মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি
মামুন রশীদ
অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছিল সকাল। মিষ্টি রোদ, ঝকঝকে আকাশ। নির্ধারিত সময়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি কর্মস্থলের উদ্দেশে। আজ প্রায় প্রত্যেকের হাতের মুঠোয় বিশ্ব। ফলে প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের খবরাখবরও নাগালের মধ্যে। সে পথেই দুপুর ১টার পর মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা খবর থেকে জানতে পারি রাজধানীর উত্তরায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে। বিমানটি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে গিয়ে পড়ে এবং বিধ্বস্ত হয়। প্রাথমিক খবরের সারাংশ ছিল এটুকুই। হতাহতের খবর তখনও আসেনি। এর আগেও নানা সময়ে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে পড়ার খবর এসেছে। সেসব প্রশিক্ষণ বিমান ঘনবসতি বা এমন কোনো ভবনের ওপর বিধ্বস্ত হয়নি। ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা কম ছিল। কিন্তু এবারে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় একটি স্কুল ভবনে। সম্প্রতি ভারতে একটি যাত্রীবাহী বিমান মেডিকেল কলেজের হোস্টেল ক্যান্টিনে ধসে পড়ায় যাত্রীদের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীরও মৃত্যু হয়। ফলে উত্তরার খবরটি জানার পর থেকেই শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। ছোট বোনের একমাত্র ছেলেও স্কুলটির শিক্ষার্থী। মুঠোফোনে বারবার কল করেও, তাদের খবর জানতে না পারায় উৎকণ্ঠা আরও জেঁকে বসতে থাকে। তবে দুপুরের পরেই ছোট বোন ও তার সন্তানের নিরাপদ ও সুস্থ থাকার সংবাদের স্বস্তি মিলিয়ে যেতে দেরি হয়নি। কিছুক্ষণ পরেই সংবাদে স্কুলে একজন নিহতের খবর নিশ্চিত করা হয়। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে মৃতের সংখ্যা। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ যেন পরিণত হয় এক বীভৎস মৃত্যুপুরীতে। দুর্ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-এ লেখা হয়, ‘হাজার মানুষের ভিড় ও কান্নার আওয়াজে ভারী হয়ে ওঠে দিয়াবাড়িসহ আশপাশের এলাকা। কিছুক্ষণ পর পর বের হয়ে আসতে থাকে অ্যাম্বুলেন্স। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার পরপরই কলেজ ক্যাম্পাসে ছুটে আসেন শিক্ষার্থীর বাবা-মা ও অভিভাবকরা। প্রিয় সন্তান নিরাপদে আছে কি না, ব্যাকুল হয়ে পড়েন বাবা-মা।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বার্তাকক্ষেও দুর্ঘটনাস্থলের যেসব ছবি এবং খবর আসতে থাকে তাতে পুরো বার্তাকক্ষই নিস্তব্ধ, নিথর হয়ে ওঠে। পুরো বার্তাকক্ষই পরিণত হয় নিঝুমপুরীতে। ব্যথা জানাবার ভাষা ছিল না কারও মুখে। শুকনো চোখে প্রতিটি মুখের বোবাকান্না স্পর্শ করছিল একে অন্যকে। বারবার হাত থমকে যাচ্ছিল কি-বোর্ডে। খবর সম্পাদনা করতেও কেঁপে উঠছিল হাত। সংবাদপত্রের প্রথম সংস্করণ যখন প্রেসে ছাপার জন্য তখনও নিহতের সংখ্যা ছিল কুড়ি জন। কিন্তু প্রথম সংস্করণ শেষে রাতের পালার সহকর্মীদের রেখে আমরা যখন বাড়ির পথে, ততক্ষণে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে আরও দুজন। আর সময় গড়াতেই সে সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৩১ জনে। হাসপাতালে, বার্ন ইউনিটে যে অসহায় শিশুরা কাতরাচ্ছে, তাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। ফলে সংখ্যাটি কোথায় স্থির হবে, কারও জানা নেই।
এর আগে এই জুলাইয়ে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই, ভয়াল সেই দিন কেড়ে নিয়েছিল আমাদের ৪৫টি পরিবারের স্বপ্ন। সেদিন দুপুরে মীরসরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা উপভোগ করে বাড়ি ফেরার পথে পিকআপ উল্টে ডোবার পানিতে ডুবে অকালে ঝরে পড়ে ৪৩ ছাত্রসহ ৪৫টি তাজা প্রাণ। নিহত শিশুদের ৩৪ জনই ছিল উপজেলার মায়ানী ইউনিয়নের আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। বাকিরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার ছাত্র ছিল।
ওই ঘটনার পর শিশুদের পরিবারের সদস্য এবং ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগেছে। শোকের ধাক্কা ও ট্রমা কাটিয়ে ওঠার জন্য নানান অবস্থার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছে। তখন মনোবিদও নিয়োগ দেওয়ার কথা জেনেছিলাম। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের শোকের ধাক্কা কাটাতে কত সময় লাগবে, তা অজানা। যে শিশুরা আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যেতে দেখল তাদেরই সহপাঠী, বন্ধু বা স্কুলের বড় ভাইকে। তাদের মনের ভেতরের সে দগদগে ক্ষত, সেই বীভ্ৎস স্মৃতি কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নির্ভর করছেÑ আমরা তাদের কতটা শুশ্রূষা দিয়ে আঘাত ঘোচাতে সহায়তা করব তার ওপর।
উত্তরায় এই দুর্ঘটনার পর আমরা যেমন মানবিক মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, তেমনি অমানবিকতার ছোঁয়াও নতুন করে দেখতে হয়েছে। পুড়ে ঝলছে যাওয়া শিক্ষার্থীরা যখন স্কুলের সীমানা থেকে বেরিয়ে এসে সাহায্যের জন্য ছুটছে, তখন একশ্রেণির মানুষ যেভাবে তাদের ঘিরে ধরে মুঠোফোনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত সময় পার করেছে, এই অমানবিকতার আসলে শেষ নেই। সামাজিক মাধ্যমে নানা জনের দেয়ালে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখা হয়েছে, উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন থেকে স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত হাসপাতালে যেতে রিকশা ভাড়া আদায় করা হয়েছে ১০০ টাকা। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাঁকা হয়েছে এক হাজার টাকা। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সাহায্য চাওয়ার পরও খোলা হয়নি ব্যক্তিগত গাড়ির দরজা। অপ্রয়োজনে, শুধু দেখার জন্য, আবার কেউ কেউ টিকটক এবং ফেসবুকে রিলস তৈরির জন্যও হাজির হয়েছেন দুর্ঘটনাস্থলে। এই অমানবিকতার উদাহরণ তৈরি হওয়া দৃশ্য হয়তো কখনোই মানুষ সম্পর্কে আমাদের কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসতে দেবে না। তারপরও ‘মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি তাহার পাশে দাঁড়াও’Ñ সেই মানুষের পাশে দাঁড়াতেই, রক্তের প্রয়োজন হবে ভেবেই অসংখ্য মানুষ রাতভর ছোটাছুটি করেছেন, পরিজনদের সহায়তার কথা ভেবে খুঁজে না পাওয়া শিশুর ছবি শেয়ার করেছেন। এ ছাড়াও নানাভাবে যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সে উদাহরণগুলোও আমাদের শেখার জন্য যথেষ্ট।
দুর্ঘটনাস্থলে আহত শিশুদের আর্তনাদ, বাবা-মায়ের আহাজারি-স্বজনের উৎকণ্ঠা আমাদের বিমূঢ় করেছে। তারপরও আমরা যেন ভুলে না যাই আমাদেরই এইসব হিংস্র ও লোভী অধ্যায়ের কথা। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও বা রিলস বানিয়ে জানি না কত টাকা আয় হবে, তবে খুব জানতে ইচ্ছে করে মানুষের এমন করুণ বেদনার দৃশ্য দেখিয়ে আয়ের টাকায় কি আগুনে ঝলসে যাওয়া শিশুর আর্তনাদের দৃশ্য ভেসে উঠবে না? একইভাবে কিছু হিংসা চিত্রও ঘুরেফিরে বেরিয়েছে সামাজিক মাধ্যমের দেয়ালে দেয়ালে, যা স্বভাবতই আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে। মানুষের মনের এই হিংসা ও প্রেমের মিশ্রণকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া, তবে তাতে যেন হিংসা ও ঘৃণার পাল্লা ভারী হয়ে না ওঠে। অসহায় মানুষের জীবন্ত পুড়ে কয়লা হওয়ার মর্মান্তিকতার ভেতরেও যাদের মনে জিঘাংসার জন্ম হয়েছে, তাতে মনের স্তরে স্তরে জমে থাকা প্রাগৈতিহাসিক যুগের অন্ধকার যে আজও তাড়া করছে, কলুষ মনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আছে, সেটি স্পষ্ট। এর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন হলেও তা হয়তো সহজ হবে না। সেক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা জরুরি আমাদের চিন্তার ঝোঁক কোনদিকে?
একইভাবে যেকোনো বিপর্যয়ে, দুর্যোগে আমরা নানামুখী পরিকল্পনার সঙ্গে আমাদের দুর্বলতা-অপূর্ণতাগুলোও খুঁজে দেখার চেষ্টা করি। রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমানোর বিষয়ে নানা সময়ে কম আলোচনা হয়নি। চাকরি, ব্যবসা, উদ্যোক্তা, পড়ালেখাÑ সবই কেন রাজধানীকেন্দ্রিক হতে হবে? মজার ছলে অনেকে বলেন, ‘ভিক্ষে করতেও রাজধানীতে আসা চাই, নইলে ভিক্ষে মিলবে না।’ কৌতুক করে বলা হলেও এর সত্যানুসন্ধান করলেও স্পষ্ট যে চিত্রটি সম্পূর্ণ অবাস্তব নয়। রাজধানীর প্রতি এই অন্তিম আনুগত্য, এখন ভালোর চেয়ে মন্দের দিকেই বেশি ঠেলছে। বিমান দুর্ঘটনার পর পোড়া রোগীর চিকিৎসায় রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আহতদের নিয়ে ছুটতে হলো আরেক প্রান্তে। অথচ সম্পদের সুষম বণ্টনের মতো, পরিকল্পনামাফিক প্রতিটি কাজই যদি এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বিপর্যয়েও আমাদের ঘুরে দাঁড়াবার সক্ষমতা থাকবে অনেক বেশি। রাজনৈতিক মোহ নয়, দেশকে ভালোবেসে-মানুষকে ভালোবেসে খুঁজে নিতে হবে বাস্তবানুগ সিদ্ধান্ত। সেই পথ ধরেই আসবে মুক্তি।
আর মৃত্যু মানে শুধু একটি জীবনের অবসান নয়। এতে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। আমরা কেউ চাইনি এভাবে মাত্র বারো-তেরো বছর বয়সেই সম্ভাবনাময় জীবনের অবসান ঘটবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের আদর মেখে যে শিশু ভবিষ্যৎ বুনতে গিয়েছিল, সেই ফিরে আসবে লাশ হয়ে। বাবার বুকের উষ্ণতা নিয়ে যে শিশু আকাশ ছোঁওয়ার স্বপ্ন বুকে বেঁধেছে, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপে বাবাকে তার সন্তানের শরীর খুঁজতে হবে। এই বেদনা প্রকাশে অক্ষম হয়েই কবি শামসুর রাহমানের লেখা কবিতার ভাষায় বলি, ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?/ তেমন যোগ্য সমাধি কই?/ মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো/ অথবা সুনীল-সাগর-জল-/ সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই!/ তাইতো রাখিনা এ লাশ আজ/ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,/হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।’