× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্লেষণ

দেশ ও অঞ্চলভেদে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:০৬ পিএম

নিরঞ্জন রায়

নিরঞ্জন রায়

আমেরিকা বিভিন্ন সময় অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে বিশ্বের অনেক দেশকে বিপাকে ফেলার জন্য। যেসব দেশ আমেরিকার জন্য হুমকি হতে পারে বা যে দেশ আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, সেসব দেশকে কিছুটা বিপাকে ফেলার জন্য আমেরিকা অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, যেমন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা স্যাংশন। কিন্তু এবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে নির্বিচারে সব দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা এক কথায় নজিরবিহীন। আমেরিকা শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সকল দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করেছে। এভাবে নির্বিচারে আমেরিকার বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করলেও এই উচ্চ শুল্কের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং অঞ্চল বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর ধরনও ভিন্ন। 

প্রথমত, কিছু দেশ আছে যাদের ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি এবং দৃশ্যমান। যেমন, কানাডা, ইউরোপের অনেক দেশ এবং জাপান। এসব দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যের পরিমাণ এত বেশি এবং নিবিড় যে তাদের ক্ষতির মাত্রা ও ব্যাপকতা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। এখানে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আছে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি এবং সম্পর্কের ক্ষতি। যে কারণে অন্যান্য অনেক দেশ, যেমনÑ চীনের তুলনায় আমেরিকার সঙ্গে পরিমাণের দিক থেকে কম বাণিজ্য করলেও তাদের মনস্তাত্ত্বিক এবং সম্পর্কের ক্ষতির মাত্রা চীনের থেকে অনেক বেশি এবং বলা চলে অপূরণীয়। এসব দেশ বলতে গেলে আমেরিকার সঙ্গে এক ধরনের মুক্তবাণিজ্য সুবিধা ভোগ করেছে। এখন আমেরিকা মাত্রাতিরিক্ত এবং একতরফাভাবে সেসব দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করায় সেই মুক্তিবাণিজ্য বলয় ভেঙে যেতে শুরু করেছে, যার জন্য এসব দেশ মোটেই প্রস্তুত ছিল না। তা ছাড়া উন্নত বিশ্বের এই দেশগুলো আবার আমেরিকার মিত্র দেশ। ন্যাটো তো আছেই, এর বাইরেও এসব দেশের সঙ্গে আছে এক নিবিড় ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। ফলে তারা আমেরিকার এমন আচরণে একেবারেই মর্মাহত। 

দ্বিতীয়ত, উন্নত বিশ্ব ছাড়াও আরও কিছু দেশ আছে, যারা আমেরিকার মিত্র না হয়েও আমেরিকার সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণ বাণিজ্য করে থাকে। যেমন, চীন এবং মেক্সিকো বা এরকম আরও কয়েকটি দেশ। এসব দেশ আমেরিকার বাজারে পর্যাপ্ত রপ্তানি করে থাকে। এ ক্ষেত্রে চীনের রপ্তানির ধরন একটু ভিন্ন। চীন আমেরিকার বাজারে সরাসরি পণ্য রপ্তানি করার পাশাপাশি ব্যাপক পরিমাণে পরোক্ষ রপ্তানি করে থাকে। যেমন, বিশ্বের অনেক দেশ আমেরিকার সরাসরি পণ্য রপ্তানি করে তা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও অন্যান্য সামগ্রী চীন থেকে আমদানি করে থাকে। ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রপ্তানি মিলে আমেরিকার বাজারে চীনের রপ্তানির পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত এবং অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। মেক্সিকোরও এরকম কিছু বিশেষ সুবিধা আছে। যেমনÑ মেক্সিকোতে অনেক উৎপাদন প্লান্ট আছে, যেখানে পণ্যসামগ্রী আধা উৎপাদন (সেমি ফিনিসড) অবস্থায় নিয়ে এসে অ্যাসেম্বল করে আমেরিকায় রপ্তানি করা হয়। ফলে আমেরিকার বাজারে মেক্সিকোর মোট রপ্তানির পরিমাণও তুলনামূলক অনেক বেশি। এসব দেশ আবার ইউরোপ, কানাডার মতো পাল্টা ব্যাবস্থাও সেভাবে নেওয়ার সাহস দেখায় না। এমনকি অলোচনার পথেও সেভাবে হাঁটতে পারে না। ফলে তারা আমেরিকার সঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে সমানে সমানে চলার নীতি পরিহার করে একটু ধৈর্য ধরে সময় নিয়ে ধীরগতিতে সমস্যা মোকাবিলা করতে চায়। 

তৃতীয়ত, আরও কিছু দেশ আছে, যারা আমেরিকার শত্রুও না, আবার মিত্র হলেও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, যেমনÑ ভারত। ভারতেরও বড় রপ্তানি বাজার হচ্ছে আমেরিকা। আমেরিকায় রপ্তানির দিক থেকে ভারতের অবস্থাও কিছুটা চীনের মতো। কেননা ভারত আমেরিকার বাজারে যেমন সরাসরি পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করে, তেমনি অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ ভারত থেকে কাঁচামাল এবং অনেক আনুষঙ্গিক জিনিস আমদানি করে পণ্য উৎপাদন করে সেই পণ্য আমেরিকায় রপ্তানি করে থাকে। এ ছাড়া ভারতীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের মেক্সিকোর মতো লাতিন আমেরিকায়ও উৎপাদন কেন্দ্র আছে, যেখানে আধা উৎপন্ন বা সেমি ফিনিসড পণ্য নিয়ে ফিনিসড প্রডাক্টে রূপান্তর করে আমেরিকায় রপ্তানি করে থাকে। ফলে আমেরিকার বাজারে ভারতের মোট রপ্তানির পরিমাণও তুলনামূলক অনেক বেশি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার কাছে ভারত বর্তমানে চীনের থেকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কারণ চীন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। চীনের অর্থনীতি আমেরিকাকে প্রায় ধরে ফেলেছে। তাই শুল্কযুদ্ধে আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য চীন। পক্ষান্তরে ভারত আমেরিকার অর্থনীতি থেকে অনেক নিচে। আবার আমেরিকার বাজারের সাপ্লাই সোর্স অনেকটাই নির্ভর করে চীন এবং ভারতের ওপর। এ কারণে আমেরিকা চাইলেও একই সঙ্গে চীন এবং ভারতের ওপর একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। আমেরিকা যেহেতু সংগত কারণেই চীন থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে, তাই তাদেরকে ইচ্ছা করেই ভারত বা এরকম কিছু দেশের প্রতি শিথিল না হয়ে উপায় নেই। 

চতুর্থত, এর বাইরে আরও কিছু দেশ আছে, যাদের বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ খুবই সামান্য হলেও তাদের রপ্তানি পর্যাপ্ত পরিমাণে আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভরশীল, যেমন বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম। এসব দেশ হাতে-গোনা কিছু পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করে থাকে। এসব দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের উল্লেখযোগ্য উৎস হচ্ছে তৈরি পোশাক। এসব দেশের আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ যেমন নেই, তেমনি আলোচনার সক্ষমতাও সেভাবে নেই। বাংলাদেশের অবস্থা আবার সবচেয়ে বেশি নাজুক। কেননা গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর থেকে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে সেখান থেকে বাদ যায়নি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। এমনকি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতকেও এই রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি। অধিকন্তু অন্যান্য অনেক উৎপাদন খাতের মতো এই রপ্তানি খাতও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক গার্মেন্টস কারখানা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে বা অন্যত্র চলে গেছে। এই শুল্কযুদ্ধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যেখানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং যেখানে এই খাতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতি ইউনিট উৎপাদন হ্রাস করে এই অতি উচ্চ হারের শুল্ক সমস্যা সামাল দেওয়ার একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক মাস ধরে এই খাত চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকায় এখন আর সেই সুযোগ সেভাবে কাজে লাগানো যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

এদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতি উচ্চ হারে শুল্ক আরোপে যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিল তা প্রথমবার ৯০ দিনের জন্য বিরতি দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ গত ৯ জুলাই অতিবাহিত হওয়ার পর ১ আগস্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। পহেলা আগস্টের এই বাণিজ্যযুদ্ধ বিরতির মেয়াদ পুনরায় বৃদ্ধি করা হবে কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশা ছিল যে এই বাণিজ্যযুদ্ধ বিরতির সময় বিভিন্ন দেশ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করে শুল্ক হার হ্রাস করতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তবে খুব বেশি দেশ এরকম বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত হতে পারেনি। তবে ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইন আমেরিকার সঙ্গে সফলভাবে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করে তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার উল্লেখযোগ্য হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে ইন্দোনেশিয়াও আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে যথেষ্ট এগিয়ে গেছে এবং খুব সহসাই হয়তো আমেরিকার সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে শুল্ক হার কমিয়ে আনতে পারবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

ভিয়েতনামের সঙ্গে আমেরিকার সফল বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে ভিয়েতনামের ওপর আরোপিত শুল্ক হার হ্রাস করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একইভাবে যদি ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন হয়েই যায়, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে। কেননা এই দেশগুলো বাংলাদেশের প্রতিযোগী এবং আমেরিকার ব্যবসায়ীরা তখন বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করতে উৎসাহিত হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভিয়েতনাম আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক সমস্যার সমাধান করে বাণিজ্য চুক্তি করতে পারলে, আমরা কেন পারলাম না। ফলে সার্বিকভাবে এই বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত মারাত্মক এক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। 

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের মাধ্যেম বিশ্বব্যাপী যে মাত্রার বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে, তাতে উন্নত, উন্নয়নশীল এবং স্বল্প উন্নত, সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ক্ষতির মাত্রা, ধরন এবং ব্যাপ্তি দেশ ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই বিবেচনা থেকে ট্রাম্পের আরোপিত উচ্চ শুল্ক হারের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতির মাত্রা যে যথেষ্ট বেশি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, যদি না এই বাণিজ্যযুদ্ধের দ্রুত একটি সন্তোষজনক সমাধান হয়। কিন্তু সে লক্ষণ আপাতত দৃশ্যমান নেই, যা এই মুহূর্তে উদ্বেগের বিষয়।

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা