অর্থনীতি
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৫ ১৭:৩২ পিএম
মীর আব্দুল আলীম
নানা সংকটে শিল্পকারখানা ধুঁকছে। পাচারের পথ-ব্যাংকিং খাতের চক্র ও আমাদের দায়গত পনেরো বছরে দুই লাখ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ‘অদৃশ্য’ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন তা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। ‘ব্যাংক ব্যবস্থা এখন আর্থিক খোলসে দুর্বল, ভেতরে প্রায় ফাঁকা’- এই বক্তব্য দেশবাসীর আত্মবিশ্বাসে এক বড় ধাক্কা। একদিকে খেলাপি ঋণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক লুটপাট- সব মিলিয়ে এই খাত এখন অশুভ আঁধারের কুয়াশায় ঘেরা। আমরা জানি, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গেলে কেবল কাগজে-কলমে জিডিপির হার দিয়ে তা ঢেকে রাখা যায় না।
জনগণের টাকায় বানানো ব্যাংক, জনগণের ওপরই যখন বিপদ হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠেÑ ঠিক কীভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দুর্নীতির ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। জানব, কারা এই অর্থ লোপাটের প্রধান রূপকার, কেন এতদিন তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে, আর কীভাবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের ধারাবাহিকতা থামানো সম্ভব। আমরা অনুসন্ধান করব- এই লুণ্ঠনের পেছনের কাঠামোগত ফাঁক, দুর্বল নীতিমালা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আমরা তুলে ধরব কিছু বাস্তবসম্মত করণীয়, যা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, জনগণের হৃদয়ে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। এই লেখা কোনো একক অভিযোগ নয়, বরং এক সামষ্টিক আত্মসমালোচনার আহ্বান। সময় এসেছে সত্যের মুখোমুখি হওয়ার। এই রাষ্ট্রের টাকা কারা লুটলÑ এ প্রশ্ন আর অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।
অর্থনৈতিক ডাকাতির মানচিত্র বাংলাদেশের ব্যাংক খাত যেন এক অদৃশ্য গোলকধাঁধা, যেখানে প্রবেশ আছে, কিন্তু দায় নেওয়ার কোনো দরজা নেই। প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ফুলেফেঁপে ওঠা ব্যবসায়ী এবং কথিত বিনিয়োগকারীরাÑ সবাই যেন এক অদৃশ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ভাগ করে নিচ্ছেন জনগণের সঞ্চয়। এসব লুটপাটের রাস্তাগুলো একদিকে খুব চেনা, আবার অন্যদিকে এতটাই জটিলভাবে সাজানো যে- একে রীতিমতো আর্থিক অন্ধকারের জাল বলা চলে। প্রথমত, বড় আকারের ভুয়া ঋণ, যা দেওয়া হয় পরিচিত গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এসব ঋণের বিপরীতে নেই সঠিক জামানত, নেই প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম। আছে শুধু প্রভাব, ফোন কল এবং দুর্বল ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ। হলমার্ক কেলেঙ্কারি এই দুষ্টচক্রের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে এই গ্রুপটি ভুয়া দলিলের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। ব্যাংকের ভেতরের কর্মকর্তারা তখন কেবল ‘হ্যাঁ স্যার, জী স্যার’ বলেই চোখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তখন এই প্রশ্ন কেউ তোলেনিÑ একটি কোম্পানি কাগজে-কলমে আছে, কিন্তু বাস্তবে কোথায়?
অর্থপাচারের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিস্থিতি তুলনা করলে দেখা যায় যে, ভারত এবং পাকিস্তানেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। ভারতে ব্যাংকিং খাতে এনপিএ (নন-পারফর্মিং অ্যাসেট) সংকটের কারণে আর্থিক অনিয়মের ঘটনা প্রচুর। বিজয় মালিয়ার পলাতক হওয়া বা নীরব আর্থিক কেলেঙ্কারি এ বিষয়টির উদাহরণ। তবে, ভারত কঠোর আইন এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি অর্থপাচারের প্রধান কারণ। এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল আর্থিক কাঠামোর কারণে পাচার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশে অর্থপাচারের হার এবং এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। এখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জড়িত থাকার কারণে এই ঘটনা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
লোপাট হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থ ফেরানোর জন্য জাতিসংঘ, ইন্টারপোল এবং বিশ্বব্যাংকের ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো উদ্যোগগুলোর সহায়তা নিতে হবে। পাচারের অর্থের উৎস এবং গন্তব্য শনাক্ত করতে বিশেষজ্ঞ সংস্থা নিয়োগ দিয়ে গভীর তদন্ত পরিচালনা করতে হবে। পাচারকারীদের সম্পত্তি জব্দ করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থ লোপাটে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের নামে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের ঘটনাগুলো প্রায়শই পত্রপত্রিকায় উঠে এসেছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংক নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেনি। এমনকি অনেক সময় ক্ষমতাসীন নেতাদের নাম জড়িত থাকায় তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আর্থিক অনিয়মের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দলের অভ্যন্তরে আত্ম-সমালোচনা এবং দুর্নীতিবাজদের দল থেকে বাদ দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটা বাংলাদেশে কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যারা যখন সুযোগ পায় তারাই লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্ণধাররা শক্ত হাতে সততার সঙ্গে চাইলে তা দূর করা সম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে অর্থ লোপাটের অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন সরকারি আমলারা। ঋণ অনুমোদন, ভুয়া প্রকল্পের অর্থায়ন, এবং পাচারের পথ সহজ করতে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ঋণের অধিকাংশই সরকারি প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সুপারিশে দেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অর্থ লোপাট ও পাচারের ঘটনায় পত্রপত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। গণমাধ্যমের সাহসী প্রতিবেদন অনেক ঘটনাকে জনগণের সামনে নিয়ে এসেছে। তবে, এখনও অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে চাপে ফেলা হয় এবং তারা সত্য প্রকাশে বাধাপ্রাপ্ত হয়। গণমাধ্যমকে আরও স্বাধীনতা দেওয়া এবং সত্য প্রকাশে সহায়তা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, ভুয়া খবর ও প্রোপাগান্ডার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
অর্থপাচারে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মধ্যে কারা বেশি সম্পৃক্ত তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সুযোগ বেশি থাকে। অন্যদিকে, আমলারা তাদের অবস্থান এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে পাচারের পথ তৈরি করেন। উভয় পক্ষকে আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখীন করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থপাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে। ব্যাংকিং কার্যক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়াতে হবে। পাচারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তথ্য বিনিময় এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে হবে। জনগণকে অর্থপাচারের বিষয়ে সচেতন করা এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরিচ্ছন্ন অর্থ সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সেইসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নির্মূল করা, জবাবদিহিতা বাড়াতে অর্থনৈতিক নীতিমালা সংস্কার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।
এই দেশ এক সময় রক্ত দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল। আজ সে রক্ত কেবল রঙিন পোস্টারে ছাপা হয়। তখন ট্যাংক, বন্দুক আর বুলেট ছিল শত্রু। এখন শত্রু স্যুট-টাই পরা ভদ্রলোকেরা। যারা কালো গ্লাসে চা খাওয়ার পরামর্শদাতা। ব্যাংক ছিল রাষ্ট্রের হৃদপিণ্ডÑ সেখান থেকে এখন রক্ত টেনে নেয় একদল অর্থলোভী পিশাচ। হলমার্ক, বেসিক, এস আলম, বিসিআইসিÑ এই নামগুলো কেবল কেলেঙ্কারির নাম নয়, এগুলো হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্ন। এটা কেবল অর্থনৈতিক সংকট। না, এটা একটি নৈতিক ধস। এই ধস থামাতে হলে দরকার একটা আত্মশুদ্ধির আন্দোলন, যার শুরুটা হবে নিজের মুখের আয়নায় তাকিয়ে জিজ্ঞেস করার মধ্য দিয়ে । এই লুটপাটের দায় একদিন ধুলোর নিচে চাপা পড়বে না। ইতিহাস জানে, কে কখন চুপ ছিল, কে কখন মঞ্চে উঠে কবিতা পড়েছিল, আর কে টাকায় কিনেছিল বিবেকের মৌনতা। এদেশ একদিন হিসাব চাইবেই।
অর্থপাচারের ঘটনা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পুরনো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।