প্রজ্ঞা দাস
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৫ ২২:৫৬ পিএম
শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার আয়না নয়, এটি মনন, নৈতিকতা, আত্মদর্শন এবং সৃজনশীলতার গভীর জগতে প্রবেশের পথ। কিন্তু বর্তমানে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার অপ্রতিরোধ্য উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, তখন শিক্ষাব্যবস্থাও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এআই শিক্ষায় এমন এক বিপ্লব নিয়ে এসেছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অভূতপূর্ব সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি শিক্ষার মৌলিকতা ও সৃজনশীলতার ওপর অশনি ছায়াও ফেলছে।
ছাত্রের মনে প্রশ্ন জাগা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে আন্তঃসম্পর্ক, ভুল থেকে শেখা, ধৈর্য, পরিশ্রম এসবকিছু মিলেই গঠিত হয় শিক্ষার প্রাণ। কিন্তু এআই শিক্ষার প্রথাগত কাঠামোকে পুনর্নির্মাণ করছে। একটি ছাত্র এখন আর নিজে কষ্ট করে গবেষণা করে না, সে কেবল একটি প্রম্পট দিয়ে এআই-এর কাছ থেকে গবেষণাপত্র চায় আর সঙ্গে সঙ্গেই মিলে যায় পুরো প্রবন্ধ, অঙ্কের সমাধান কিংবা জটিল বৈজ্ঞানিক ইকুয়েশন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসনে শিক্ষার্থীদের আর চিন্তা করার দায় নেই, ত্রুটি করার স্বাধীনতা নেই। অথচ শিক্ষার মূলে ছিল ভুল করেই শেখা, শুদ্ধির পথ খোঁজা, নিজের অভ্যন্তরে একটি সত্য গঠন করা। এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালে শিক্ষায় এআই-এর বৈশ্বিক বাজার ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালে এটি ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার ২০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করবে। যা বেশ আশঙ্কাজনক। এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের কে শিক্ষক থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। ক্লাসরুমে শিক্ষক এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা, যিনি শুধু পাঠ্যবই পড়ান না বরং ছাত্রের জীবনের প্রতিটি বাঁকে চিন্তার দিকনির্দেশনা দেন। আজ সেই শিক্ষককেও প্রযুক্তির কাছে হার মানতে হচ্ছে। যান্ত্রিক সফটওয়্যার বা অ্যাপ আজ ‘ভবিষ্যতের শিক্ষক’ নামে প্রচার পাচ্ছে, যেখানে ছাত্রছাত্রী কেবল স্ক্রিনে চোখ রেখে একতরফা তথ্য গ্রহণ করছে। এতে করে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংবেদনশীল সংযোগ, যে সংযোগের মাধ্যমে একজন শিক্ষক একজন শিশুকে মানুষ করে তোলেন। পাশাপাশি এআই শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। যখন শিক্ষার্থীরা এআই-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সমাধান পায়, তখন তারা নিজেদের বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ হারায়। শুধু তাই নয় এআই-এর অত্যধিক ব্যবহার শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকেও সীমিত করছে। এটি শিক্ষার্থীদের গভীর শিক্ষণ প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য ছিল। এখন ছাত্ররা নিজেরা আর লেখে না, গুগল বা চ্যাটবটের মুখাপেক্ষী তারা। এতে লেখার অভ্যাস, চিন্তার সৃজনশীলতা, ভাষার সাবলীলতা ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ সবকিছু ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। ফলে সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে ভাবনার অনিবার্য গভীরতা, এআই-এর প্রণীত প্রতিক্রিয়াশীল উত্তরের চক্রে আটকে যাচ্ছে। যা একজন শিক্ষার্থীকে একটি যান্ত্রিক প্রোডাক্টে পরিণত করছে।
প্রযুক্তির অন্ধ অনুকরণে শিক্ষার্থীরা ভুলে যাচ্ছে কেন শেখা জরুরি; তারা কেবল কীভাবে পাস করা যায় সেই প্রযুক্তি খুঁজতে ব্যস্ত। বাংলাদেশেও দ্রুতগতিতে এআই নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমান শিক্ষা যদি এআই-এর হাতে ন্যস্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের সমাজ হবে এমন এক যান্ত্রিক সভ্যতা, যেখানে থাকবে তথ্যের পাহাড়, কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান উপলব্ধির শূন্যতা। থাকবে ডিগ্রিধারী লক্ষকোটি মানুষ, কিন্তু চিন্তাশীল নাগরিকের অভাব। একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা যদি তার চিন্তা, মৌলিকতা এবং আত্মবিকাশের অধিকারকে মেশিনের কাছে সমর্পণ করে, তবে সেই জাতি আর মানুষ তৈরি করে না, তারা কেবল দক্ষ দাস তৈরি করে। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে এআই শিক্ষার্থীদের সহায়ক হয়, কিন্তু তাদের সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষক, নীতিনির্ধারক এবং প্রযুক্তি উন্নয়নকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার মৌলিকতা এবং এআই-এর সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করতে হবে। এই ভারসাম্য নিশ্চিত করা গেলে, এআই শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ এবং গতিশীল করতে পারে। যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের সৃজনশীলতা এবং মৌলিকতা বজায় রেখে প্রযুক্তির সুবিধা উপভোগ করতে পারবে।