অদক্ষতা ও অবহেলা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৫ ১৭:২২ পিএম
ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তানিরা গেছে, এখন এ রাষ্ট্র আমাদের। বাইরের কেউ এসে আমাদের কিছু করে দিয়ে যাবে না। এখন আমরাই রাজা, আমরাই প্রজা, এ রাজ্যপাট আমাদের একান্তই নিজের। এখানকার শাসন, প্রশাসন, উন্নতি, অবনতি, পরিকল্পনা, প্রকল্প সব আমাদের নিজের হাতে। কাজেই সব সাফল্যের কৃতিত্ব ও ব্যর্থতার দায় কেবলই আমাদের। আমরা যদি কোনো কারণে পিছিয়ে যাই, ব্যর্থ হই তবে তার দায়ভারও বাইরের আর কারও কাঁধে চাপাবার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার পয়লা পাতায় গতকাল সোমবার একটা খবর ছাপা হয়েছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো ‘ঋণ ফেরত নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের অদক্ষতা ও অবহেলার অনন্য নজির গড়েছে ‘প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডিজিটাল এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ (প্রাইড) প্রকল্প। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতে নেওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ সাড়ে চার বছর শেষ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। এমন বেহাল অবস্থা দেখে বিশ্বব্যাংক ৭ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের ঋণ বাতিল করেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৮৬০ কোটি টাকা। এই নির্মম সত্যটি উঠে এসেছে সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) আয়োজিত প্রাইড প্রকল্পের পরামর্শক কমিটির সভায়। বলতে দ্বিধা নেই, প্রকল্পটির অর্থায়ন বাতিল হওয়ায় দেশ এক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ল। কারণ বাংলাদেশ অন্য বড় দুটি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের কাছে ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রকল্প দুটির প্রাথমিক কাজ করতেই বিশ্বব্যাংক ৫০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করেছিল। কিন্তু এই ঋণ বাতিল হওয়ায় পরবর্তী ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিল।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিশ্বব্যাংক প্রাইড প্রকল্পের জন্য ২০২০ সালের জুনে এই ঋণ অনুমোদন করে। ঋণের আওতায় মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, কারওয়ান বাজারের জনতা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক (এসটিপি) পুনর্নির্মাণ এবং এর পাশে আরেকটি নতুন এসটিপি নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি পেরিয়ে গেলেও বিশ্বব্যাংকের মোট প্রতিশ্রুত ঋণের মাত্র ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা থাকায় প্রাইড প্রকল্পটি বর্তমানে পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি, প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিস্ময়কর হলো, এত বড় বাজেট হওয়া সত্ত্বেও প্রকল্প দুটি এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৯ দশমিক ২০ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা খুবই হতাশাজনক। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পে বিলম্ব কেবল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সংকোচনের দিকেই নয়, বরং সরকারের সক্ষমতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি এবং প্রশাসনিক জটিলতাকে চিহ্নিত করেছে। কাজেই এই বিষয়ে এখনই সতর্ক না হলে, ডিজিটাল কর্মমুখী বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বাংলাদেশ সাধারণত বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং প্রধান বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান থেকে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। বিদেশি ঋণের সুদ আপাতদৃষ্টিতে কম শোনানো হলেও ডলার ও টাকার বিনিময় হারের হিসাব করলে কার্যকর সুদহার অনেক বেশি। এসব ঋণ দেওয়া হয় বহু শর্তের বিপরীতে এবং চড়া সুদে। উদ্দেশ্য ওইসব দেশে কর্মসংস্থানসহ বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলা। বিগত পতিত সরকারের দুর্নীতি, অর্থ পাচার, লুটপাটের বিষয়গুলো সর্বজনবিদিত। তখন দেশজুড়ে বিপুল উন্নয়নের স্লোগান তুলে বিদেশি ঋণনির্ভর প্রবণতায় ঝুঁকে ছিল সরকার। অনেকটা বাংলা প্রবাদের ‘ঋণ করে ঘি খাই’-এর মতো। দেখা গেছে, সুদে নেওয়া এসব ঋণের বেশিরভাগই পরামর্শক উচ্চ ফি এবং নিজেদের পকেটে, তাদের ভোগবিলাসে ব্যবহার হয়েছে। প্রকল্পগুলো নিয়ে ছিল না রাষ্ট্রের কোনো তদারকি বা তাগিদও। পরে ঋণের নানা শর্তের বেড়াজালে পড়ে শেষে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে। কারণ অবাধে লুটপাট চলেছে বিভিন্ন প্রকল্পে। লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, অনেকের পরিবারের স্থায়ী আবাসন হয়েছে উন্নতশীল দেশে তথা আলোচিত ‘সেকেন্ড হোম বা ‘বেগম পাড়ায়’। যার কোনো জবাবদিহি নেই। আর ঋণের বোঝা বেড়েছে দেশের এবং এদেশের জনগণের। ভোগ করবে সুবিধাবাদীরা আর সুদ বা ঋণ বহন করবে দেশের জনগণ। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ১১ মাসের বেশি ক্ষমতায়, এসব প্রকল্পের কাজের অগ্রগতিতে তাদের জবাবদিহিতাও স্পষ্ট নয়। এ দায় তাদেরও রয়েছে। আমরা মনে করি, এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। এসব প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতে এসব উন্নয়ন কাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
আসলে এসব আর্থিক খাতে সুশাসন অতীব জরুরি। বিগত সরকারের আমলে আইনের শাসন ছিল না। তাই এসব অপকর্মে যারা যুক্ত তাদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি। বর্তমান সরকার আইনের সুনিশ্চিত ব্যবহারের পদক্ষেপ নিবেন আশা করি। মনে রাখতে হবে, শরীরের একটি অঙ্গ পঙ্গু রেখে যেমন শরীর সুস্থ রাখা যায় না, তেমনি আর্থিক প্রকল্পে অস্বচ্ছতা ও দুর্বলতা রেখে কোনোভাবেই দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি করা যাবে না। তাই অন্যসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও আমরা শঙ্কিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি না হয়, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চয়তা চাই। এত বিপুল বরাদ্দের প্রকল্প ব্যর্থ হোক, আমরা চাই না।