× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সঞ্চয়পত্র

সামাজিক নিরাপত্তার একটি বিকল্প ব্যবস্থা

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৫ ১৫:৫৬ পিএম

নিরঞ্জন রায়

নিরঞ্জন রায়

আমরা যারা অর্থনীতি বিষয় নিয়ে পড়ি বা কিছু লেখালেখির চেষ্টা করি, তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দেখা দেয় কোনো নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা বা মন্তব্য করা। কেননা অর্থনীতির বিষয়গুলো এতটাই জটিল এবং একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে একটির প্রভাবে আরেকটির কার্যকারিতায় বিঘ্ন ঘটে। এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা কোনো তত্ত্ব বা থিউরি নিয়ে কথা বলার আগে সব সময়ই উল্লেখ করে থাকেন যে অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, যাকে অর্থনীতির পরিভাষায় সেটেরিস পেরিবাস বলা হয়। আমরা যখন অর্থনীতির বিষয়ে পড়াশোনা করেছি, তখনও এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছি। কিন্তু কলাম লেখার সময় তো আর সেভাবে বিষয়গুলো উল্লেখ করা সম্ভব হয় না। লেখার শুরুতে এ রকম ভূমিকা দেওয়ার কারণ হচ্ছে কিছু দিন আগে আমি সুদের হার হ্রাস করার জন্য সুপারিশ করে একটি কলাম লিখেছিলাম। আমার লেখার বিষয়বস্তু ছিল ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার হ্রাস করা এবং লেখাটি ছাপা হতে না হতেই সরকার সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার হ্রাস করেছে মর্মে সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছি। 

যদিও আমাদের দেশে লেখালেখির কারণে সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না, তারপরও অনেক পাঠক ভাবতে পারেন যে সেই লেখার সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার হ্রাসের একটা যোগসূত্র আছে। কিন্তু বিষয়টি মোটেই তা নয়। আমি লিখেছিলাম ঋণের ওপর সুদের হার হ্রাসের ব্যাপারে, অথচ সরকার সুদের হার হ্রাস করেছে সঞ্চয়পত্রের ওপর। ঋণের ওপর যে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়, তার সঙ্গে ব্যাংক আমানতের ওপর সুদের হারের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের ওপর যে সুদের হার, তার সঙ্গে ব্যাংকঋণের ওপর সুদের হারের কোনোরকম প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। অনেকে বলে থাকেন যে, সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, পরোক্ষ সম্পর্ক আছে। অনেকে এমনও বলে থাকেন যে, ব্যাংকে সুদের হার নির্ধারণে সঞ্চয়পত্রের সুদ একটা নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে। কথাটার মধ্যে আংশিক সত্যতা থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানি মার্কেটে বিষয়টি সেভাবে কাজ করে না। 

আমরা সবাই জানি যে, ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে যে আমানত সংগ্রহ করে, তার একটি অংশ তারল্য হিসেবে রেখে বাকিটা ব্যবসায়ীদের মাঝে ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। ব্যাংক আমানতকারীদের যে হারে সুদ দেয়, তার সঙ্গে পরিচালনা ব্যয়, ঝুঁকি গ্রহণের মূল্য এবং লভ্যাংশ বাবদ কিছু অংশ যোগ করে ঋণের ওপর সুদের হার নির্ধারণ করে। এ কারণেই ব্যাংকে আমানতের ওপর সুদের হার বৃদ্ধি পেলে, ঋণের ওপর সুদের হারও বেড়ে যায়। এর বিপরীত অবস্থাও হতে পারে। অর্থাৎ ঋণের ওপর সুদের হার হ্রাস পেলে, আমানতের ওপর সুদের হার কমে যায়। আবার ব্যাংকঋণ এবং আমানত, উভয়ের ওপর প্রদত্ত সুদের হার নির্ভর করে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ব্যাংক রেট বা নীতি সুদ-হারের ওপর। এ কারণেই দেখা যায় যে, বাংলাদেশ ব্যাংক যখন তাদের নীতি সুদ-হার হ্রাস করে, তখন ব্যাংকের আমানত এবং ঋণের ওপর সুদের হার হ্রাস পায়। এর বিপরীত অবস্থা, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক যখন তাদের নীতি সুদ হার বৃদ্ধি করে, তখন ব্যাংকের আমানত এবং ঋণের ওপর সুদের হার বৃদ্ধি পায়। 

দেশের মুদ্রাবাজারের এই সমীকরণের মধ্যে সঞ্চয়পত্রের ওপর প্রদেয় সুদের হারের কোনোরকম ভূমিকা নেই। এ কথা ঠিক যে দেশে সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদ বহাল থাকলে, গ্রাহক কম সুদের হারে ব্যাংকে অর্থ জমা না রেখে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করবে। ফলে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ করতে বেশ সমস্যা হয় এবং তখন ব্যাংক আমানতের ওপর সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এটি একটি ধারণা এবং খুবই অল্পসংখ্যক আমানতকারী এমনটা করলেও করতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এবং স্বতন্ত্র একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থা। যে অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হয়, সেই অর্থ ব্যাংক আমানতে জমা হবে না। আবার ব্যাংক আমানত হিসেবে যে অর্থ জমা থাকবে, তা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ খুবই সীমিত। যে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম আছে, তার পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে তা আর সমগ্র মুদ্রাবাজারে সুদের হার নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

সঞ্চয়পত্র এক বিশেষ ধরনের বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যার গুরুত্ব আমাদের সমাজে অপরিসীম এবং বহুবিধ। প্রথমত, এই বিনিয়োগ সুবিধা সমাজের জ্যেষ্ঠ বা সিনিয়র সিটিজেনদের উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশে যারা জ্যেষ্ঠ নাগরিক আছেন, তারা সঞ্চয়পত্রে অর্থ জমা রেখে সেখান থেকে যে সুদ পান তা দিয়ে বৃদ্ধ বয়সের জীবিকা নির্বাহ করেন। দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থা বেকার ভাতার বিকল্প হিসেবে কাজ করে থাকে। আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা এতই বেশি যে শুধু চাকরির সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আবার প্রত্যেক কর্মক্ষম বেকার যুবক-যুবতিকে মাসিক বেকার ভাতা দেওয়া হয় না এবং সেটা সম্ভবও নয়। এসব বেকারের একটি অংশ ছাত্রজীবনে উপার্জনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বা বাবা-মা’র কাছ থেকে এককালীন কিছু অর্থ পেয়ে তা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে প্রাপ্ত সুদ দিয়ে নিজের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে পারে। সেই বিবেচনায় সঞ্চয়পত্র বেকার ভাতার বিকল্প হিসেবে কাজ করে থাকে। 

চতুর্থত, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অবসর ভাতার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশে সরকারি চাকরি ব্যতীত অন্যান্য যে চাকরি আছে সেখানে অবসর ভাতার সুযোগ নেই। এ রকম চাকরিজীবীর সংখ্যাই বেশি। এসব চাকরিজীবী অবসরে যাওয়ার সময় এককালীন যে অর্থ পান বা চাকরিজীবনে যে সঞ্চয় করেন, তা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে যে সুদ পান তা দিয়ে অবসর জীবনযাপনের খরচ বহন করে থাকেন। পঞ্চমত, সমাজে যারা আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত থেকে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসা পরিচালনা করেন, তারা মূলধন বা বিকল্প মূলধন গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকে। আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত এসব ব্যবসায়ী তাদের লাভ থেকে প্রতিনিয়ত কিছু অর্থ সাশ্রয় করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন, যা প্রকৃতপক্ষে তাদের বিকল্প মূলধনের ভূমিকা পালন করে। ভবিষ্যতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে যখন বাড়তি মূলধনের প্রয়োজন হয়, তখন তারা তাদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের অর্থ ব্যবহার করতে পারে। সমাজের এ রকম অন্যান্য অসহায় শ্রেণির মাসিক অর্থের জোগান আসে এই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে। এসব কারণেই আমাদের দেশে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তার এই সুন্দর বিকল্প ব্যবস্থা। 

এত গেল সঞ্চয়পত্র নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের বহুবিধ সুবিধার কথা। কিন্তু সরকারের দিক থেকে এই ব্যবস্থা বৈপরীত্যে পূর্ণ অর্থসংগ্রহের এক মাধ্যম। প্রথমত, সঞ্চয়পত্রে সুদের হার সবচেয়ে বেশি। তাই সরকারকে সঞ্চয়পত্রের সুদ হিসেবে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা সরকারের পরিচালনা ব্যয় তথা বাজেটের বরাদ্দ মাত্রাতিরিক্ত বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, সুদের হার বেশি হলেও সঞ্চয়পত্র হচ্ছে সরকারের অর্থের একটি নিশ্চিত উৎস। একদিকে সরকারি বিনিয়োগ, আর অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার। ফলে জনগণের কাছে এই বিনিয়োগ সুবিধার ব্যাপক চাহিদা আছে। সরকার চাইলেই খুব সহজে জনগণের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে বাজেট ঘাটতি মেটানো বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অর্থসংগ্রহের সুযোগ নিতে পারে। তৃতীয়ত, সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালু রাখার মাধ্যমে অতি উচ্চ মূল্যে সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। 

এসব কারণে দেশে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ সুবিধা যেমন চালু রাখা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সঞ্চয়পত্রের ওপর উচ্চ হারে সুদ প্রদান অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে। একই কারণে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার হ্রাস করার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাথে। অবশ্য এ কথাও ঠিক যে সঞ্চয়পত্র যতই বিশেষায়িত বিনিয়োগ ব্যবস্থা হোক না কেন, সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য এই বিনিয়োগ ব্যবস্থার ওপর উচ্চ হারে সুদ প্রদান করতে পারবে না। তবে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে সরকার সঞ্চয়পত্রের ওপর প্রদত্ত গড় সুদ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে। বর্তমানে প্রচলিত হরেক রকমের সঞ্চয়পত্র বাতিল করে তিন ধরনের সঞ্চয়পত্র, যথাÑ অতি উচ্চ সুদের হারের, মধ্যম সুদের হারের এবং অতি অল্প সুদের হারের মোট তিন ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু করে সঞ্চয়পত্রের ওপর সার্বিকভাবে গড় সুদের হার কমিয়ে আনতে পারে। বিষয়টি কীভাবে কাজ করে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় বিধায় এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিসরে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। 

আমাদের দেশে সঞ্চয়পত্র সামাজিক নিরাপত্তার একটি বিকল্প ব্যবস্থা। আবার সরকারের পর্যাপ্ত বাজেট ঘাটতি আছে। তাছাড়া সরকারকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও চালিয়ে যেতে হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সরকারকে প্রতিনিয়ত ঘাটতি বাজেট এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। উচ্চ সুদের হারে কিছু অর্থ সংগ্রহের নিশ্চয়তা না থাকলে বাকি অর্থ সংগ্রহের কাজটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। তাছাড়া, একাধিক সুদের হারের সঞ্চয়পত্র চালুর মাধ্যমে গড় সুদের হার কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের উপর সুদের হার হ্রাস না করাই হবে সাধারণ মানুষকে একটু স্বস্তি দেয়ার সামিল। আশা করব, অর্থ উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন। 

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা