× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজধানী

এই বর্ষা হোক জলাবদ্ধতামুক্ত

শেলী সেনগুপ্তা

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৫ ১৭:৪৪ পিএম

শেলী সেনগুপ্তা

শেলী সেনগুপ্তা

‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেবো মেপে’- বৃষ্টি নামলেই সবার মুখে মুখে এ ছড়া, যা মানুষের প্রাণের সুরে রচিত। গ্রাম সংস্কৃতিতে বৃষ্টি এতটাই কাঙ্ক্ষিত যে উৎপাদিত ফসলের ভাগ দিতেও কার্পণ্য করত না। মেঘের শব্দে ময়ূর যেমন তার পেখম মেলে দেয়, তেমনি আবহমান বাংলার মাটি ও মানুষের কোমল মনও আনন্দে নৃত্য করে, চিত্রটা বেশ আনন্দের এবং উপভোগ্য। আনন্দময় এই চিত্রটি শুধু গ্রামবাংলার জন্য প্রযোজ্য। সারা দেশ, বিশেষ করে ঢাকা শহর এর আওতায় আসে না।

রাজধানী ঢাকা সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ঢাকার জনসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া সারা দেশের মানুষের জীবিকার জন্য রাজধানী ঢাকা উল্লেখযোগ্য। এখানে মানুষ ছুটছে প্রতিনিয়ত টাকা এবং ভালো থাকার পেছনে। সেই সঙ্গে বর্ধনশীল জনসংখ্যাকে ঘিরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসস্থান গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত উপায়ে। বর্তমান হিসেবে ঢাকা শহরে প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল খোলা জায়গা ও রাস্তাঘাট রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে পুরো শহর ছেয়ে গেছে কংক্রিটের মোড়কে। 

এই কারণেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতা এই শহরের একটি বড় সমস্যা। এজন্য একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে, একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়ছে বাস্তুতন্ত্রেও। কর্মঘণ্টার হিসাবে মানুষের বহু সময় ব্যয় হচ্ছে রাস্তাঘাটে আটকে থেকে। স্থবির হয়ে যাচ্ছে পথচলা ও পরিবহন। উল্লেখ্য, দেশজুড়ে এর প্রভাব পড়ছে, যদিও কেন্দ্রবিন্দু ঢাকাতেই রয়েছে।

বর্ষা এলেই বৃষ্টি হবে এবং এই বৃষ্টিকে উপভোগ করার মানসিকতা বাঙালির চিরন্তন। এই উপভোগ করার মানসিকতাকে একপাশে রেখে কিছু ভোগান্তিও চলে আসে। কখনও কখনও বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে। তখন স্বল্প সময়ের জন্য চলাচল করা একটু কঠিন হয়। রিকশা ভাড়া বেড়ে যায়। তখন আর বৃষ্টি উপভোগ করার মানসিকতা থাকে না, নগরজীবনের প্রতি বিরক্তি জন্মে। কারণ যখন বৃষ্টি উপভোগ করার কথা তখন যুদ্ধ করতে হয় জলাবদ্ধতার সঙ্গে।

জলাবদ্ধতার আরও ক্ষতিগুলোর মধ্যে রয়েছে, রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য অবকাঠামোর ভিত দুর্বল হয়ে পড়া এবং সেগুলো আর টেকসই না থাকা বা নষ্ট হয়ে যাওয়া। আবার বৃষ্টির পানিতে উপস্থিত বিভিন্ন লবণ তলানি পড়ে বেড়ে যায় ভূপৃষ্ঠের লবণাক্ততা, যার প্রভাব পড়ে বাস্তুতন্ত্রে ও জীববৈচিত্র্যে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায় যে, জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত জায়গার জীববৈচিত্র্যের তুলনায় অনাক্রান্ত জায়গার জীববৈচিত্র্য অনেক বেশি। পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন হিসাব করছে কীভাবে কৃষিজমির জলাবদ্ধতা রোধ করে উৎপাদন বাড়ানো যায় তখন আমরা ভাবছি কীভাবে রাজধানী ও অন্যান্য নগরের জলাবদ্ধতা দূরীভূত করে নগরজীবন স্বাভাবিক করা যায়। কারণ না চাইতেই আমাদের জীবন এখন নগরকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।

জলাবদ্ধতা এখন মুখরোচক আলোচনার বিষয়। কেউ কেউ বলে জলাবদ্ধতা দূর করা দরকার, আবার কেউ কেউ বলে কখনোই দূর হবে না। কিন্তু যখন কেউ বলে এটি কখনোই দূর হবে না তখন এর সঙ্গে বিরোধিতা করা যায়। আমরা জানি, এমন কোনো সমস্যা নেই যা সমাধান করা যায় না, তবে প্রথমেই এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। মাত্র কয়েকটা কারণ যদি সঠিকভাবে এর সমাধান করা যায় তাহলে ঢাকায় কখনও জলাবদ্ধতা হবে না। 

আমরা জানি, একদিকে শহরের অভ্যন্তরীণ খালগুলোর বেহাল দশা আর অন্যদিকে আশপাশে থাকা নদীগুলো প্রতিদিন অধিকতর জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় সমস্যা আরও গুরুতর রূপ নিচ্ছে। বুড়িগঙ্গা, বালু নদী, শীতলক্ষ্যা এবং তুরাগ প্রতিটি নদীই অবৈধ দখল, আবর্জনা ও রাসায়নিক বর্জ্য ইত্যাদি দ্বারা আক্রান্ত। এর মধ্যে বালু নদী বর্তমানে চরম নাব্যতা সংকটে ভুগছে এবং নদীটির ওপর অপরিকল্পিতভাবে প্রয়োজনের অধিক ব্রিজ নির্মাণ করায় এটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। একইসঙ্গে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য এবং শীতলক্ষ্যা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা বালির ব্যবসাও একটি লক্ষণীয় ক্ষতিকর কারণ।

অন্যদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্যও ঢাকার পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

তবে সচেতন হতে হবে ঢাকার নাগরিকদের। এ শহর আমাদের, তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আমাদেরও খেয়াল রাখতে হবে যেন বৃষ্টিরমুখর দিনগুলো আনন্দের হয়। এজন্য এর পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। 

প্রথম কারণ যেটি তা হলো আমরা যারা এই শহরে বসবাস করি, তারা নিজেদের কাজকর্মে অসচেতন থাকি। এমন সব কাজ করে থাকি, যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন ব্যবহারের পর পলিথিন, প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল বস্তু পানিবাহী ড্রেনের মধ্যে ছুড়ে ফেলি। কেউ কেউ বাজার করে পলিথনের ব্যাগে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেয় পার্শ্ববর্তী ড্রেনে। ফলে ড্রেন ভরাট হয় এবং ড্রেন বহমানতা হারায়। এটি না করে ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে অর্থাৎ সিটি করপোরেশন নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলি তাহলে ড্রেনে পানি প্রবাহ সুন্দর হয়। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকা যায়।

দ্বিতীয় কারণ কিছু অসাধু ভূমি ব্যবসায়ী বা ভবন ব্যবসায়ী নিচু জমি ভরাট করে সেখানে ঘরবাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা করে। এ প্রতিযোগিতায় যুগে যুগে বয়ে আসা স্রোতস্বিনী খালগুলো বাদ পড়ে নি। একটু সচেতন হলে এবং বর্তমান সরকারের নগর পরিকল্পনার সঙ্গে একাত্ম হলে এসব সমস্যা সহজেই সমাধান হয়। খাল ভরাট করার ফলে ঠিক মতো পানি প্রবাহিত হয় না। জলাবদ্ধতা হতে বাধ্য। 

আরেকটি কারণ, পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার ও যত্রতত্র পরিত্যাগ। গণমাধ্যমগুলোতে পলিথিনের ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকটি তুলে ধরা সত্ত্বেও এর ব্যবহার কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। যদি পাট বা চটের ব্যাগ ব্যবহার করা যায় তাহলে পলিথিনের ভয়াবহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি থাকা সম্ভব।

এই তিনটি বিষয়ে একটু সচেতন হলেই সুন্দর শহর ঢাকা, আমাদের প্রিয় শহর ঢাকা আরও সুন্দর নগরীতে পরিণত হবে। এ বিষয়ে সবার মধ্যে সচেতনতা জাগাতে হবে। বসতবাড়ি তৈরি করার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ভরাট করা জমি এবং আশপাশে পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকে।

অল্প দূরত্বের ব্যবধানে ম্যানহোল রাখতে হবে। তাতে জলাবদ্ধ নগরীর ময়লা নিষ্কাশন সহজ হবে। নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির গৃহকর্মীদেরও এ বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানদের বোঝাতে হবে যেন তারা নিজের নগরীর পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতন থাকে।

সবাই সচেতন হয়ে সভ্যতার অভিশাপ পলিথিন বর্জন করতে হবে। জলাবদ্ধতায় ঢাকার জনগণ খুব ভুগছে কিন্তু প্রতিকারের সহজ বিষয়টি নিয়ে কেউ ভাবে না। এমনও হয়েছে জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ও চিপ্সের খালি প্যাকেটটা রাস্তার পাশের ড্রেনে ছুড়ে ফেলা হলো। সিগারেটের খালি প্যাকেট ছুড়ে ফেলছে পাশের ড্রেনে। এ নগরী আমাদের, এর সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। তাই প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও রক্ষায় সচেষ্ট হয়। 

কথায় আছে ‘আপনি আচারি ধর্ম জীবেরে শেখাও’। প্রথমে নিজে চর্চা করতে হবে।

তাই সবসময় সরকারের ওপর নির্ভর না করে যার যার অবস্থান থেকে একযোগে চেষ্টা করতে হবে। সবার মধ্যে পরিবেশের প্রতি সচেতনতা জাগাতে হবে। তাহলেই ঢাকাবাসী পাবে একটা জলাবদ্ধতাহীন সুন্দর নগরী।

  • কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা