ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ১৩:১৪ পিএম
আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ১৩:২৬ পিএম
চৌদ্দ-পনের বছর আগের ঘটনা। তখন থাকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফুলার রোডের কোয়ার্টারে। ভোরে বেরিয়েছি জগিং করতে। উদয়ন স্কুলের বামপাশে ছাউনির নিচে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ তার মেয়ের সঙ্গে এক কোনায় চুপচাপ বসে আছেন। বৃদ্ধের কাঁধে একটি পুরোনো ব্যাগ আর মেয়েটির হাতে একটি প্লাস্টিকের ফাইল। একটি পত্রিকা বিছিয়ে দুজনেই গা এলিয়ে বসে আছেন। ভোরের আঁধারে তাদের দেখে বেশ কৌতূহল জাগে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কোথা থেকে, কী জন্য তারা ওখানে এসেছেন। ভদ্রলোক বেশ অনুনয় বিনয় করেই জানালেন, মেয়েকে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়াতে নিয়ে এসেছেন। প্রশ্ন করি, সারা রাত কি এখানেই ছিলেন? উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। কুড়িগ্রাম থেকে সকাল ৯টায় বাসে ওঠেন তারা। প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে রাস্তায় জ্যাম ছিল। এশার আজানের সময় তারা গাবতলীতে পৌঁছান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতে রাত ১১টা বেজে যায়। জানালেন তার এলাকার এক মেয়ে থাকে ভার্সিটির হলে। তার কাছে রাতে থাকার পেয়েছেন। কিন্তু পথে অনেক দেরি হওয়ায় হলের ভেতর ঢুকতে দেয়নি। ঢাকা শহর তার অপরিচিত। পরিচিত কেউ নেই। এক ছাত্র তাদের জানিয়েছে এই এলাকায় শিক্ষকেরা থাকেন, নিরাপত্তা আছে। কেউ যদি ভালো মনে করে, বিশ্বাস করে, তবে অবশ্যই রাতযাপনের ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি খুব অবাক হলাম, একটা স্টুডেন্ট আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর জীবনের সবচেয়ে কঠিন একটি পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। অথচ বিগত ২৪ ঘণ্টা ধরে বিরামহীনভাবে ভ্রমণ করেছে। খাওয়া-দাওয়া বা ঘুম-বিশ্রামের সুযোগ মেলেনি। তাকে দেখে মনে হলো না সে পরীক্ষা দেওয়ার মতো স্বাভাবিক অবস্থায় আছে। এ চিত্রটি আমাকে আজও ভাবায়, বিব্রত করে। কী কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি বাবা-মেয়ে! আমার মনে হয়, এ অবস্থা হরহামেশাই ঘটছে। কিন্তু আমাদের চোখে পড়ে না।
প্রতিবছরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে। প্রায়ই মনে হয় এ সম্পর্কে লেখা উচিত। কিছু বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন। ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রতিবছর এই সময়ে। এ সময়টিতে কয়েক লাখ পরীক্ষার্থী পাগলের মতো ছুটে বেড়ায় সারা দেশে। যে ছেলেটি একা একা কয়েক মাইল হাঁটেনি, সে তার জীবন গড়ার জন্য পাড়ি দিচ্ছে কয়েকশ মাইল পথ। শুধু শিক্ষার্থী নয়, তাদের অভিভাবকও থাকেন, সন্তানকে নিয়ে ছোটেন সারা দেশ। আর্থিক, শারীরিক, মানসিক সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারের ওপর। তা ছাড়া ফরমের দামও তো কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ইউনিট করায় একাধিক ফরম কিনতে হয়।
তবে আশার কথা হচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে মেডিকেল পরীক্ষা হচ্ছে একদিন, চমৎকার একটি সিস্টেম। যেমন—ঢাকা মেডিকেল থেকে শুরু করে নীলফামারী মেডিকেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি দিনে, একটি প্রশ্নপত্রে। পরীক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী ভর্তি হবেন। যদিও সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছ পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট বাদে বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করছে। দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, খরচসহ বিভিন্ন ভোগান্তি লাঘবের জন্য এ বছর প্রথমবারের মতো গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হঠাৎ করে বিভাগ পরিবর্তনের ইউনিট না রাখার সিদ্ধান্ত, ফি বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে সিলেকশন পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ—এ কারণে শিক্ষার্থীকে দুবার আবেদন ফি ও সেবা চার্জ, পছন্দক্রম অনুযায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র না পড়া, কর্মদিবসে পরীক্ষা, ফলাফলে অসামঞ্জস্য এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগকেন্দ্র না থাকায় এ পরীক্ষা নতুন করে দুর্ভোগ তৈরি করেছে। অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পরীক্ষা গ্রহণ থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত পদে পদে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থীই যাতায়াতসহ অন্যান্য ভোগান্তি লাঘবের কথা ভেবে প্রথমে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্তকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতির দীর্ঘদিন পর সিদ্ধান্ত হয় বিভাগ পরিবর্তনের ইউনিট থাকবে না, তখনই তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ধাপে ফলাফলে নির্দিষ্ট শর্ত দেওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বাদ পড়ে যান। অর্থাৎ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের দুর্ভোগ কমেনি, বরং নতুন করে বেড়েছে।
বিশাল এক দুঃসহ লড়াই, ধকল, দুরবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হবে পরীক্ষার্থী ও তার পরিবারকে। মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও ভয়ানক অবস্থা। এগুলো দূর করতে হবে। স্বস্তি দিতে হবে অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীদের। তাই সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে মাত্র একটি অভিন্ন পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। তা ছাড়া এই দুরবস্থা, এই লড়াই শেষ হবে না। সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সব প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে। আমি আগেও বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ঠিক রেখে গুচ্ছপরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে। কিন্তু গুচ্ছপরীক্ষা পদ্ধতির সমস্যাও অনেক। গত বছর গুচ্ছপরীক্ষা আয়োজনের সময় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার কেন্দ্রে ঘড়ি না থাকা, ওএমআর শিটে শিক্ষকের স্বাক্ষর না দেয়ার মতো সমস্যার অভিযোগ করেছেন। অনেকে এও অভিযোগ করেছেন, গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষায় মেধার সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রক্রিয়াগত ভুলের কারণে অনেকে একটি প্রশ্নের উত্তর না করেও নম্বর পেয়েছেন। আবার অনেকের নম্বর এসেছে ভুল। পরবর্তীতে ফলাফল ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নিয়ে সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করলেও লাভ হয়নি। কদিন আগে সংবাদমাধ্যমে একটি খবরে জানতে পেরেছি, ওয়েবসাইটে ভুল ফলাফল প্রকাশের কারণে মেধাতালিকায় থেকেও একজন নারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। ঘটনাটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের। পরে সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হলেও ওই শিক্ষার্থীর ভর্তি হওয়ার মেয়াদ পার হয়ে গেছে। ওই শিক্ষার্থী অন্য কোথাও আবেদন করেনি। তার পক্ষে পরের বছর পরীক্ষা দেওয়ারও উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে শুনিনি। এখানেই শেষ নয়। গুচ্ছপরীক্ষায় ফলাফল প্রকাশের অনেক পরে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। অর্থাৎ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের অনেক পরে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয় বিভিন্ন অনুষদে যে আবেদন ফি ধার্য করে, তা অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে বহন করা কঠিন। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এত সমস্যা মোকাবিলা করে গুচ্ছপরীক্ষা দিয়ে কী লাভ হলো? যেখানে বলা হয়েছিলো গুচ্ছপরীক্ষা শিক্ষার্থীবান্ধব হবে। কিন্তু এখনও ভোগান্তি ভোগ করতে হচ্ছে, সবকিছু মেনে নিতে হচ্ছে। ফলাফলের ভূতও মেনে নিতে হয়। তবে আমি মনে করি, গুচ্ছপরীক্ষা মূল সমস্যা নয়। বলা যায়, গুচ্ছকমিটি আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। তার ওপর আবার আগামী বছর থেকেতো সেকেন্ড টাইম থাকছে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। গুচ্ছপরীক্ষার আগে অন্তত অনেক পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে সেকেন্ড টাইম চালু ছিল। এবার তা না থাকায় সমস্যা আরও বেড়েছে।
আমি ইংল্যান্ডে দেখেছি এ ধরনের ভর্তি পরীক্ষার সময় ইউসিসিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে বিশ্বে অনেক দেশ থেকে আবেদনপত্র জমা পড়ে ভর্তির জন্য। ইউসিসিএ সে আবেদনপত্র বাছাই করে ও পরীক্ষার আয়োজন করে। ফলে পুরো ভর্তি পরীক্ষা নিয়মমাফিক, সুষ্ঠুভাবে এবং একদিনেই শেষ হয়ে যায়। ইংল্যান্ডে এত বড় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বাংলাদেশে কেন সম্ভব হবে না? এখানে অনেক দক্ষ জনবল আছে, কাজ করার মানুষ আছে। দরকার শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের। ইউসিসিএ-এর মতো বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় সরকারি স্বায়ত্তশাসিত একটি আলাদা কমিশন থাকতে হবে। তাদের কাজ হবে সমস্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নিয়ে কাজ করা। তারাই শিডিউল তৈরি করবে, তাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হবে। তারা পরীক্ষার্থীর যোগ্যতা ও পছন্দমতো সব মিলিয়ে মেধাক্রম, ভর্তি, অবস্থান নিরূপণ করবে। এ জন্য দরকার সরকারের দৃঢ় ইচ্ছা। আমার চিন্তানুযায়ী, এ জন্য প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টদের উদার মানসিকতা ও আর্থিক সুবিধাদি ত্যাগের মানসিকতা। অনেকেই জোর দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ করা যাবে না, তাদের ভর্তি নিয়ে কথা বলা যাবে না। তাদের নিজস্ব আইন আছে। হ্যাঁ আমিও মানছি তা। কিন্তু গত কয়েক দশকে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। নিয়মনীতিতে এসেছে আধুনিকতা। স্বায়ত্তশাসন ঠিক রেখে শিক্ষার্থীদের ধকল কমাতে এই আইন সংসদের মাধ্যমে পাশ করা যেতে পারে। ভারতে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা হচ্ছে। সুষ্ঠুভাবে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছেন সকল পরীক্ষায়। আমাদেরও সেরকমই পরিবেশ দরকার। ২০২০ সালে অটোপাস পদ্ধতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেকটাই নাজুক করে দিয়েছে। এ বছর এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে কিছুটা হতাশ হয়েছি। সামনেই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধ শুরু হবে। গুচ্ছপরীক্ষায় এমন অবস্থা টিকে থাকলে আখেরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই ক্ষতি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কাছে একটাই চাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। তারা যেন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা একটু ভাবেন। গুচ্ছপরীক্ষা পদ্ধতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এজন্য পুরো প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা টেকসই করা জরুরি। গুচ্ছপদ্ধতি যেন সত্যিই শিক্ষার্থীবান্ধব হয়, সেভাবেই পরিকল্পনা নিতে হবে এবং করতে হবে বাস্তবায়নও।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল