যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চশুল্ক হার নিয়ে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনাটি এখন ‘ভূরাজনীতি’-তে জড়িয়ে গেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং চীন ও ভারতের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশের সামনে এই চ্যালেঞ্জটা যে জটিল, সেটিই এখনকার কঠিন বাস্তবতা। এ প্রেক্ষাপট সামনে রেখে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আজ বিবেচিত। বলা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে যে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছেন, এর ব্যাপ্তি শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, সেটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত বিষয়ও।
নানা বাস্তবতায় অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত বিপর্যস্ত। ব্যবসা-বাণিজ্যেও চলছে মন্দাভাব। শিল্পকারখানা ধুঁকছে নানা অস্থিরতায়। একাধিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে বহু কারখানা। বন্ধ হওয়ার পথেও রয়েছে কোনো কোনোটি। বেকার হচ্ছে শ্রমিক। নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দ্রব্যমূল্যের চাপে মানুষ দিশাহারা। বলা চলে, দেশ ক্রমেই গভীর সংকটের দিকে এগোচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সংকট উত্তরণের ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি শুল্কহার কমিয়ে আনা। ইতোমধ্যে শুল্ক কমাতে একাধিক ধাপে আলোচনা হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক, নিরাপত্তাজনিত বা আইনি সংস্কারমূলক কিছু অবাণিজ্যিক শর্তÑ যেগুলো মেনে নিতে রাজি নয় ঢাকা। তবে শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ। সোমবার সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ও সম্ভাব্য চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে ২৪ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘অবাণিজ্যিক শর্তই শুল্ক চুক্তির পথে বাধা’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত তথ্য।
অবাধ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অবাণিজ্যিক শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়। উল্লেখ্য, অবাণিজ্যিক শুল্ক চুক্তি বলতে সাধারণত সেই চুক্তিকে বোঝায় যেখানে শুল্কের হার কমানোর ক্ষেত্রে বাণিজ্য-বহির্ভূত শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই ধরনের চুক্তিতে, একটি দেশ অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার সময় কিছু বিশেষ সুবিধা পেতে চায়, তার বিনিময়ে কিছু অবাণিজ্যিক শর্তপূরণ করতে হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে রয়ে গেছে উদ্বেগ। কোনো সার্বভৌম দেশের পক্ষে এ চুক্তির অনেক শর্ত মানা কঠিন। সেগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে ট্যারিফ হারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেটা বাংলাদেশকেও অনুসরণ করতে হবে। আবার কোনো একটি দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বা বাণিজ্য করা যাবে না। কোনো দেশের ওপর যদি অতিরিক্ত কোনো শুল্ক আরোপ করা হয়, বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে। এমনও হতে পারে নির্দিষ্ট একটি দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমরাস্ত্রবিষয়ক কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশ জড়াতে পারবে না। যা বাংলাদেশের স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থি।
বাংলাদেশের স্পষ্ট অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক হ্রাসে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা পেতে ‘অবাণিজ্যিক’ কোনো শর্তে রাজি নয়। নীতি মেনে বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু নিরাপত্তা বা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কোনো শর্তে নয়। ভিয়েতনাম ১২২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাড়িয়ে পাল্টা শুল্ক ৪৬ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের লক্ষ্যও শুল্কহার ২০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনা, যদিও এটা নির্ভর করছে পরবর্তী আলোচনার ফলাফলের ওপর। বাস্তবতা হলো, এই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে না পৌঁছতে পারলে আগের ১৫ শতাংশের সঙ্গে নতুন আরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে দেশটির বাজারে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। এতে আমাদের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় দুর্যোগ নেমে আসবে। অভিযোগ রয়েছে, পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রশাসন দরকষাকষির জন্য তিন মাস সময় দিলেও সেই সময়কে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। অহেতুক সময় নষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) সঙ্গে দুই দফা আলোচনা হলেও পাল্টা শুল্ক কমানোর যথাযথ কর্তৃপক্ষ যে ট্রাম্প প্রশাসন, সেটা বুঝে উঠতে সরকারের সময় লেগেছে। অনেক দেশ লবিস্ট নিয়োগ করে সফলতা পেলেও বাংলাদেশ সেটা পারেনি। আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকারের কোনো পক্ষই এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে আগে থেকে কোনো আলোচনা করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশুল্ক হারের বিষয়টি সমাধানে না পৌঁছলে, আমাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। দেশের অর্থনীতির বিরাজমান স্থবিরতা কাটাতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে তা বজায় রাখার পদক্ষেপও নিতে হবে। রপ্তানি পণ্যের নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির পদক্ষেপও নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপও নেওয়া দরকার। মনে রাখতে হবে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশই হচ্ছে বেসরকারি খাত। কাজেই এ খাতকে সক্রিয় রাখতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কেন বাড়ছে না, তাও দেখতে হবে।
তবে আমরা হতাশ নই। আমাদের বিশ্বাস এবং ভরসা সুদৃঢ়। কারণ চেষ্টাই সফলতা আনে। আশা করি, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে এবং বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি খাতের অংশীজনদের নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি প্রত্যাশিত অগ্রগতি সম্ভব হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয় এমন শর্তের বাইরে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশকে অর্থনীতির অচলাবস্থা থেকে উত্তরণেÑ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়া চলবে না।