স্মৃতি চক্রবর্তী
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫ ২৩:০৫ পিএম
আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৫ ২৩:২৩ পিএম
গুরুতর প্রতিবন্ধীদের জন্য পরিচর্যাকারী (কেয়ারগিভার) নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মূল উদ্দেশ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যাতে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তা পেতে পারে। গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক, মানসিক বা বোধশক্তির সমস্যায় ভোগেন। ফলে তারা সাধারণ জীবনে অনেক কাজ করতে অক্ষম। তাদের জন্য প্রয়োজন দক্ষ পরিচর্যাকারীর। তাদের কাজ শুধু শারীরিক যত্ন নেওয়া নয়, একই সঙ্গে সহায়তা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সহায়তা প্রদানও এর অন্তর্ভুক্ত।
পরিচর্যাকারীকে প্রতিবন্ধীদের সেই মানসিক চাপ মেটাতে সাহায্য করতে হয়। কোনো কোনো গুরুতর প্রতিবন্ধীর জন্য বিশেষ চিকিৎসা এবং থেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। পরিচর্যাকারীকে এই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও সম্পাদন করতে হয়। একজন যোগ্য পরিচর্যাকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য পরিচর্যাকারী নিয়োগের মাধ্যমে তার পরিবার অনেক চাপ থেকে মুক্তি পায়। যখন একজন গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যদি সঠিক পরিচর্যা পান, তখন তার জন্য সামাজিক অন্তর্ভুক্তিও সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞ পরিচর্যাকারীরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক উন্নতির জন্য কাজ করছেন। বাংলাদেশে গুরুতর প্রতিবন্ধীদের জন্য পরিচর্যাকারী নিয়োগ একটি তুলনামূলক নতুন ধারণা হলেও কিছু এনজিও এবং বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে কিছু সেবা প্রদান করা হচ্ছে। যেমন ব্র্যাক এবং পিপলস অ্যাডভাকেসি ফাউন্ডেশন (পিএএফ) প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ পরিচর্যাকারী প্রদান করছে। এসব কর্মসূচি থেকে পাওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত পরিচর্যাকারী নিয়োগের ফলে তাদের শারীরিক উন্নতি এবং মানসিক স্থিতি বেড়েছে। এখনও অনেক দেশে, বিশেষত বাংলাদেশে গুরুতর প্রতিবন্ধীর জন্য প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী পাওয়া কঠিন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কম পারিশ্রমিক এবং সমাজে তাদের গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে এসব পরিচর্যাকারীর সংখ্যা সীমিত। পরিচর্যাকারী নিয়োগের জন্য খরচ অনেক বেশি হতে পারে, যা অনেক পরিবারের জন্য একটি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিচর্যাকারীদের পেশাগত মানসিকতা এবং শ্রদ্ধা না থাকলে তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক হতে পারে। সরকার এবং এনজিওর মাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে পরিচর্যাকারীরা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে। গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান জরুরি, যাতে তারা পরিচর্যাকারী নিয়োগ করতে সক্ষম হয়। সরকারি সাহায্য এবং ভাতা এই ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। পরিচর্যাকারী পেশাকে সমাজে সম্মানজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে আরও বেশি মানুষ এই পেশায় প্রবেশ করতে আগ্রহী হয়।
উইমেন উইথ ডিজেবিলিটি ডেভলেপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি এ ব্যাপারে বলেন, প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে পরিচর্চাকারীর প্রয়োজনীয়তা খুব বেশি। আমাদের দেশে ১২ ধরনের প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুদের জন্য পরিচর্যাকারী আরও বেশি প্রয়োজন। স্বল্পমাত্রার মধ্যে মাত্রার এবং গুরুতর প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে অবস্থান অনুযায়ী পরিচর্যাকারী নিযুক্ত করার অবশ্যকতা রয়েছে। আমাদের দেশে কেয়ারগিভার বা পরিচর্যাকারী বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মনে করা হয় তারা গৃহকর্মীর মতো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়, তাদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান আবশ্যক। কেয়ারগিভারের স্ট্যাটাস হলো, একজন প্রতিবন্ধীর সহযোগী শক্তি। যেসব প্রতিবন্ধী পরিবারের কেয়ারগিভার নিযুক্তের সক্ষমতা নেই তাদের দিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
ঢাকার মিরপুরে ৩৫ বছর বয়সি মায়া (ছদ্মনাম), যিনি সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত, তিনি পরিবারের সহায়তা ছাড়া বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না। তার মা কেয়ারগিভারের ভূমিকা পালন করলেও বয়সজনিত কারণে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর প্রতিবন্ধীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ৫২%, এবং তাদের ৭৫%-এর বেশি প্রতিদিন নির্ভর করেন অন্যের সহায়তায়। তা ছাড়া, গ্রামাঞ্চলে কেয়ারগিভার পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। একজন প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার শারীরিক ও মানসিক সেবার পাশাপাশি সামাজিক পুনঃসংযুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কেয়ারগিভারের নিয়মিত উপস্থিতি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায়, আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং পরিবারিক বোঝাও হ্রাস করে। গুরুতর প্রতিবন্ধী বিশেষ করে নারীদের জন্য কেয়ারগিভারের ব্যবস্থা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্বও।