× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জননিরাপত্তা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে

এলিনা খান

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম

এলিনা খান

এলিনা খান

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একের পর এক যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনও। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্নকেও এসব ঘটনা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় বছর গড়াতে চলল, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি, বরং অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দিন দিন পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে। এমনটা তো কোনোভাবেই আমাদের কাম্য ছিল না। বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি কথাই মনে আসে- সেটি হলো, আমরা যে অবস্থায় প্রতিদিন আতঙ্কে দিনাতিপাত করছি, তা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে দুঃখজনক এবং চরম লজ্জার।

এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে একটিই অনুরোধ, যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিজের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সফল হতে না পারেন তাহলে স্বেচ্ছায় নিজ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়াই শ্রেয়। আর যদি নিজের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছা থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দক্ষ এবং যোগ্য লোকদের সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়োগ দিন। এক্ষেত্রে দায়িত্ব যতদিনই পালন করুক না কেন, সদিচ্ছার নজির গড়তে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। 

কিন্তু যারা দায়িত্বশীল, তাদের মধ্যে যদি এমন ধারণা দৃঢ় হয় যে- যতদিন নির্বাচন না হবে ততদিন কোনোরকমে অন্তর্বর্তী দায়িত্বপালন করলেই হবে, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। আর এমনটি করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কাই রয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ইতোমধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পন্নের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করাও কঠিন হবে। শুধু তাই নয়, মানবাধিকার পরিস্থিতিও ক্রমেই নাজুক হতে শুরু করবে, যা বহির্বিশ্বেও আমাদের জন্য শুভবার্তা বহন করবে না। সেজন্যই এ দায়িত্বকে অন্তর্বর্তী সময়ের দায়িত্ব বলে ভাবা চলবে না। কারণ দীর্ঘদিন পর সম্মিলিতভাবে আমাদের সামনে সার্বিক সংকট সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। 

অতীতের সরকারের ব্যর্থতা আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করেছি। কিন্তু একটি নতুন প্রেক্ষাপটে যখন বিরল উদাহরণের নজির হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তখন সংগতই আমরা তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ব্যর্থতার দায়ও কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। এক্ষেত্রে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়বদ্ধতাও তাদের রয়েছে। ফলে, দেশে যে প্রেক্ষাপটেই কোনো অপরাধ সংঘটিত হোক না কেন, অপরাধীদের ছাড় দেওয়া চলবে না। দল, মত, জাতি, গোত্র নির্বিশেষে কোথাও আইনের বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করা চলবে না। এমনটি হলে, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। 

জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনায় উত্তরণে আমাদের যে আত্মত্যাগ তাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু সেটি শুধু অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার কারণেও নষ্ট হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থান না নিলে সেই সুযোগটিই নেবে অপতৎপরতাকারীরা। মনে রাখতে হবে, কোনো অপতৎপরতাকারী কখনও আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না। অর্থের লোভে তারা সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করে। ফলে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য আমাদের জন্য বিষফোড়া হয়ে ওঠে। সেজন্যই রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক হতে হবে। দলীয় আদর্শের ভেক ধরে যারা নানা পন্থায় রাজনৈতিক দলকে বিতর্কিত করে তুলছে, তাদের শুধু বহিষ্কার করেই সমাধান মিলবে না। তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দন করতে হবে। আমরা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নই। কিন্তু অপরাধীর বিচার নিজ হাতে করার কু-নজির স্থাপনের দায়ও রাজনৈতিক দলগুলো এড়াতে পারে না। তাই সমাজে দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই রাজনৈতিক দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। স্বাভাবিকভাবেই সবার মধ্যে অনেক প্রত্যাশা ছিল, দেশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিশ্চিত করতে পেরেছেন কি না, এ প্রশ্ন করতেই হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারা বক্তব্যে সংস্কারের কথা বলা ছাড়া কার্যক্ষেত্রে তা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা দেখছি, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবরই নিজের দায়িত্ব ও সংস্কারের উদ্যোগের বিষয়টি স্পষ্ট করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বাকি উপদেষ্টারা যেন নানাভাবে শুধু বক্তব্যের মাধ্যমেই দায় সারতে চাইছেন। এ ধরনের ভাবনা সংস্কারের যে চেতনা তার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করছে। শুধু প্রধান উপদেষ্টার ওপর সব দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। সবাইকেই নিজের নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক করতে হবে। এ কথা মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। জনগণই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ গতিবিধি। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। বিষয়টি ভাবনায় রেখেই সরকারকে এগোতে হবে। কারণ জবাবদিহির বিষয়টি সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে থাকার পরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, প্রভাবশালীদের দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ের পাশাপাশি যেকোনো অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়, তখন অপরাধীর পক্ষে আইনি ফাঁকফোকর বের করা সহজ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের আলামতও নষ্ট করার সুযোগ থাকে। মব কিলিংয়ের পেছনে বৈষম্যেরও একটি বড় প্রভাব রয়েছে। বিগত দিনে যারা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে নানাভাবে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে এবং ন্যায়বিচার পায়নি তাদেরই একাংশ একসময় আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে মব কিলিংয়ের আশ্রয় নেয়। কিন্তু এমনটি তো মোটেও কাম্য নয়। আমাদেরকে আইনের মাধ্যমে অপরাধীর বিচার নিশ্চিতকরণে কাজ করতে হবে।

এজন্য এ মুহূর্তে আমাদের জন্য জরুরি হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে তাদেরকে পরিপূর্ণভাবে দায়িত্বপালনের উপযুক্ত করা। আইনের গতিশীলতা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ে কাজ করবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একজন মানুষ যদি কোনো অপরাধ করে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা জরুরি। কারণ অপরাধের যেমন মাত্রা রয়েছে এবং তেমনি তার প্রভাবও রয়েছে। এই মাত্রা ও প্রভাব নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করার জন্যই রয়েছেন আদালত। কিন্তু অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন না করে তার কৃত অপরাধের জন্য আইনবহির্ভূতভাবে মেরে ফেলা স্পষ্টতই মানবাধিকারের লঙ্ঘন। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাকে আইন অনুযায়ী উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র ধারণায় স্বাধীনতা বলতে মূলত আইনের প্রতি নাগরিকের শ্রদ্ধাকেই বোঝায়। এজন্যই উন্নত দেশগুলোতেও আমরা দেখি, রাষ্ট্রপ্রধানও যদি অপরাধ করেন, তাহলে তাকেও প্রচলিত আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হয়। আইন কারও ক্ষেত্রে বৈষম্য করে না এবং আইনি অবকাঠামো যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকে তাহলে সমাজে কোনো অপরাধীরই পার পাওয়ার সুযোগ থাকে না। 

তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে কিছু অনুরোধ থাকবে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা পর্যবেক্ষণে মনে হয় এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের প্রতিটি জেলায় বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই শুধু নয়, সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিয়েই সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা গড়তে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা সাপেক্ষে একটি সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগুতে হবে। এক্ষেত্রে সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদি তা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে আমরা ভয়াবহ ঝুঁকির সম্মুখীন হব।

দেশে প্রশাসনিক কার্যক্রম নিশ্চিত করার জন্য আটটি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগে জনবলও রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় এখন যোগাযোগও হয়েছে অনেক সহজ। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত রসদ আমাদের হাতে রয়েছে। এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন, সঠিক কৌশল অনুসরণ করা। তাই সুষ্ঠু পরিকল্পনার জন্য দেশজুড়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন নেই। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে আলাদা সময় দিলেই সমাধান মিলবে। তিনি একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। এসব বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তার হাতে সব ধরনের ক্ষমতা রয়েছে। তিনি তার মতো পর্যবেক্ষণ করবেন। সেই অনুসারেই এগোবেন। প্রয়োজনে জনগণের সহায়তাও নেবেন। এভাবেই আমাদের বর্তমান আইনশৃখলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ করতে হবে। যদি তা করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত কঠিন হতে চলেছে।

  • আইনজীবী ও চেয়ারপারসন, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা