× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গণঅভ্যুত্থান

সুযোগটা যেন বিফলে না যায়

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৫ ১৬:২০ পিএম

মহিউদ্দিন খান মোহন

মহিউদ্দিন খান মোহন

গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে। সে সুযোগকে কাজে লাগানোর প্রধান দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর। আর তা করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সংকীর্ণতা পরিহার ও সমঝোতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের ১০ মাস পার হওয়ার পর সে পথে এক পা এগোনোর আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার সব দলের সম্মতিতেই রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছিল। এ লক্ষ্যে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, অর্থনৈতিক খাতসহ ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। এর ওপর রয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। মূলত সংস্কার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্দেশ্যে এ কমিশনের জন্ম। 

এর আগে আমাদের দেশে দুবার জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে। একবার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়, আরেকবার ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ পতনের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে হটাতে দল-মত নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জনগণ সেদিন সব ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে শামিল হয়েছিল। প্রতিষ্ঠা করেছিল জাতীয় ঐক্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ফ্যাসিবাদের অবসানের পর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইন করে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করতে হয়েছে। এ এক অভিনব ব্যাপার! 

তারপরও দেশবাসী জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে বাঁকা চোখে দেখছে না। তাদের কথা হলো, ‘দাগ থেকে যদি ভালো কিছু হয়, তাহলে তো দাগই ভালো’। তবে ডিটারজেন্ট পাউডারের বিজ্ঞাপনে কথাটি যত অর্থবহ, বাস্তবে ততটা নয়। কারণ সে দাগ যখন জনগণের মনে দাগ কাটতে পারছে না অথবা তাতে নতুন যে দাগ লেগে যাচ্ছে, তা অমোচনীয় কালির দাগ হয়ে যায় কি না তা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। এ পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে তেমন কোনো ঐকমত্যের আভাস পাওয়া যায়নি। স্বয়ং কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ আট মাস পরে এসে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, অগ্রগতি তেমন হয়নি। তবে তিনি হতাশ নন। হতাশ তো আমরা, মানে দেশের জনগণও হতে চায় না। তারা তো আশায় বুক বেঁধে আছে, ইউনূস সরকারের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতিকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রের স্বচ্ছন্দ চলার পথ করে দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু ভেতরের যেসব খবরাখবর বাইরে আসছে তা কোনো মতেই আশাব্যঞ্জক নয়। এ পর্যন্ত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল’ ও সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা’ কমানোর বিষয়ে দলগুলো সর্বসম্মতভাবে একমত হওয়া ছাড়া আর কোনো ইস্যুতে কাছাকাছি আসতে পারেনি। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। তবে আশা করা যায়, পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় তা নিরসন করা সম্ভব হবে। 

রাষ্ট্র সংস্কার ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি এখনও। যদিও লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নির্বাচনী রোডের সামনের কুয়াশা অনেকটাই কেটে গিয়েছিল বলে অনেকে ধারণা করেছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ মর্মে একমত হয়েছিলেন যে, গ্রহণযোগ্য সংস্কার শেষে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা যেতে পারে। এ সমঝোতার খবরে বিএনপি শিবিরে উল্লাসের জোয়ার এলেও ভিন্ন চিত্র দেখা যায় বিপরীত দিকে। ৫ আগস্টের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারে প্রভাব বিস্তারকারী জামায়াতে ইসলামী ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত দল এনসিপির অসন্তুষ্টি জনমনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়Ñ তাহলে কি তারেক-ইউনূস সমঝোতা বিফল হবে? কেননা, এই বৈঠকের পর লন্ডনে যে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়, তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি। তাদের মতে, প্রধান উপদেষ্টা একটি মাত্র দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘাষণা করে ঠিক কাজ করেননি। এনসিপি তো ‘অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপির দিকে ঝুঁকে গেছে’ বলে অভিযোগ করে বসে। 

এরই মধ্যে এনসিপি বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি করে সরকারের কাছে। এ বিষয়ে সরকার কোনো কথা না বললেও গত সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টা তার কার্যালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, নির্বাচন কমিশন ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এ গুজবকে অধিকতর সত্যতা দেয় এরপর দুদিন সিইসি অফিস না করায়। অবশ্য পরে সিইসি নাসির উদ্দিন কাজে যোগ দিয়ে ‘আমরা ফুল স্পিডে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছি’ বলে গণমাধ্যমকে জানালে সে গুজবের অবসান ঘটে। তবে জনমনে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছিল, অতীতের মতো এনসিপির দাবিকে উপেক্ষা করতে না পেরে সরকার হয়তো নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দিকেই এগিয়ে যাবে। কিন্তু সাংবিধানিক বাস্তবতার কারণে সরকার সেদিকে এগোয়নি। নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের পদ সাংবিধানিক এবং তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাদেরকে অপসারণ করা কঠিন। আমাদের সংবিধানের যে ধারায় (১১৮) নির্বাচন কমিশন গঠন ও এর কার্যাবলি উদ্ধৃত রয়েছে, তার (৫) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলি রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে; তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।’ (৬) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগ করিতে পারিবেন।’ অর্থাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা পুরো নির্বাচন কমিশনকে সরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জটিল একটি পন্থা। সংগত কারণেই ড. ইউনূস সে পথে অগ্রসর হননি। ফলে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির হাত থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে। সেই সঙ্গে এনসিপির মতলবি আবদারও মাঠে মারা গেছে। 

এদিকে নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে তা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে তুঙ্গে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধি (পিআর) পদ্ধতিতে অনুষ্ঠানের দাবি জানাচ্ছে। এ দাবির পক্ষে আছে নিবন্ধিত ৫০টি দলের মধ্যে ১৮টি। অন্যদিকে প্রচলিত পদ্ধতির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে বিএনপিসহ ২৮টি দল। বাকি চারটি দল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। পিআরের পক্ষের দলগুলো বলছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। তাই তারা প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে দলগুলোর মধ্যে সংসদের আসন বণ্টনের পক্ষে। মূল প্রশ্নটা এখানেই। কারণ বর্তমানে বিএনপির যে অবস্থান তাতে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোট হলে তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত। পক্ষান্তরে জামায়াত-এনসিপিসহ বাকি দলগুলোর প্রাপ্তি হবে নগণ্য। তাই ক্ষমতার অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে তারা এই দাবি তুলে পরিস্থিতিকে অনুকূলে নিতে চাচ্ছে। 

রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের মতে, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আমাদের দেশের জন্য এখনই উপযোগী নয়। কেননা এর ফলে দেশের গণতান্ত্রিক সরকার-ব্যবস্থা অস্থিতিশীলতার আবর্তে পড়তে পারে। এ বিষয়ে নির্বাাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বর্তমানে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি একটি দৈনিককে বলেছেন, ‘হুট করে কোনো দেশের নির্বাচন পদ্ধতি পাল্টানো যায় না। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ছোট ছোট দল কারণে-অকারণে সরকারকে ফেলে দিতে চাইবে।’ জেসমিন টুলির মন্তব্যের যথার্থতা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ কম। কারণ আমাদের দেশে এখনও গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করেনি। ফলে এখানে নির্বাচনকে ‘গিনিপিগ’ বানিয়ে গবেষণার চেষ্টা হবে আত্মঘাতী। এদিকে এনসিপি দাবি করে বসে আছে, সংস্কার ও জুলাই সনদ ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান গত ৪ জুলাই রংপুরে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘এখন দেশের এই পরিস্থিতিতে কীসের নির্বাচন? আগে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সে পরিবেশ তৈরির জন্য আমরা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছি। নির্বাচনের আগে সংস্কার করতে হবে।’

তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তনের ইস্যুতে দলগুলোর ঐকমত্যে দেশবাসীর মনে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল, পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ও দলগুলোর বিপরীত মেরুতে অবস্থান তা নির্বাপিত করে দিতে উদ্যত হয়েছে। সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, দলগুলো যদি গণতন্ত্রের স্বার্থে সমঝোতায় আসতে না পারে তাহলে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিফলে যেতে পারে।

  • সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা