রপ্তানি খাত
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৫ ১৬:১৬ পিএম
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় পণ্যের উৎপাদন-সরবরাহ সর্বত্রই নতুন মাত্রিকতা তৈরি করে আসছে। প্রচলিত বিধানে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহে নানামুখী চাহিদা-জোগানের সমস্যা বিদ্যমান। দেশের আপামর জনগণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা পূরণ প্রত্যেক জাতিরাষ্ট্রের সরকারের ওপর বর্তায়। বন্যা-খরা-অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টিসহ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে অধিকাংশ সময় দেশসমূহে কৃষি-শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় দ্রব্যের অভাব। ক্ষেত্র বিশেষে অসাধু মুনাফালোভীদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে দ্রব্যমূল্য ওঠানামা করে, যাতে সময়ে সময়ে জনদুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। এসব উদ্ভট সংকট নিরসনে আমদানি-রপ্তানির ভূমিকা বিশেষ অবদানে পরিপুষ্ট। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের রীতিনীতি প্রযোজ্য। একদিকে আয়কৃত শুল্ক যেমন দেশের রাজস্বের অন্যতম উৎস; অন্যদিকে রপ্তানি আয়, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ইত্যাদির ভূমিকা অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলো হলোÑ চাল, গম, ডাল, তৈলবীজ, তুলা, অপরিশোধিত পেট্রোল ও পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য, ভোজ্যতেল, সার, কৃষি ও শিল্প যন্ত্রপাতি, সুতা ইত্যাদি। আর এসব দ্রব্য আমদানি করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি। বাংলাদেশের পণ্য আমদানির সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ আসে ভারত ও চীন থেকে।
পক্ষান্তরে দেশের রপ্তানিকৃত পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ তৈরি পোশাক, হিমায়িত চিংড়ি, কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধসামগ্রী, চা, চামড়াজাত দ্রব্য, রাসায়নিক সামগ্রী প্রভৃতি। রপ্তানিকারক দেশগুলো হলোÑ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, জাপান ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসে এ পণ্য থেকে। আবার একক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র হলো তৈরি পোশাকের প্রধান রপ্তানি বাজার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ২০ থেকে ২২ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুসারে, সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক খাতে ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রপ্তানি বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউ), যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাজার। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যা মোট রপ্তানির ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ।
১৪ জুলাই ২০২৫ গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মে পর্যন্ত দেশের মোট আমদানি ও রপ্তানি হয়েছে যথাক্রমে ৬ হাজার ২৪ কোটি ও ৪ হাজার ৮৬ কোটি ডলারের পণ্য। উক্ত হিসাব অনুযায়ী এ সময়ে দেশের বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩৮ কোটি মার্কিন ডলার। যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ২২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। সচেতন মহল অবগত আছে যে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও দুই দেশের বাণিজ্যের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের (ইউএসটিআর) তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ২০২৩ সালের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মার্কিন পণ্যের উচ্চ শুল্কহার আরোপসহ বিশ্বজুড়ে মার্কিন বাণিজ্যের ভারসাম্যের লক্ষ্যে ২ এপ্রিল ২০২৫ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের ১৮৪ দেশের ওপর নতুন শুল্কনীতি আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল। ঘোষিত নতুন নীতি অনুসারে বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্কের সঙ্গে অতিরিক্ত এ শুল্ক আরোপ করার নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন নীতিতে শূন্যশুল্ক সুবিধা ভোগকারী দেশগুলোকেও ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। দেশভেদে এ অতিরিক্ত শুল্কের পরিমাণ ১১ থেকে ৫০ শতাংশ। মূলত, যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি, সে দেশের ওপরই বেশি হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ৩৭ শতাংশ। তবে দেশটির বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ওপর আরোপকৃত শুল্কের হার যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৯ শতাংশ। তা ছাড়া ভারত ২৬, চীন ৩৪, পাকিস্তান ২৯ এবং শ্রীলঙ্কার ওপর ৪৪ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও সব দেশের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর করে এপ্রিল মাসের ৯ তারিখ তিন মাসের জন্য পাল্টা শুল্ক স্থগিত করে মার্কিন প্রশাসন। তদনুসারে ৯ জুলাই থেকে শুল্ক কার্যকর করার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১ আগস্ট থেকে নির্ধারণ করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে ৭ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাকে লেখা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনের বিষয়ে সমাধান না হলে ১ আগস্ট থেকে দেশটিতে পণ্য রপ্তানিতে বর্ধিত হারে শুল্ক দিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন।
নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক হবে ৩৫ শতাংশ। তাতে গড় শুল্ক দাঁড়াবে ৫০ শতাংশ। অন্য দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পাশাপাশি মিয়ানমার ও লাওসের পণ্যের ওপর ৪০ শতাংশ, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার পণ্যের ওপর ৩৬ শতাংশ, সার্বিয়ার ৩৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ৩২ শতাংশ, আফ্রিকার পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়া ও তিউনেশিয়ার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির কারণে বিশ্ব-অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইতোমধ্যেই বহু দেশের শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য দরপতন পরিলক্ষিত হয়েছে। ৭ জুলাই খোদ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান শেয়ারবাজারের সূচক কমেছে। টয়োটার মার্কিন তালিকাভুক্ত শেয়ার কমেছে ৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়াবে এবং বাণিজ্য হ্রাস করবে। বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এমন অনিশ্চিত ব্যবস্থায় তীব্র অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম বৃহৎ বাজার হওয়ার কারণে এই নতুন শুল্ক পোশাক খাতে আঘাত হানার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের কাছে দাম বেশি হলে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকট।
তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঘোষিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর হলে তৈরি পোশাকসহ কোনো পণ্যেরই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা থাকবে না। ফলে বাংলাদেশের ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্যের রপ্তানি অনেকটাই ঝুঁকিতে পড়বে। যেসব দেশে শুল্ক কম থাকবে, সেসব দেশে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরিত হবে। এই প্রক্রিয়াটি দু-তিন বছরের মধ্যে ঘটবে। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ শুল্ক আরোপের কারণে হতাশা প্রকাশ করছে। ক্রয়াদেশ কমলে শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হবে কারখানাগুলো। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে অধিকাংশই তৈরি পোশাক, সেহেতু এই শিল্পেই প্রভাব পড়বে বেশি। তবে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসন কী হারে শুল্ক আরোপ করছে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ওয়ালমার্ট বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ৩৫ শতাংশ শুল্কের কারণে তাদের কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে এনে সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ অতিশয় দৃশ্যমান। প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে ভালো অবস্থানে বাংলাদেশকে কীভাবে নেওয়া যায় সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বৃদ্ধি ও মার্কিন পণ্যের শুল্কহার কমানোর পরিকল্পনা সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচ্য। শুল্ক ইস্যুতে আলোচনার জন্য সম্মানিত বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা করে। যদিও এই আলোচনা কতটুকু ফলপ্রসূ হয়েছে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের অনেকের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে পাল্টা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তৃতীয় পর্যায়ের আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আলোচনায় একটি ভালো ফলাফল এমনকি শুল্কহার শূন্যও হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা।
সামগ্রিক বিবেচনায় এটি সুস্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের এহেন উদ্যোগ বিশ্ববাজার ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে। এতে শুধু বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা প্রবল। বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় বিরাজিত সংকট নিরসনে মার্কিন প্রশাসনের সুবিবেচনায় শুল্কনীতির পরিবর্তন একান্তই জরুরি। এমনিতেই যুদ্ধবিগ্রহে পুরোবিশ্ব নানাদিক থেকে ক্ষতবিক্ষত। শুল্কনীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিঃসন্দেহে সমগ্র বিশ্বকে নতুন করে সীমাহীন দুর্ভোগে নিপতিত করবে। বাংলাদেশের জনগণের গভীর প্রত্যাশা শুল্কনীতি নিয়ে আলোচনা যথার্থ অর্থে সফলতা বয়ে আনবে।