প্রকৃতি
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৫ ১৬:৩০ পিএম
মো. অহিদুর রহমান
বাবুই পাখির কান্না কি আমাদের বিচলিত করে? প্রাণ-প্রকৃতি-নদী-বন-পাহাড়-গাছ-বন্যপ্রাণী হত্যা কি আমাদেরকে কষ্ট দেয়? দেয় না! ঝালকাঠির তালগাছের বাবুই পাখির বাসা, ছানা, সংসার ধ্বংস করে আমাদের যেমন অনুতাপ নেই, তেমনি আমরা নিজেদের স্বার্থের জন্য কত প্রাণীর সংসার ও আবাসস্থল ধ্বংস করে, নদী, বন বিলুপ্ত করে, পাহাড়, গাছ কর্তন করে চলেছি। সাতছড়ি বন ধ্বংস, মাদারীপুরে বিদ্যুৎ অফিসের পুকুরে ১২টি গুইসাপ হত্যা, পান্থকুঞ্জের গাছকাটা, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাঁধ বাজার এলাকার শতবর্ষী গাছ কর্তন, চট্টগ্রামের বন ইনস্টিটিউটে আগর গবেষণার জন্য গাছ কর্তন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত গাছ কেটে ভবন নির্মাণ, চট্টগ্রাম, নীলফামারী, কক্সবাজার, কুষ্টিয়া, হবিগঞ্জ, খুলনায় কাছ কাটা, নেত্রকোণা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গাছ, নেত্রকোণা কলমাকান্দার পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, পুকুর, জলাভূমি ভরাট দখলের খবর প্রতিদিন প্রকাশিত-প্রচারিত হচ্ছে। পরিবেশ-প্রকৃতির এসব ধ্বংসের কারণে কমছে বন্য প্রাণবৈচিত্র্য। মানুষের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। প্রাণীর খাদ্য সংকট, দুর্বল আইন, চোরা শিকারি, হাওর জলাভূমি ও নদীর নাব্যতা হ্রাস, ভূমিতে অতিরিক্ত বিষ প্রয়োগ, বন্যপ্রাণী নিয়ে বাণিজ্য, মানুষের নির্দয় ব্যবহারের কারণে প্রকৃতি ও মানবজাতির জন্য জরুরি এই প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু সকল প্রাণের অস্তিত্ব যে আমার প্রকৃতি, পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, মানবজাতির জন্য একান্ত প্রয়োজন তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। প্রকৃতির প্রতি এসব সহিংসতার সংবাদ আমাদেরকে শোকাহত করে তোলে।
প্রকৃতি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, প্রকৃতি মানুষ ছাড়া চলতে পারে। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। তার চারপাশের মাটি, পানি, বায়ু গাছ লতাপাতা, নদী, পাহাড়, বন, হাওর, জলাভূমি, পাখি, ব্যাঙ, কেঁচো, অণুজীব, বন্যপ্রাণী, গৃহপালিত প্রাণিসম্পদ এসব ছাড়া চলা অসম্ভব। প্রকৃতির এসব উৎস সুরক্ষা ছাড়া পৃথিবী টিকে থাকবে না। সকল কিছুর সমন্বয়ে মানুষ যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে।
হাতেগোনা কয়েকটি বড় বড় প্রাণীই বাঁচলেই কি প্রকৃতি বাঁচবে? আমরা বাঘ, হাতি, হরিণ, কুমির এসব প্রাণীর কথা যত ভাবি অন্যসব প্রাণীর কথা তত চিন্তা করি না। কিন্তু সকলপ্রাণের অস্তিত্ব যে আমার প্রকৃতি, পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, মানবজাতির জন্য একান্ত প্রয়োজন তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। প্রাণের বিচিত্রতাই আমাদের জীবন, বৈচিত্র্য আছে বলেই আমাদের জীবন এত সুন্দর। এই বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, শ্রদ্ধাবোধের জায়গা তৈরি ও আমাদের জীবনের জন্যই টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন বন, গাছ, পাহাড়, নদী ও বন্যপ্রাণী।
আমার পাশের বাড়ির শিমুল গাছে যে ঈগল পাখিটি ছিল সেই পাখি হাওর, বিল, খাল, নালা থেকে মাছ, কুইচ্ছা, সাপ ধরে নিয়ে আসত, তার ছানার খাবার হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে জলাধারগুলো শুকিয়ে ও বিলুপ্তির ফলে মাছ, সাপ, কুইচ্ছা কিছুই পাচ্ছে না। ফলে তার ছানার জন্য সে খাবার সংগ্রহের জন্য ব্যক্তি মালিকানাধীন চাষের পুকুরের মাছের দিকে ধাবিত হয়। ফলে মালিক তাকে নিবারণ করার জন্য ফাঁদ পাতে। সেই ফাঁদ পাখিকে মেরে ফেলে। পাখি ও মানুষের দ্বন্দ্ব আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই।
আমরা হাতির আবাসস্থল ধ্বংস করেছি। বনে, পাহাড়ে তার খাবার নেই। বিচরণ স্থান নেই। মানুষ বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে রাস্তা, বাড়িঘর তৈরি করেছে। ফলে হাতির বসবাসের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে তার খাবারের জন্য লোকালয়ে চলে আসে। যেমন ধানের জমিতে, সবজি ক্ষেতে, বাড়িতে এসে আক্রমণ চালায়। তখন মানুষ তার সম্পদ রক্ষার জন্য হাতির সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। নেত্রকোণা, শেরপুর অঞ্চলে গত ১০ বছরে প্রায় হাতির আক্রমণে ১৮ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে। আর মানুষের আক্রমণে ৯টি হাতির মৃত্যু হয়। আমরা দেখি যে সুন্দরবন অঞ্চলে বাঘের খাদ্য সংকটের কারণে লোকালয়ে চলে আসে। মানুষের ওপর আক্রমণের ফলে মানুষ বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বাঘকে মেরে ফেলে অথবা বাঘ মানুষকে মেরে ফেলে। এভাবে প্রাণীর বিলুপ্তির পথে পৃথিবী।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিস্টন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথভাবে গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিলুপ্তির ষষ্ঠ পর্যায়ে পা দিয়েছে পৃথিবী। এই বিলুপ্তি পর্যায়ের প্রথম শিকার হচ্ছে মানুষসহ বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণী। অতীতে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মানুবর্তিতা অনুযায়ী যে হারে প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে বর্তমানে তার চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি গতিতে বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে। বিলুপ্ত হবে কোটি বছরের শ্রমে গড়া মানুষের সভ্যতা।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে প্রকাণ্ড উল্কা পতনে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয় পৃথিবী থেকে। সেটি ছিল পৃথিবী বিলুপ্তির পঞ্চম পর্যায়। সে সময়েও এত দ্রুত গতিতে কোনো প্রাণী বিলুপ্ত হয়নি। এক প্রাণী বিলুপ্ত হলে অন্য প্রাণী বেড়ে যায়। সেই প্রাণী মানুষের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। শুরু হয় মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মাঝে সংঘাত। কোনো অঞ্চলে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ঐ অঞ্চলে খাদ্যসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক এবং স্থাবর সম্পদের চাহিদা বেড়ে যায়। বাড়তি লোকের জন্য খাদ্য উৎপাদনের জন্য জমির প্রয়োজন হয়। তখন বন বা পতিত জমি পরিষ্কার করে চাষাবাদ শুরু করে। আবার আদিবাসীরা বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমেও খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে। কিন্তু এসব বনজ সম্পদ ও বন বন্যপ্রাণীর আবাস এবং খাদ্যের উৎস। আবাস ও খাদ্য কমে যাওয়ার ফলে খাদ্যের খোঁজে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে। আবার কখনও কখনও বনে মানুষের ওপর সরাসরি আক্রমণ করে। কারণ তখন মানুষ নিজেই বন্যপ্রাণীর চোখে খাদ্য হয়ে যায়। লোকালয়ে যাতে বন্যপ্রাণী প্রবেশ করতে না পারে মানুষ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়। আবার বনে বন্যপ্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ বন্যপ্রাণী মেরে ফেলে। এভাবেই দুই পক্ষই নিজেদের অস্তিত্বের জন্য সংঘাত ও দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়।
বনই হচ্ছে প্রাণীর জন্ম, বিচরণ, প্রজনন ও বসবাসের উপযুক্ত জায়গা। দেশের জীববৈচিত্র্যের অফুরন্ত ভান্ডার হচ্ছে বন। যে জীবন প্রাণীর অবাধ মিউজিয়াম। বনই হচ্ছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ধারক ও বাহক। বন আছে বলেই উদ্ভিদ ও প্রাণী বেঁচে আছে। বন শুধু গাছপালাই রক্ষা করে না, সব প্রাণিজগৎকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অনেক উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবনের জন্য বন্য প্রজাতির ফসলের জিন সংগ্রহ করা হয়।
কৃষি, নগরায়ণ এবং বন উজাড়সহ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস ও ক্ষতি হয়। বাসস্থানের এই অভাবের কারণে অনেক প্রজাতির বেঁচে থাকা, প্রজনন করা এবং খাদ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্প, কৃষি এবং বর্জ্য থেকে উদ্ভূত দূষণ দ্বারা বায়ু, জল এবং মাটি দূষিত হয়। রাসায়নিক, প্লাস্টিকের আবর্জনা এবং কীটনাশক প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ কারণ তারা আবাসস্থলকে ধ্বংস করে এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যপ্রাণী ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন বন্যপ্রাণীর ওপর নতুন বিপত্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেন, আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া বন্যপ্রাণীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। জনসংখ্যার চাপ ও অর্থনৈতিক কারণে বনাঞ্চলে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত বৈধ-অবৈধ হস্তক্ষেপের পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগে কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। দেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ১১টি প্রজাতি ইতোমধ্যেই চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে লজ্জাবতী বানর, পারাইল্লা বানর, কুলু বানর, উল্লুক, রামকুত্তা, গেছোবাঘ, চিতা বাঘ, উদবিড়াল, ভাল্লুক, শুশুক, বনছাগল, সম্বর, বনরুই, মুখপোড়া হনুমান, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, কাঁকড়াভুক বেজি, ভোঁদড়, কালো ভাল্লুক, বাগডাস, মায়াহরিণ। প্রকৃতিকে বাঁচানো মানে নিজেদেরকে বাঁচানো। মানুষে মানুষে যে দ্বন্দ্ব সেই দ্বন্দ্বই সামাল দিয়ে চলতে পারছে না মানুষ, টিকিয়ে রাখতে পারছে না সভ্যতা। তারপর মানুষ ও আর বন্যপ্রাণীর দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়া তো মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।