পর্যবেক্ষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৫ ১৭:১৭ পিএম
মহিউদ্দিন খান মোহন
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমরা সেই সে জাতি’ গানটি শুরু করেছেন এভাবে- ‘ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি/ সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্ব করেছি জ্ঞাতি’। জাতীয় কবি তাঁর এ গানের কথার দ্বারা মুসলমান জাতির গৌরবময় ইতিহাসের কথাই বস্তুত বোঝাতে চেয়েছেন। গানটির মর্মবাণী আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য। ধর্মের পথে না হোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা বহুবার লড়াই করেছি। মানুষের অধিকার আদায় ও স্বাধীনতার জন্য আমরা মরণপণ লড়াইয়ে নামতে দ্বিধা করিনি। এসব যদিও ধর্মযুদ্ধ নয়, তবে ধর্ম প্রদর্শিত মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা এসব লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। ঈশা খাঁ, মীর নিসার আলী তিতুমীর, ফকির মজনু শাহ, হাজী শরীয়ত উল্লাহ প্রমুখ প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীগণ মানুষের অধিকার, সত্য ও সাম্য-মৈত্রী প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে গেছেন। তাঁদেরই উত্তরাধিকারী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নানাভাবে অবদান রেখে গেছেন। তাঁদের দেখানো পথে হেঁটে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। এই স্বাধীন স্বদেশভূমি অর্জন করার জন্য আমাদেরকে বিসর্জন দিতে হয়েছে ত্রিশ লাখ মানুষের মূল্যবান জীবন ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। আজ আমরা বিশ্বসমাজে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে সম্মানিত। বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।
কারও কারও কাছে কথাগুলো বাহুল্য মনে হতে পারে। তবে, যদি প্রশ্ন করা হয়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবজা থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারলেও আমরা নিজেরা কি মুক্ত হতে পেরেছি? লোভ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, অপরের ক্ষতিসাধনের মনোবৃত্তি, অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে অধিকতর বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া বা নির্বিকার থাকা এসব নেতিবাচক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে আমরা কি বের হতে পেরেছি? যদি ছেলেবেলায় পড়া আপ্তবাক্য ‘সদা সত্য কথা বলিবে’র প্রতি বিশ্বস্ত থেকে উত্তর দিতে হয়, তাহলে বলতেই হবে, না পারিনি। কেন পারিনি সে কথা অনেকেই জানেন। হিংসা, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও মাৎসর্যÑ এই ছয় রিপুর সাঁড়াশি আক্রমণে আমাদের বিবেক পেয়েছে লোপ, চরিত্র হয়েছে দিগ্ভ্রান্ত। নইলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানহীন মানুষের জন্য আসা রিলিফ সামগ্রী জনগণের প্রতিনিধির মুখোশ আঁটা কতিপয় মানুষ উদরস্থ করতে পারত না।
আমরা সর্বদা দেশপ্রেম, মানবপ্রেমের কথা বলি। কিন্তু ওই দুটি চারিত্রিক গুণের ছিটেফোঁটাও কি আমাদের মধ্যে আছে? একেবারে নেই বললে অসত্য বলা হবে। আছে, তবে অত্যন্ত সংখ্যালঘিষ্ঠ মানুষের মধ্যে। রাজনীতিকরা দেশপ্রেমের সোল এজেন্ট নিয়ে বসে আছেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই চরিত্র বলেন, কর্মকাণ্ড বলেন, কোথাও ওই গুণবাচক বিষয়টি নেই। তাদের দেশপ্রেম ততটুকু, যতটুক জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সমর্থন লাভে প্রয়োজন। আর মানবপ্রেম! সে তো এক সোনার হরিণ। মঞ্চে যে লোকটি মানবপ্রেমে আপ্লুত হয়ে চোখে অশ্রুর মহাপ্লাবন বইয়ে দেন, রাতের অন্ধকারে তিনি মানববিধ্বংসী মাদকের মুকুটহীন সম্রাট অথবা প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিতে নিয়োগ করেন ‘কিলিং এজেন্ট’। রাজনীতি বা রাজনীতিকদের ওপর তহমৎ দিয়ে কী লাভ? আমরা আমজনতা কি ভালো? আমরা কি ছয় রিপুর প্রভাব এড়িয়ে চলতে পারছি? জনপ্রতিনিধি তো আমরাই নির্বাচিত করি। কিন্তু সৎ এবং যোগ্য প্রার্থীকে কি আমরা ভোট দেই? অধিকাংশ সময় নগদ নারায়ণের লোভে পড়ে আমরা অপাত্রে অর্ঘ্য দান করি। আর সে সুযোগে সমাজের চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা উঠে যায় উচ্চাসনে। অবশ্য গত তিনটি নির্বাচনে আমাদের সে কষ্টও করতে হয়নি। আমাদের হয়ে পতিত দলটির কর্মীরাই তা সেরে দিয়েছে। জনসেবার কী অনন্য দৃষ্টান্ত! জনগণের ভোট দিতে যাওয়ার কষ্ট লাঘব করার এই মহৎ কাজের জন্য ওদের সাধুবাদ দেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি, উল্টো ওদের বিতাড়িত করেছি।
রাজনীতির প্রসঙ্গ থাক। অন্য কথায় যাই। আমরা মানুষ। সৃষ্টিকর্তা মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু কর্তব্য ঠিক করে দিয়েছেন। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি আমাদের সে কর্তব্য পালন করা আবশ্যক। কিন্তু আমরা তা করি কি? ‘মানুষ মানুষের জন্য’Ñ কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি এবং বলিও। কিন্তু মানুষ হিসেবে আরেকজন মানুষের জন্য আমাদের যে দায়িত্ব তা কি পালন করি? অনেকেই এ দায়িত্ব পালন করি না বা এড়িয়ে যাই। পথচলতি কতজনকে বিপদগ্রস্ত হতে দেখি। কিন্তু আমরা নির্বিকার থেকে পাশ কাটিয়ে চলে যাই। আসলে দায়িত্ববোধ সবার থাকে না। আর সবাই তা পালনেও উৎসাহী হয় না। এটা যেমন পারিবারিক-সামাজিক ক্ষেত্রে, তেমন রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও। নাগরিকগণ যদি তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন না হন এবং তা পালনে এগিয়ে না আসেন, তাহলে একটি রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কল্পলোকের মোহনীয় বস্তু হয়েই থাকবে। সেই কবে, বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর ‘প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার’ (রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট) গ্রন্থে বলে গেছেন, ‘যেখানে মানুষের সাধারণ প্রকৃতি হচ্ছে শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির পথটা দেখা, আর সর্বসাধারণের স্বার্থের বিষয়গুলোতে কোনো আগ্রহ বা চেষ্টা না দেখানো, সেখানে উত্তম সরকার অসম্ভব।’ (পৃষ্ঠা : ২৬, বঙ্গানুবাদ : মোহাম্মদ দরবেশ আলী খান, প্রকাশক বাংলা একাডেমি; ১৯৬৯)। ১৬৪ বছর আগে জন স্টুয়ার্ট মিল যে কথা বলে গেছেন, তার সঙ্গে আমাদের সমাজের বর্তমান বাস্তবতার কী অদ্ভূত মিল! আমরা সুশাসনের জন্য সব সময় গলা ফাটাই, হাপিত্যেশ করি। আর এর অভাবের জন্য কখনও সরকারকে, কখনও রাষ্ট্রকে দোষারোপ করি। কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আমাদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং তা পালন অত্যাবশ্যক, তা একবারও ভেবে দেখি না। এই ভূমিকা বা দায়িত্ব পালন না করা বা এড়িয়ে যাওয়া কেবল রাষ্ট্রীয় বিষয়ে নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও দেখা যায়।
প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকা গেয়েছেন, ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে/ একটু সহানুভূতি, মানুষ কি পেতে পারে না, ও বন্ধু?’ বাস্তবতা হলো, মানুষের তা প্রাপ্য, কিন্তু পায় না। এটা অনস্বীকার্য, নানা রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। মানুষ হয়ে গেছে আত্মকেন্দ্রিক। সবাই এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। মানবিকতার এ মন্বন্তরের মধ্যেও কিছু মানুষকে দেখা যায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। যেখানে প্রকাশ্য রাস্তায় চোখের সামনে খুন হতে দেখলেও আমরা পার্শ্ব পরিবর্তন করে চোখ বুঁজে দ্রুত কেটে পড়ি, সেখানে কেউ কেউ সৃষ্টি করেন অচিন্তনীয় উদাহরণ। তেমনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীস্থ মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী। প্রিয় শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে বিসর্জন দিলেন নিজের জীবন। কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবপ্রেমের এ এক অপূর্ব নিদর্শন! আজ মাহেরীন চৌধুরীর নাম সবার মুখে মুখে। সবাই ধন্য ধন্য করছেন তাঁকে। অনেকেই দাবি করছেন, তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননায় ভূষিত করতে। রাষ্ট্র সেটা করবে কি না জানি না। তবে মাহেরীন যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে গেলেন, তা অনুকরণীয়।
ছেলেবেলায় আমরা পাঠপুস্তকে অনেক মহান ব্যক্তি ও মহীয়সী নারীর জীবনী পড়েছি; যাঁরা মানবিক গুণাবলির জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। মাহেরীন চৌধুরীও নিজেকে তাদের কাতারে নিয়ে যেতে পেরেছেন। তাঁর এই বীরত্বগাথা স্কুলের পাঠপুস্তকে সন্নিবেশিত হওয়া উচিত। যাতে নতুন প্রজন্ম মানুষের কল্যাণে ব্রতী হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারে। একই দিনে বিপরীত একটি ঘটনাও ঘটেছে। মাহেরীন যখন অগ্নিকুণ্ড থেকে শিশুদের বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন পোড়া শরীরে ঢালার জন্য প্রয়োজনীয় ঠান্ডা পানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল একশ্রেণির মানুষ নামের অমানুষ। এক বোতল পানি বিক্রি করেছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। আবার অগ্নিদগ্ধদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সিএনজি-অটোরিকশাচালকরা ‘মৌসুম’ বুঝে ভাড়া আদায় করেছে দুই-তিনগুণ। কী বিচিত্র আমাদের এই দেশ! যে দেশে একজন মাহেরীন নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে শিশুদের উদ্ধার করেন, সে দেশেই কতিপয় অর্থলোভী মওকা বুঝে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না। আমরা বোধ করি এমনই।