অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ১৭:৫২ পিএম
শুরুতেই স্পষ্ট করে বলি, আমরা বিরাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে। অনেকে রাজনীতির হরেক দোষ ও অসুখ বের করে রাজনীতিকেই নির্বাসনে পাঠাতে চান। আমরা মনে করি, আধুনিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিই একমাত্র নিয়ামক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপদ্ধতিতে জনসম্মতি বা অনুমোদন নিয়ে রাজনৈতিক দল-জোটই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব আসে। রাজনীতিই আধুনিককালে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক জীবনের প্রতিটি দিক-দিগন্তকেই স্পর্শ ও প্রভাবিত করে। কাজেই রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রবলয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ও প্রধান বিষয়বস্তু। রাজনীতি তাই যত দক্ষ, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞান-যুক্তি-প্রযুক্তিনির্ভর, সহনশীল, উদার, পরিশীলিত, সততাশ্রয়ী ও সুন্দর হবে, দেশ-জাতির কল্যাণ তত বেশি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
রাজনীতির প্রধান বাহন রাজনৈতিক দল। রাজনীতির চর্চা ও প্রয়োগ দলই করে থাকে। দলই রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শ বেছে নেয়, কর্মসূচি ও কর্মপন্থা নির্ণয় করে। কাজেই দলগুলোকে দক্ষ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও জনমুখী করে গড়ে তোলা খুবই দরকারি কাজ। আমাদের দেশে এর অভাবই দেশের ও জনগণের দুর্দশার এক প্রধান কারণ। আমরা যে প্রায় সব দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি তার সিংহভাগ দায়ই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাঁধে বর্তায়। তাদের ব্যর্থতা ও দ্বন্দ্বের কারণেই এ দেশে অনেক বারই অরাজনৈতিক ব্যক্তি-গোষ্ঠী-শক্তির শাসন নেমে এসেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসুস্থ রাজনীতিও বিভিন্ন সময়ে দেশ ও জাতির বিপুল স্বার্থহানি ও ক্ষতি করেছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-তরুণদের দুঃসাহসী অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী যে রেজিম উৎখাত হয়, তারাও রাজনীতিবিদের পরিচয়ই বহন করতেন।
বিপুল প্রাণদানের মধ্য দিয়ে সাধিত রক্তস্নাত পরিবর্তনের পর আমাদের আশা, আমরা ফের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপদ্ধতিতে ফিরে যাব। আমাদের ব্যক্ত অঙ্গীকার, আমরা রাষ্ট্রের ঘুণেধরা সব কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানের, সংবিধানের ও আইনের সংস্কার করে সময়ের চাহিদা মেটাতে সক্ষম করে তুলব। সে উদ্যোগ বর্তমান ইন্টেরিম সরকার নিয়েছে। এ নিয়ে হরেক প্রস্তাব উঠছে এবং সেসব ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতের ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস চলছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার অতি ধীরগতি নাগরিকদের অনেককেই ইতোমধ্যে হতাশ করে তুলেছে। নানা ছোটখাটো বিষয়েও দলগুলো ফ্যাকড়া বাধাচ্ছে। জট-জটিলতায় আটকে যাচ্ছে সংস্কারের উদ্যোগ। কেবল তাই নয়, সংস্কার, জাতীয় নির্বাচন ও গণতন্ত্রের পথে এগোতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হিংসা, হানাহানি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
আমাদের ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকায় গতকাল প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল : ‘জেদের ভাত কুত্তা দিয়ে খাওয়ানোর রাজনীতি চলছে’। এই বাক্যটিই হালের রাজনীতির চালচিত্র এবং দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের অবস্থা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অথচ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বেও তারা ছিলেন রাজপথের লড়াইসঙ্গী। জীবন-মরণ খেলার সেই কমরেডরাই আজ শুধু জুদা হয়ে যাননি, পরস্পরের কঠিন দুশমনে পরিণত হয়েছেন।
আমরা বাকশাল বা একদল ও একক মতে বিশ্বাসী নই। আমরা চাই বহুমাত্রিক সমাজে বিভিন্ন পথ ও মতের অবাধ প্রতিযোগিতায় ফুটে উঠবে শতফুল। সমাজ হবে বর্ণাঢ্য। কাজেই নানা বিষয়ে দলগুলোর ভিন্নমত ও অন্যমত থাকবে, যুক্তি ও পালটা যুক্তি থাকবে, কর্মসূচি ও পথের বিভিন্নতা থাকবে, এসব নিয়েই তারা জনগণের কাছে যাবে, যুক্তি তুলে ধরবে। বেশিরভাগ মানুষ যা গ্রহণ করবে সেটার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হবে। মোটকথা ঘৃণা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংসা-হানাহানি নয়, আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা। জেদাজেদি ও সহিংসতা অতীতে অনেক অপ্রীতিকর বাস্তবতা ডেকে এনেছে, এখন আবার সে-রকম আলামতই দেখা যাচ্ছে। এ দেশে যদি গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়, বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচন ব্যাহত হয়, জনজীবনে অস্থিরতা ও দুর্ভোগ নেমে আসে তার দায় কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকেই বইতে হবে। পারস্পরিক দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে না।
আমাদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, রাজনীতির অসুখ না সারালে এবং দলগুলোর সংস্কার না হলে রাষ্ট্রের কোনো সংস্কারেই লাভ হবে না। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হলে রাজনীতিকেরা এগুলো ব্যর্থ করে ফেলতে পারেন। অতীতে তেমন মন্দ অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। কাজেই অতীতের জীর্ণ রাজনীতি ও দলীয় পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে। শুদ্ধ রাজনীতিই পারে একটি পরিশুদ্ধ সমাজ ও উন্নত দেশের নিশ্চয়তা বিধান করতে।