বৈরী আবহাওয়া
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৫ ১৭:১৯ পিএম
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারে সৃষ্ট দুর্যোগের খবর জানা গেল। কয়েকদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ ও অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে হঠাৎ বেড়ে গেছে জোয়ারের পানি। দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতার এই জোয়ারে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, ভোলা, পটুয়াখালী, ফেনী ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে বাঁধ ও রাস্তা, তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, রিসোর্ট, সড়ক ও কৃষিজমি। ভাঙন ও জোয়ারের পানিতে কার্যত বিপর্যস্ত জনজীবন। দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো উপকূলবাসী। জানা যায়, টানা বৃষ্টিপাত ও লঘুচাপের কারণে আছড়ে পড়া ঢেউ সজোরে আঘাত করছে উপকূলে। এতে মাটি নরম হয়ে নুইয়ে পড়ে ভেঙে যাচ্ছে ‘উপকূলের রক্ষাকবচ’ শত শত গাছপালা। সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে সৈকত লাগোয়া ছোট-বড় অসংখ্য স্থাপনা। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব স্থানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে উপকূলবাসী। এমনকি ভারী বৃষ্টি এবং ঝড়ো হাওয়ার কারণে দেশের নদ-নদীগুলোতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ার দেখা যাচ্ছে। যা দুর্যোগের মাত্রাকে আরও তীব্র করেছে। আসলে কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, উপকূলের মানুষকে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই বাঁচতে হয়, জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে হয়।
২৮ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘উপকূলজুড়ে জোয়ারের হানা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উপকূলবাসীর দুর্ভোগের নানা চিত্র। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সমুদ্রের তীব্র ঢেউয়ে কক্সবাজারের লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলীসহ অন্তত ১০টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভেঙে গেছে ট্যুরিস্ট পুলিশের অস্থায়ী স্থাপনা, উপড়ে গেছে ঝাউগাছ। টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের চারটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও রাস্তা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিম প্রান্ত প্লাবিত হয়ে পর্যটন রিসোর্ট হুমকির মুখে পড়েছে। কুতুবদিয়ায় নিম্নচাপের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে কয়েকটি এলাকা। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। ফেনী জেলার মুছাপুরে রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সরাসরি প্রবেশ করছে সোনাগাজীর নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে। জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে সায়েদপুর, চর ইঞ্জিমান, রহমতপুর, আমতলীসহ বিভিন্ন গ্রাম। এতে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন এলাকা নিঝুমদ্বীপ। সেখানে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে প্রতিটি বাড়িতে। রান্নাঘর, উঠান সবই পানির নিচে। এলাকার হাজারও মানুষ বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে পড়েছেন। পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় জোয়ারের ঢেউয়ে সৈকত লন্ডভন্ড হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় উদ্যান ও ডিসি পার্কের পাশে সড়ক ভেঙে পড়েছে। উপড়ে গেছে গাছপালা, প্লাবিত হয়েছে নিচু এলাকা, মাছের ঘের ও বসতভিটা। রাঙ্গাবালী-বাউফল-ঝালকাঠির নদীপাড়ের শত শত গ্রাম প্লাবিত, ঘরবাড়ি, সড়ক ও বাজার পানির নিচে। একই অবস্থা ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর ইউনিয়নের ইটের রাস্তার প্রায় ৪ কিলোমিটার জোয়ারের তোড়ে ভেঙে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। স্কুলগামী শিশু, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বেড়িবাঁধ না থাকায় জলোচ্ছ্বাসে এটা এলাকার বরাবরের চিত্র। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। উপকূলে অবস্থানরত পর্যটকদের সতর্ক করেছেন নিজ নিজ স্থানীয় প্রশাসন। সমুদ্র উত্তাল থাকায় মাছ ধরার ট্রলার উপকূলে ফিরে এসেছে। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরার সুযোগ পেলেও দুর্যোগের কারণে জাল ফেলতে পারছেন না জেলেরা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন বাংলাদেশের নিয়তি। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। প্রতিবছর বন্যা ও পাহড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, টর্নেডো, কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, জলাবদ্ধতার মতো নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই মানুষের বসবাস। এসব দুর্যোগের কারণে জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব দুর্যোগ জাতীয় সম্পদ এবং অর্থনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। বলা চলে, দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৫ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমুখী দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করেন। এমনিতেই লবণাক্ততার প্রভাব প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে উপকূলের শ্রমজীবী মানুষকে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই এসব দুর্যোগ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো তাদের দায় নিচ্ছে না। প্রতিবছর বিশ্ব জলবায়ু সন্মেলনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা বিশ্বনেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। প্রতিবছর দুর্যোগ প্রশমনে দায়ী উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেও তা যেন ‘কথায় সীমাবদ্ধ’ থেকে যায়। এ যেন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে ‘প্রহসন’ মাত্র। ফলে এই দুর্যোগ আমাদেরই মোকাবিলা করতে হয়। তাই আমরা মনে করি, যেখানে যে পদ্ধতিতে দুর্যোগ মোকাবিলা করা দরকার, সেখানে তাই করা উচিত। এই ক্ষেত্রে গবেষণার মাধ্যমে দুর্যোগ প্রতিরোধে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তার আগে দরকার দুর্যোগের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করা, তাদের পাশে দাঁড়ানো।
এই ক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলের মানুষকে জরুরি সতর্ক সংকেত সম্পর্কে জানাতে হবে। সংকেতের অর্থ বুঝতে হবে এবং সংকেত অনুসারে এর নির্দেশনা মানতে হবে। পাশাপাশি জনসাধারণের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এসব দায়িত্ব সরকার এবং সামাজিক সুরক্ষায় নিয়োজিত সংগঠনগুলোর। তবেই কেবল জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব।