জাতিসংঘ অফিস
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৫ ১৭:১৯ পিএম
মীর আব্দুল আলীম
ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের অফিস খোলার খবর নেহাতই কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একাধারে একটি কূটনৈতিক বার্তা, আবার একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের একটি নতুন মাত্রা। সরকার একে উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ বললেও, বিশ্লেষকরা দেখছেন আন্তর্জাতিকীকরণ বা ‘বিদেশি হস্তক্ষেপের’ সূচনা হিসেবে। সাধারণ নাগরিক, সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহলÑ এই অফিস কি সত্যিই দেশে মানবাধিকার সুরক্ষার পথ দেখাবে, নাকি এটি হয়ে উঠবে আরেকটি ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’? যে দেশে রাজনৈতিক বিভাজন গভীর, সেখানে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সরাসরি উপস্থিতি নিঃসন্দেহে নানা প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাবনার জন্ম দেয়। তাই এই ঘটনা কেবল মানবাধিকার নয়, বরং সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আস্থার প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠেÑ এই অফিস কি এক আশাব্যঞ্জক সহযোগী, নাকি ভবিষ্যতের কোনো অস্বস্তিকর কূটনৈতিক জটিলতার সূচনা?
সামনে প্রশ্ন আসে এটি সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নয়তো? জাতিসংঘের উপস্থিতিকে অনেকেই দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরনের চোখরাঙানি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে, এমন একটি সংস্থা, যার কাজ মানবাধিকারের লঙ্ঘন খুঁজে বের করে তা আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করা, সেটি যদি স্থানীয়ভাবে থেকে কাজ করে তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ও নীতিমালায় বিদেশি প্রভাব অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে দেশে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড কিংবা বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে জাতিসংঘের তরফ থেকে। এর ফলে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।
ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো জাতিসংঘের উপস্থিতিকে শুধু একটি মানবাধিকার তদারকির বিষয় হিসেবে না দেখে বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও ধর্মীয় অনুপ্রবেশ বলেই চিহ্নিত করছে। তাদের প্রধান আশঙ্কা হলো, জাতিসংঘের মানবাধিকার এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে এলজিবিটিকিউ অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীবাদ এবং ধর্মীয় সমালোচনার স্বেচ্ছাচার রয়েছে, যা বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলামপন্থিরা মনে করে, এসব ইস্যুতে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের মূল্যবোধ ও সামাজিক গঠনকে নড়বড়ে করার চেষ্টা চলবে। ফলে এটি রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দ্বন্দ্বেও রূপ নিতে পারে। বামপন্থিরা যারা দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তারাও এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, দেশের সমস্যার সমাধান দেশের ভেতর থেকেই হওয়া উচিত; কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠন এসে দিনের পর দিন তদারকি করে যাবে, এটি একধরনের ঔপনিবেশিক পদ্ধতির আধুনিক রূপ। অনেক বামপন্থি নেতা বলেছেন, জাতিসংঘ যে দেশে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি, সেই জাতিসংঘ এখন বাংলাদেশে ‘পাহারাদার’ হয়ে বসতে চায়। তারা একে ‘সাদা চামড়ার আধিপত্য’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপি সুস্পষ্ট কোনো বিবৃতি না দিলেও, দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন যে, তারা এই সিদ্ধান্তকে ন্যায্য ও সময়োপযোগী মনে করছেন। তাদের মতে, সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো এতদিন দেশে দমন করা হতো বা অস্বীকার করা হতো। কিন্তু জাতিসংঘের অফিস থাকলে সেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ পাবে, যা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে দলের ভেতরে একটি অংশ এটিকে দ্বৈত নীতির উদাহরণ হিসেবেও দেখছেনÑ একদিকে জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে বিদেশি হস্তক্ষেপের আশ্রয়। ফলে বিএনপির অবস্থান এখনও পরিপূর্ণভাবে স্পষ্ট নয়, কিন্তু এটাও সত্যি যে তারা পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগে পরিণত করতে চাইছে।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘকে অফিস স্থাপনের অনুমতি দিলেও, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। কেউ এটিকে সরকারের উদারতা ও আত্মবিশ্বাসের নিদর্শন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে জাতীয় নিয়ন্ত্রণহীনতার দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন। সরকার যদি সত্যিই আত্মবিশ্বাসী হয় যে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন নেই, তাহলে জাতিসংঘের উপস্থিতি তার পক্ষে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে সরকারি মহলে একটা চাপা উদ্বেগ রয়েছেÑ জাতিসংঘের দপ্তর দেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্বমঞ্চে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
জাতিসংঘের অফিস সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং স্বাধীন মিডিয়ার জন্য একদিকে হতে পারে আন্তর্জাতিক সহায়তার দরজা; অন্যদিকে হতে পারে নতুন পর্যবেক্ষণ ও সন্দেহের কারণ। যারা সত্যিকার অর্থে মানবাধিকারের জন্য কাজ করেন, তাদের জন্য জাতিসংঘ একটি প্লাটফর্ম দিতে পারে যেখান থেকে তারা আন্তর্জাতিক মহলে বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন মহল তাদেরকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে, যা তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক চাপ বাড়াবে। বিশেষত, মিডিয়াকে যেভাবে বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেখানে জাতিসংঘ-সমর্থিত সংবাদ বা বিশ্লেষণকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে তিরস্কার করা হতে পারে। ফলে সুবিধা ও ঝুঁকি দুই-ই থাকবে।
জাতিসংঘের অফিস স্থাপনের ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সিগন্যাল দিতে পারে যে, বাংলাদেশ মানবাধিকার রক্ষায় আন্তরিক। এতে করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রকল্পে সহায়তা পেতে বাংলাদেশ বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। আবার অন্যদিকে, যদি জাতিসংঘের রিপোর্টে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিক প্রমাণ উঠে আসে, তাহলে সেইসব সহযোগী দেশ অনুদান বা বাণিজ্য চুক্তিতে শর্তারোপ করতে পারে। অর্থাৎ এটিকে একসঙ্গে সুযোগ এবং চাপ দুই-ই হিসেবে দেখা যায়।
মানবাধিকার দপ্তর থাকলে যেকোনো নিপীড়িত, গুমের শিকার পরিবার বা নির্যাতিত নাগরিক আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে, যেসব নাগরিক দমন-পীড়নের শিকার হয়ে জাতীয়ভাবে ন্যায়বিচার পায় না, তারা জাতিসংঘের কাছে সরাসরি অভিযোগ করতে পারবেন। এটি রাজনৈতিক আন্দোলনকারীদের জন্য একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক শক্তি হবে। ফলে সরকার বিরোধী রাজনীতির একটি পরোক্ষ ব্যাকআপ হিসেবে জাতিসংঘ অফিস কার্যকর হতে পারে।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত আসা নিছক কাকতালীয় নয়Ñ এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকের। অতীতের নির্বাচনে গুম-খুন, ভোট ডাকাতি, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি অভিযোগ যেভাবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিধ্বনি তুলেছে, এবার জাতিসংঘ অফিস সরাসরি মাঠে থাকলে ওইসব অভিযোগের তথ্যপ্রমাণ এবং অনুসন্ধান আরও বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। সুতরাং এটি নিছক মানবাধিকার নয়, বরং বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ ও মনিটরিংয়ের ইঙ্গিতবাহী বার্তা। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের তরুণ সদস্যদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ গণতন্ত্র, অধিকার ও স্বচ্ছতার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। জাতিসংঘের অফিস তাদেরকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো ও চর্চার সঙ্গে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তরুণদের মধ্যে যারা মানবাধিকার ও কূটনীতিতে আগ্রহী, তারা এই অফিসের মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ, কর্মসূচি বা নেটওয়ার্কিং-এর সুযোগ পেতে পারেন। তবে একই সঙ্গে এটি তরুণদের মধ্যে একটি ‘বিদেশমুখী’ বা ‘আন্তর্জাতিক নির্ভরতামূলক’ চেতনা গড়ে তুলতে পারে, যা জাতীয় রাজনীতির জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এদিকে ভারত, চীন ও রাশিয়াÑ এই তিন দেশের মধ্যে মানবাধিকারের প্রশ্নে জাতিসংঘকে নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বৈতনীতি রয়েছে। ভারত নিজেই জাতিসংঘের এমন পর্যবেক্ষণ অনেক সময় প্রত্যাখ্যান করে, চীন তো একে ‘পশ্চিমা আধিপত্যবাদ’ বলে খারিজ করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে জাতিসংঘের অফিস স্থাপন ভারত বা চীনের কাছে কেমন বার্তা পাঠাবে? যদি তারা মনে করে, এ অঞ্চলে পশ্চিমা প্রভাব বাড়ছে, তাহলে বাংলাদেশ তাদের কূটনৈতিক চাপ বা সন্দেহের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে, চীন-পাকিস্তান জোটের দিক থেকেও এটি একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদি জাতিসংঘের এই অফিস নিরপেক্ষতা হারায়, পক্ষপাতিত্ব করে বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত মেলামেশা করে তাহলে সেটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘বুমেরাং’ হয়ে ফিরে আসবে। এমনকি জনগণের মধ্যেও জাতিসংঘের প্রতি আস্থা কমে যাবে।
অতীতে আফগানিস্তান, ইরাক বা সিরিয়ায় জাতিসংঘ যেভাবে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছে, সেসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশেও তুলনা টানতে পারে। কাজেই জাতিসংঘের নিজেদের ভূমিকা হতে হবে অত্যন্ত পেশাদার, ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রমাণনির্ভর। অন্যথায় এটিকে সরকারও ব্যবহার করতে পারে একটি ব্যর্থ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হিসেবে।