তাহমিনা আক্তার
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫ ২২:৫৮ পিএম
প্রতিটি স্বাবলম্বী ছেলেমেয়ে এখন চায় ছোট পরিবার। ফলে তাদের কাছে বাবা-মা হয়ে ওঠে নিছক বাড়তি ঝামেলা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান যুগে দেশের রাজধানীর প্রতিটি ঘর তৈরি করা হয় ছোট পরিবারের জন্য। যেখানে সন্তানের তো জায়গা হয়, জায়গা হয় না শুধু পরম স্নেহের বাবা-মায়ের। অথচ বাবা-মায়েদের রক্তকণার শেষ উক্তিতে এটিই পাওয়া যায়Ñ ‘তারা তো আমার গর্ভের, আমি তো তাদের ছাড়তে পারব না।’ অথচ আধুনিকতার এ যুগে প্রবীণ শব্দটা এক শোকের ছায়া, এক দুঃখের, দুর্বিষহের কথা বর্ণনা করে। জীবনের নিয়ম মেনে শরীর যখন অসাড়তায় আড়ষ্ট হয়, কর্মক্ষমতা লোপ পায়, উপার্জন ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায় তখনই সমাজ দাঁড়ায় তাদের বিপরীতে। আর তারা হয়ে যায় সমাজের বোঝারূপে।
সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান সময়ের প্রবীণ একটা সময় ছিলÑ শিশু, বালক, কিশোর ও প্রৌঢ়। কিন্তু বর্তমানে তারা জীবনচক্রের শেষ ধাপÑ বৃদ্ধে পরিণত হয়েছেন। আজ যার নামকরণ করা হয়েছে প্রবীণ বা বৃদ্ধ। একটা সময় এই প্রবীণই ছিল ছোট্ট সন্তানের একমাত্র অবলম্বন। যার হাত ধরে শিশুটি প্রথম হাঁটতে শেখে, যার মুখের ভাষা শুনে জীবনের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করে, যার কথা শুনে শিশুটি প্রথম বলতে শেখে, ছোট্ট শিশুর সেই অস্পষ্ট ভাষাকে বাবা-মা শ্রুতিমধুর করে তোলে, যাদের কণ্ঠ শুনে শুনে ছোট্ট শিশুটি ‘হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের… কবিতাটি আবৃতি করতে শেখে। এই ছোট্ট শিশুটিই যখন বাবা-মায়ের নিরলস পরিশ্রমের ফসলস্বরূপ পূর্ণাঙ্গ স্বাবলম্বী হতে শিখে যায়, ঠিক সে সময়েই বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে বাবা-মা, তারা আর চলতে পারেন না, স্পষ্ট কথা বলতে পারেন না, চোখে দেখতে পান না, উপার্জন করতে পারেন না। তখনই তারা হয়ে যান অসহায় বৃদ্ধ, প্রবীণ আর সন্তানের চোখের বালি। আর বৃদ্ধাশ্রমই হয় তাদের শেষ আশ্রয়স্থল। এমন অসহায় মা-বাবার সংখ্যা আমাদের সমাজে বাড়ছে।
২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বা তার বেশি বয়সি মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩২টির মতো বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে, যেখানে প্রবীণ নারী-পুরুষ বসবাস করেন। এভাবেই তারা জীবনের অন্তিম সময় পার করেন অপরিচিতদের ভিড়ে, ছিন্ন হৃদয়ের তৃণে, অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ সময়গুলো পার করেন। এই সমাজ তো আমাদের ছিল না। বলা হচ্ছে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা, সম্পর্কে দূরত্বের সৃষ্টি হওয়া, প্রযুক্তির অধিক ব্যবহারের ফলে বিক্ষিপ্ত মন-মানসিকতা এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া প্রবীণদের প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলার অন্যতম কারণ। সমাজকে আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সকল সন্তানকে ভাবা উচিত। কারণ তারাও একদিন এই বয়সে পা রাখবেন। তারা কি চান তাদের নিবাস হোক বৃদ্ধাশ্রম।