয়োজিত করা, শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা, অবৈধ দত্তক বা শিশু পাচার। জাতিসংঘের মতে, প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ পাচারের শিকার হয়। বিশ্বজুড়ে মানব পাচারের ৭০% শিকার নারী ও শিশু। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল এ সমস্যায় অধিক ভুক্তভোগী। পাচারকারীরা সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে কাজ করে এবং প্রায়শই তাদের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের যোগাযোগ থাকে।
মানব পাচারকারীরা বিভিন্ন ছলচাতুরী, প্রতিশ্রুতি, প্রেমের ফাঁদ, ফেক ভিসা বা এজেন্সির মাধ্যমে মানুষকে ফাঁদে ফেলে। কখনও কখনও পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজনও এর পেছনে জড়িত থাকে। মানুষ পাচারের শিকার হলে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যায়। পরিবারে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক কলঙ্ক দেখা দেয়। পাচার হওয়া ব্যক্তি দেশে ফিরে এলে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
মানব পাচারের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই জঘন্যতম অপরাধটি কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব নয়। এই অপরাধের পেছনে থাকে বিশাল এক চক্র। যে যে দেশে মানব পাচার হয় সেই দেশের দালালদের মধ্যে থাকে যোগসূত্র। দলবদ্ধ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই অপরাধটি সংঘটিত হয়। একটি তদন্তে উঠে আসে, মানব পাচার হয় মৌসুম হিসাব করে। পাচারকারীরা একটি মৌসুম নির্বাচন করে সেই অনুযায়ী পাচার করে মানুষকে। তারা হেমন্ত ও শীতকালকে পাচারের মৌসুম হিসেবে ধরে, কারণ এই সময় সমুদ্র কিছুটা শান্ত থাকে, তাই তারা ছোট ছোট নৌকা করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানব পাচার করে। আর মানব পাচার কমিয়ে আনতে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। আমাদের উচিত, বিদেশে যাওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো যাচাই করা; অবশ্যই নিয়োগপত্র, নিয়োগদাতা ও প্রতিষ্ঠান, ভিসা ইত্যাদি যাচাই করা; বৈধ এজেন্সির সহায়তা নেওয়া এবং কাগজপত্রের কয়েক কপি নিকটাত্মীয়ের কাছে রেখে যাওয়া। সর্বোপরি এ ধরনের অপরাধে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। এ ছাড়া পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সমাজে পুনরেকত্রীকরণে সহায়তা করা। আর মানব পাচার কেবল একটি অপরাধ নয়Ñ এটি মানবতা, সভ্যতা এবং নৈতিকতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ আগ্রাসন।