সৈয়দা ফারিভা আখতার
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫ ১৭:৪৫ পিএম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা তখনও মিছিল করছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে। রাজপথ উত্তাল চোখে আগুন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃপ্ত ঘোষণা। ঠিক সেদিন রাজশাহীর আলুপট্টি এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা। সবার সামনে ছিলেন এক তরুণ মাথায় রক্তের দাগ নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তিনি মো. রায়হান আলী। তিন দিন পর ৮ আগস্ট তিনি শহীদ হন। সেই দিনটি যেন সময়কে থমকে দেয়। রাজশাহী কলেজের আকাশ তখন ভারী হয়ে ওঠে কান্নায়। আজও কলেজ প্রাঙ্গণ স্তব্ধ হয়ে যায় সেই স্মৃতিতে। আর ৮ আগস্ট হয়ে ওঠে রাজশাহী কলেজের ইতিহাসে এক অশ্রুসিক্ত দিন।
মো. রায়হান আলী ছিলেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। শহীদ মো. রায়হান আলী তিনি এই প্রজন্মের ছাত্র-রাজনীতিতে আদর্শের বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সেই উত্তাল সময় যেখানে অন্যরা পেছনে ছিল সেখান থেকে সামনে এসে ছাত্রসমাজের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন রায়হান। বুক চিতিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেনÑ এক মুহূর্তের জন্যও পিছিয়ে যাননি। আর ঠিক সেই দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাহসিকতার মধ্য দিয়েই তিনি পরিণত হন একটি আন্দোলনের প্রাণে।
কলেজের শিক্ষার্থীরা আজও বলেন, তার ভালোবাসা, তার ব্যবহার তার নেতৃত্ব সবই ছিল অকৃত্রিম। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. কায়েস আহমেদ বলেন, ভাই আমাদের মাঝে একজন স্বর্ণ ছিলেন। ভাই বলতেনÑ আমি আছি তোমরা আসো। তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন, আড়াল থেকে নয়।
তার মৃত্যু শুধু একটি আন্দোলনের বলিদান ছিল না, তা ছিল ছাত্র-রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায়। রাজশাহী কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাত বৃষ্টি বলেন, আমি চাই রাজশাহী কলেজে শহীদ মো. রায়হান আলীর নামে একটি চত্বর হোক যেখানে নতুন প্রজন্ম জানবে কীভাবে একজন তরুণ বুক দিয়ে নেতৃত্ব দেয়।
মো. রায়হান আলী ছিলেন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সেই বিভাগেই বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মো. ইমরান বলেন, রায়হান ভাইয়ের গুলি খাওয়ার দৃশ্য দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। কিন্তু সেই দৃশ্যই আমাদের সাহস দেয়, আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার শক্তি দেয়। তিনি আমাদের সাহস, তিনি আমাদের আত্মা।
এই আত্মত্যাগ শুধু রাজশাহী কলেজ নয়, পুরো জাতির জন্য গর্বের। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইসমত আরা বেগম বলেন, রায়হান আলীর নেতৃত্ব ও সংগ্রাম ছিল একেবারে ব্যতিক্রম। রাজশাহী কলেজ থেকেই যে এমন একটি আন্দোলনের ঢেউ শুরু হবে তা ভাবিনি। কিন্তু তার মতো একজন সংগঠকের কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল।
আজ রাজশাহী কলেজের আঙিনায় চলতে চলতে হঠাৎ যেন মনে হয় রায়হান এখনও আছেন। পাঠাগারের করিডোরে, প্রশাসনিক ভবনের সিঁড়িতে, রাজশাহীর কোনো চত্বরে কিংবা আন্দোলনের প্রতিটি মিছিলে যেন তার পদচারণা টের পাওয়া যায়। শহীদ মো. রায়হান আলী আমাদের শিক্ষা দেন কেবল দাবি নয়, নেতৃত্বের দায়িত্বও নিতে হয়। জীবন দিয়ে হলেও আদর্শের প্রতি অটল থাকতে হয়। এ প্রজন্মের কাছে তিনি কেবল একজন শহীদ নন- তিনি এক জীবন্ত প্রেরণা।