× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শুল্ক সমস্যা

দেশের গার্মেন্টস শিল্পের স্বার্থে সমাধান জরুরি

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৫ ১৬:১০ পিএম

নিরঞ্জন রায়

নিরঞ্জন রায়

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে উচ্চ শুল্ক হারের অস্ত্র ব্যবহার করে সমগ্র বিশ্বে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন, সেই যুদ্ধ যেন থামছেই না। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে থেকে, মূলত নির্বাচনী প্রচারের সময় থেকে জোরেশোরে বলে আসছেন যে তিনি যেসব দেশের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘটতি আছে, সেসব দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করবেন। আরও একটু পিছনে গেলে দেখা যায় যে, ট্রাম্প গত মেয়াদে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেই শুল্ককে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সে সময় বিষয়টি ছিল বেশ সীমিত পরিসরে। এমনকি এবারের নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তিনি নির্ধারিত কয়েকটি দেশকে ইঙ্গিত করে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মূলত, আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতি চীনের বিরুদ্ধে তিনি যে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করবেন তেমন আভাসই ট্রাম্প দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে, চীন ছাড়া বাকি সব দেশই ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক হারের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। 

ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই নির্বিচারে বিশ্বের সকল দেশ, যাদের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেন এবং তা কার্যকরও করে ফেললেন। বাদ যায়নি আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্র ন্যাটোর সদস্য দেশ। আমেরিকার অতি ঘনিষ্ঠ এবং নিকট প্রতিবেশী কানাডা ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক হারের প্রথম শিকার। এমনকি ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কের প্রভাব থেকে বাদ দেওয়া হয়নি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকেও, যেখান থেকে সস্তায় পণ্য আমদানি করে আমেরিকার করপোরেট ব্যবসায়ীরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেন। ট্রাম্পের এই উচ্চ শুল্কের বিপরীতে অনেক দেশ, বিশেষ করে যাদের সক্ষমতা আছে, তারাও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র কানাডা এবং চীন ভালো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে বিশ্বব্যাপী দেখা দেয় মারাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধ, যার প্রভাবে বিশ্বে মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়। আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা, এমনকি মহামন্দাও দেখা দিতে পারে মর্মে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এখানকার অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আর্থিক বিশেষজ্ঞরা।

আমেরিকার মন্দার শঙ্কার কারণেই হোক, আর বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যেই হোক, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ঘোষিত উচ্চ শুল্ক হারের কার্যকারিতা ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করে, যার সীমারেখা গত ৯ জুলাই অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এই উদ্যোগকে অনেকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি বলেছেন, আবার অনেকে কৌশলী বিরতি বলার চেষ্টা করেছেন। যেভাবেই বলা হোক না কেন, উচ্চ শুল্ক হার প্রয়োগের পদক্ষেপ সাময়িক স্থগিতের উদ্দেশ্য ছিল একাধিক। প্রথমত, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনের মাধ্যমে মন্দার প্রভাব এড়ানো। দ্বিতীয়ত, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে, বিশেষ করে যেসব দেশের বিপরীতে আমেরিকার বাণিজ্যঘাটতি আছে, সেসব দেশ আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে একটি বাণিজ্য সমঝোতা বা ট্রেড ডিলে পৌঁছতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল যে, ৯০ দিনের সাময়িক বিরতির মধ্যে বাণিজ্যিক অংশীদেশগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। 

নব্বই দিন পার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার যে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য সমঝোতা হয়েছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি দেশ, অর্থাৎ যুক্তরাজ্য, চীন এবং ভিয়েতনাম আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা করতে পেরেছে। যুক্তরাজ্য বাণিজ্যিকভাবে কতটা সমঝোতায় উপনীত হতে পেরেছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। অনেকের ধারণা যে যুক্তরাজ্য আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের প্রভাব কাটিয়ে তাদের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক হার হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। যেভাবেই হোক না কেন যুক্তরাজ্য ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক হারের অস্ত্র থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। চীনের ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্ন। চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য সমঝোতা হয়েছেÑ এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বরং বলা যেতে পারে যে, চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতি (ট্রেড ওয়ার ট্রুস) কার্যকর হয়েছে। আমেরিকার উচ্চ শুল্ক আরোপের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও আমেরিকার বিরুদ্ধে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু দুটো দেশই বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতির দেশ, তাই তারা এই বাণিজ্য যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়। সেই বিবেচনায় ভিয়েতনাম একমাত্র দেশ, যারা আমেরিকার সঙ্গে একটি বাণিজ্য সমঝোতা বা ট্রেড ডিলে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।

এই তিনটি দেশের বাইরে আর কোনো দেশ এখন পর্যন্ত আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতা করতে সক্ষম হয়নি। তবে সব দেশ আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক হার লাঘবের উদ্দেশ্যে বাণিজ্য সমঝোতা বা ট্রেড ডিল করার ব্যাপারে কতটুকু এগিয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির ওপর পূর্বের ঘোষিত শুল্ক হার ৩৭% থেকে কমিয়ে ৩৫% করা হয়েছে। এটি মূলত শুল্ক হার হ্রাস বা বাণিজ্য সমঝোতার পর্যায়ে পড়ে না। বাংলাদেশের ওপর শুল্ক হার হ্রাস করার অনুরোধ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ট্রাম্পের কাছে যে পত্র দিয়েছিলেন তার প্রতি এক ধরনের নামমাত্র সম্মান জানানো ছাড়া আর কিছুই নয়।

ট্রাম্পের উচ্চ শুল্কের প্রভাবে বিশ্বের অনেক দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বাদ যাবে না আমাদের দেশও। বরং আমাদের দেশ যে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আমাদের রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ খুবই সীমিত। তৈরি পোশাক হচ্ছে একমাত্র উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্য। এই তৈরি পোশাকের সিংহভাগ রপ্তানি হয় আমেরিকার বাজারে। এই উচ্চ শুল্ক হারের কারণে আমেরিকার বাজারে পণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। কেননা দিনশেষে পণ্যের মূল্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে যে শার্ট আমেরিকার আমদানিকারক দশ ডলারে ক্রয় করে, সেই শার্টের মূল্য তখন হবে ১৩.৫০ ডলারÑ শুধুমাত্র ৩৫% শুল্কের কারণে। আকস্মিক এই মূল্যবৃদ্ধিতে একদিকে যেমন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের চাহিদা হ্রাস পাবে, অন্যদিকে তেমনি আমেরিকার ব্যবসায়ীরা বিকল্প রপ্তানি দেশ খুঁজে  নেবে। ফলে সমগ্র তৈরি পোশাক খাত এক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যাবে। আর তেমনটা হলে, দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি তো হবেই, সেই সঙ্গে দেখা দিবে সামাজিক অস্থিরতা। তৈরি পোশাক একটি শ্রমঘন খাত, যেখানে নিয়োজিত আছে পঞ্চাশ লক্ষাধিক শ্রমিক, যাদের অধিকাংশ আবার নারী। এই শ্রমিক জনগোষ্ঠী যদি কোনো কারণে বেকার হয়ে যায়, তখন তার প্রভাব হবে ভয়ানক। কেননা বেকার থাকা, আর কর্মক্ষম অবস্থা থেকে বেকার হয়ে যাওয়া এক নয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে দ্বিতীয় সমস্যার মাত্রা ও তীব্রতা অনেক বেশি। 

এমনিতেই আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং অনেক কারখানা আন্দোলন, সংগ্রাম এবং সরকার পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকরা আছেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। এই অস্থির অবস্থার কারণে আমেরিকার আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারছে না এবং রপ্তানি আদেশও সংগ্রহ করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এমনিতেই তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ সংগ্রহ করতে হয় কমপক্ষে ছয় মাস আগে। শীতের পোশাক রপ্তানির আদেশ সংগ্রহ করা হয় গ্রীষ্মকালে, আর গরমের পোশাক রপ্তানির আদেশ সংগ্রহ করতে হয় শীতকালে। তাই অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা থাকলে এই ধরনের রপ্তানি আদেশ পেতে যে সমস্যা হবে তা সবারই জানা। 

যেভাবেই হোক দেশের রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজন আছে তৈরি পোশাক খাতের দিকে। এই রপ্তানি খাত এখন নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে গেছে এবং সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক হার। যে করেই হোক এই শুল্ক হার কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য আলোচনাই একমাত্র পথ। তবে সেটি হতে হবে কৌশলী আলোচনা। সাধারণ আলোচনা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ বা চিঠি লেখার মাধ্যমে এই শুল্ক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এমনকি শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে সে রকম সারা নাও পাওয়া পেতে পারে। এজন্য কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সবার আগে প্রয়োজন দেশে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। যাদের আধুনিক পদ্ধতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক সমঝোতা বা ট্রেড ডিলে পৌঁছার কাজে যাদের ভালো অভিজ্ঞতা আছে, তাদের এই কাজে নিয়োজিত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে ভালো হয় সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সরাসরি নিয়োজিত করতে পারলে। 

ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক হার প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে ৯০ দিনের বিরতি দেওয়া হয়েছিল, তা অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আলোচনার সুযোগ এখনও আছে। আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছার জন্য কোনো সীমারেখা নেই। ট্রাম্প নিজেও স্থানীয় মিডিয়ার কাছে উল্লেখ করেছেন যে চূড়ান্ত সীমারেখা বলে কিছু নেই। যেকোনো দিন, যেকোনো সময়ই ট্রেড ডিল হতে পারে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা বা ট্রেড ডিল সম্পন্ন করা প্রয়োজন, যার অধীনে শুল্ক হার হ্রাস করা যায়। মূল কথা হচ্ছে, দেশের গার্মেন্টস শিল্পের স্বার্থেই এই শুল্ক সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। এর কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে নেই।

  • সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা