ত্রিপক্ষীয় চুক্তি
সাইফুল ইসলাম শান্ত
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৫ ১৭:০৬ পিএম
চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সদ্য সম্পন্ন হওয়া ত্রিপাক্ষিক বৈঠক দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। চলতি বছরের জুন মাসে চীনের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন ছিল তিন দেশের প্রথম উচ্চপর্যায়ের, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, যেখানে অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বহুমাত্রিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন এই উদ্যোগকে একটি ‘উন্মুক্ত, বহুপাক্ষিক ও পারস্পরিক বিশ্বাসভিত্তিক কাঠামো’ হিসেবে তুলে ধরলেও, এটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের অংশ বলেই অনেকে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের (সিপিইসি) সম্প্রসারণ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কে শক্তিশালী করা এবং ভারতকে আঞ্চলিকভাবে ঘিরে রাখার কৌশলেরই অংশ। এতে ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে বহুগুণ, কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশে অবস্থিত বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ত্রিপাক্ষিক জোট প্রশ্ন তুলেছে ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে।
তবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চীনের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতার পাশাপাশি, পাকিস্তানের বাজারেও বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশাধিকার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হতে পারে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। এই চুক্তি এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জিও-স্ট্র্যাটেজিক জোটগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
২০২৩ ২৪ অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ৬৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আর বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৫৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। চলতি বছর দুই দেশের বাণিজ্য ছাড়িয়েছে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে চীনের ডিউটি ফ্রি সুবিধায় প্রায় ৯৭% বাংলাদেশি পণ্য ট্যারিফমুক্তভাবে দেশটিতে রপ্তানি হয়; এটি বাংলাদেশের চীনে বাজার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুই দেশের বাণিজ্য ধারাবাহিকভাবে ১০ বিলিয়ন ডলারের দিকে অবস্থান করছে। চীন এরই মধ্যে বাংলাদেশে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে এবং এই চুক্তির ফলে সেই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। চট্টগ্রাম, পায়রা ও মোংলা বন্দরে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সড়ক-রেল সংযোগ ও শিল্পাঞ্চল নির্মাণে চীনা অর্থায়ন আরও প্রসারিত হতে পারে।
এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পণ্য রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করবে। বর্তমানে পাকিস্তানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সীমিত হলেও এই সহযোগিতা বাড়লে রপ্তানির পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়তে পারে। এই উদ্যোগে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ চীনের বিআরআই প্রকল্পের একটি সক্রিয় অংশ হতে পারে। এতে চীন-বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার করিডোর (বিসিআইএম) ও সিপিইসি-এর (চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর) সম্প্রসারণের মাধ্যমে পণ্য চলাচল সহজতর হবে, যা রপ্তানির খরচ কমাবে এবং ব্যবসার গতি বাড়াবে।
ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বন্দর উন্নয়ন, মালবাহী জাহাজ চলাচল, কাস্টমস সহযোগিতা ও লজিস্টিক উন্নয়নে চীন ও পাকিস্তানের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা পেতে পারে। চীন ও পাকিস্তান উভয় দেশই কৃষি গবেষণায় বেশ এগিয়ে। বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে যৌথ কৃষি গবেষণা, বীজ উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ পাবে, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। চীন ও পাকিস্তানের হাসপাতাল ও মেডিকেল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে অংশীদারত্বে বাংলাদেশ আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও ওষুধ উৎপাদনের উন্নয়ন করতে পারবে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও যুব বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দক্ষতা বাড়বে এবং কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ওপর অনেক খাতে নির্ভরশীল। এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তি একটি বিকল্প কৌশলগত অংশীদারত্ব তৈরি করতে পারে, যাতে ঢাকা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেই চীন-পাকিস্তানের কাছ থেকে কৌশলগত সুবিধা নিতে পারে। একাধিক আঞ্চলিক জোটে যুক্ত থাকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও গতিশীল, স্বতন্ত্র ও বহুমুখী করে তুলবে। ফলে বিশ্ব-রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়বে।
এই ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা কোনো সামরিক জোট নয় বরং অর্থনৈতিক, অবকাঠামো ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নমূলক সহযোগিতার লক্ষ্যে গঠিত একটি নীতিগত কাঠামো। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সব সময় ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। কাজেই বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যুক্ত হলেও ভারতের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে বলে আমি মনে করি এবং সে সম্পর্ককে দুর্বল করার কোনো ইঙ্গিত এই চুক্তিতে নেই।
এ ছাড়া বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণ মূলত উন্নয়ন, প্রযুক্তি, শিক্ষাগত বিনিময় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে, যা পরোক্ষভাবে ভারতসহ গোটা উপমহাদেশের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক। ভারত যেমন বিমসটেকের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযুক্তি বাড়াতে চায়, তেমনি বাংলাদেশও বহুপাক্ষিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়। তা ছাড়া বাংলাদেশ কখনোই এমন কোনো জোটে জড়ায়নি যা প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে।
সুতরাং, ভারতের উচিত এই পদক্ষেপকে উদ্বেগের চোখে না দেখে বরং সহযোগিতার নতুন সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ, একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলোÑ চীন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। এজন্য বাংলাদেশকে একটি সুবিবেচিত, দৃঢ় ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে।
তবে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, তা হলো- অতিরিক্ত চীনা ঋণ বাংলাদেশের জন্য ‘ঋণের ফাঁদ’ তৈরি করতে পারে, যদি প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন না হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে দেশের অভ্যন্তরে কিছু রাজনৈতিক ও জনমতভিত্তিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার ঝুঁকি থাকায় এই চুক্তিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান অপরিহার্য।
এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনীতি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কূটনৈতিক পরিসরে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে। তবে, এর পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে হবে। অর্থাৎ, সুযোগ যেমন বড়, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়।