নগরায়ণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৫ ১৬:০৫ পিএম
সাধারণত পরিকল্পিত নগরায়ণ হলো- যেখানে ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো, পরিবহন ব্যবস্থা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে একটি বাসযোগ্য এবং টেকসই নগর ব্যবস্থা গড়ে ওঠা; যেখানে জীবনযাত্রার মান হবে উন্নত, অভ্যন্তরীণ কাঠামো হবে সুদৃশ্য এবং পরিবেশসম্মত। রাজধানী ঢাকার খুব কাছে তেমনি একটি পরিকল্পিত আবাসিক প্রকল্প ‘পূর্বাচল নতুন শহর’। ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে অবিন্যস্ত ও অপরিকল্পিতভাবে। রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমাতে একটি পরিকল্পিত আবাসনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা হয়েছিল বৃহৎ এই নতুন শহরটির। যার দায়িত্বে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, সংস্থাটির অদক্ষতা ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে বারবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও প্রকল্পটির বাস্তব রূপ এখনও অধরা। প্রকল্পের অগ্রগতি এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘসূত্রতায় বিপর্যস্ত প্রকল্পটি এখন চরম হতাশায় ফেলেছে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের। এখনও বসতি গড়ে ওঠেনি প্রতিশ্রুত এই শহরটিতে।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে ঢাকার পূর্বদিকে শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের মাঝখানে রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জে ৬ হাজার ২১৩ একর জমিতে নতুন শহর গড়ার পরিকল্পনা নেয় রাজউক। ৩০টি সেক্টরে ভাগ করা প্রকল্পের প্রায় ৯৬ শতাংশ ভূমির উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে বলা হলেও বাস্তব চিত্র বলছে উল্টো। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও গ্যাস সংযোগ, সড়কবাতি, খেলার মাঠ, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম সবই অনুপস্থিত। প্রকল্পে ৯৪টি মসজিদের জমি নির্ধারণ, ৪টি থানা ও ৬টি পুলিশ ফাঁড়ির স্থান নির্ধারিত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। পার্ক, ফুটপাত ও কমিউনিটি স্পেস এখনও নকশাতেই সীমাবদ্ধ। পড়ে আছে খালি জায়গা। সড়কবাতি না থাকায় রাতে গোটা এলাকায় অন্ধকার নেমে আসে। দিনের আলোয় যতটা সুন্দর পূর্বাচল উপশহর, রাতের আঁধারে ঠিক ততটাই যেন ভয়ংকর। এখানে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছিনতাই, ডাকাতি, খুনসহ নানা অপরাধ। জনবসতি না থাকায় অপরাধীরা জায়গাটিকে ব্যবহার করে।
১৯ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘পূর্বাচলে নতুন শহর গড়ে ওঠেনি তিন দশকেও’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উপশহরটির নানা চিত্র। প্রতিবেদন বলছে, পূর্বাচল প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে ৮বার বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সময়সীমা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর; পরে তা আরও ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এরপর আর মেয়াদ বাড়ানো হবে নাÑ এমন ঘোষণাও দিয়েছে রাজউক। সংস্থাটির দাবি, ৩৬৫ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ৩৪৫ কিলোমিটার এবং ৫৬টি ব্রিজের মধ্যে ৫২টি ব্রিজ নির্মাণ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চিঠি দিচ্ছে সংস্থাটি। শুধু তাই নয়, পূর্বাচলের ১, ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরে বাড়ি নির্মাণে চাপ দিচ্ছে রাজউক। চলতি বছরের মে মাসে এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ভূমি, প্লট, স্পেস ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ) বিধিমালা, ২০২৪’-এর ধারা ৯ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়ি নির্মাণ বাধ্যতামূলক। বরাদ্দগ্রহীতারা প্লটের ইজারা বা লিজ দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর পানি সরবরাহ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থায় আবেদন করতে পারবেন। বাধ্যবাধকতা না মানলে প্লট বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের তথ্যানুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের আবাসিক প্লট মোট ২৬ হাজার ২১৩টিÑ যার মধ্যে তিন কাঠা আয়তনের ১১ হাজার ২০৯টি, পাঁচ কাঠা আয়তনের ১০ হাজার ৩৬১টি, ৭ দশমিক ৫ কাঠা আয়তনের দুই হাজার ৬১৮টি, ১০ কাঠা আয়তনের প্লট দুই হাজার ২৫টি। এ ছাড়া অন্যান্য প্লট আছে তিন হাজার ৫৬৩টি। এর মধ্যে কম-বেশি আয়তনের ১৫টি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, প্রশাসনিক ৪৭২টি, বাণিজ্যিক এক হাজার ৩৩টি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আরবান ফ্যাসিলিটিস প্লট দুই হাজার ৪৩টি। আদি অধিবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বরাদ্দ দেওয়া প্লটের সংখ্যা সাত হাজার ৮৬৪টি।
রাজউকের দাবি, প্রকল্প এলাকায় ৪৩ কিলোমিটার লেক, শীতলক্ষ্যা নদী ও বালু নদের তীর সংরক্ষণ, পুরো এলাকায় পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহসহ নানা কাজ করতে হচ্ছে সংস্থাটিকে। ইতোমধ্যে রাজউক ৪টি স্কুল করে দিয়েছে। ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করার জন্য জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পানি, ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ সমস্যার সমাধান করবে ওয়াসা। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, থানা করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ১৫টি সেক্টরে সম্পূর্ণ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হবে। এতসব অগ্রগতির পরও এখনও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে উঠেনি উল্লেখিত শহরটিতে।
আরামদায়ক, নিরাপদ এবং কাঙ্ক্ষিত জীবনযাপনের জন্য উপযুক্ত একটি বাড়ি অনেকেরই স্বপ্ন। যেখানে ব্যক্তি বা পরিবার তাদের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বসবাস করতে পারে। পূর্বাচল নতুন শহরে প্লটপ্রাপ্তরা সেই স্বপ্নই বুনছেন অনেক দিন ধরে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু পূর্বাচলের কার্যত কোনো উন্নতি হয় না। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে যেন প্রকল্পের চরিত্র পাল্টে যায়। বলা যায়, রাজউক সৃষ্ট পূর্বাচল আজ চূড়ান্ত বৈষম্যের শিকার। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সংযোগ এক্সপ্রেসওয়ে বানানো হলো, নানা অবকাঠামোর গড়ে তোলা হলো কিন্তু পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করার উপযোগী আজও করা গেল না। বরং নানা উসিলায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে, কাজ শেষ হচ্ছে না। পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের বিশ্বাস, কর্তৃপক্ষ শিগিগির পূর্বাচল নতুন শহরে সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলবে।