শ্রদ্ধাঞ্জলি
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৫ ১৭:৪১ পিএম
সাবেক সিএসপি ও সিইসি ড. এটিএম শামসুল হুদা গত ৫ জুলাই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান এলিট সার্ভিসে যোগদান করে মাঠ প্রশাসন এবং সরকারের সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিষয়ে পিএইচডিসহ তিনি বহুমাত্রিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। একজন মানবিক, পরোপকারী, সজ্জন মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশ এক বরেণ্য দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে। দোষ-গুণের বিচারে এ মানুষগুলো সত্যিই অতুলনীয় ছিলেন।
তার আত্মজীবনীবিষয়ক বই ‘ফিরে দেখা জীবন’ পড়াশোনা, চাকরি, অবসর জীবনের ওপর সুখপাঠ্য এক নাতিদীর্ঘ উপাখ্যান। তার বইটি পড়ার মত এবং কাছে রাখার বস্তু বিশেষ। বইটা ২০১৪ সালের একুশের বইমেলায় প্রথম আসে। ‘প্রথমা’ প্রকাশন থেকে বের হওয়ায় আপামর সুশীল সুধীজন ও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বইয়ের শুরুতেই বিগত ১/১১ সরকারের অধীনে তার সিইসি হওয়ার অন্তরালের কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে। এতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়েও বর্ণনা রয়েছে। পাঠ করলে চোখের সামনে এক নিবিড় নৈর্ব্যক্তিকতার প্রচ্ছন্ন ছায়া ফুটে ওঠে। এটি স্মৃতিজাগানিয়া বর্ণনা হলেও স্মৃতিকাতরতার লেশমাত্র নেই। ২১৫ পৃষ্ঠার নজরকাড়া মলাটের আবরণে দৃষ্টিনন্দন এক বই।
মনে হবে, ঝরঝরে পরিষ্কার, নির্মোহ অ্যাকাডেমিক কথামালার এক শ্রমসাধ্য গবেষণাপত্রের আলোকপাত। বইটি একজন ভালো ছাত্র ও মানুষের বেড়ে ওঠার প্রেরণাদায়ী কাহিনীও বটে।
‘আমাদের জ্যেষ্ঠ সহকর্মী মীর মোস্তাফিজুর রহমান তখন ময়মনসিংহের ডিসি। কিছু পরিবর্তনের পর দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত আমি, আমার ব্যাচমেট ফয়জুর রাজ্জাক আর প্রাদেশিক সার্ভিসের এস এ বারীÑ আমরা তিনজন এডিসি হিসেবে নিয়োজিত ছিলাম। সে সময় ময়মনসিংহে একজন পাঞ্জাবি এসপি পোস্টেড ছিলেন। এই অফিসার আর এডিসি বারী একযোগে ময়মনসিংহে কর্মরত সেনাব্রিগেডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিল। তাদের কারণে বহুবার আমাদের অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে।’ (ফিরে দেখা জীবন, পৃষ্ঠা ১২৬)।
মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন গল্পপ্রিয়, সৎ এবং সংবেদনশীল। খানিকটা ভোজনরসিকও ছিলেন। জেলা প্রশাসক হিসেবে মাঠের চাকরিতে থাকাকালীন কোনো এক শীতের বিকেলে তিনি আমাকে বললেন, আমার সঙ্গে গাড়িতে উঠুন। প্রশ্ন করার সুযোগ না পেয়ে কাঁচুমাচু হয়ে ডানপাশে উঠে বসি। প্রশাসন ও এই অঞ্চলের অতীত, বর্তমান নানা বিষয়ে তিনি আলোচনা করে চলেছেন।
আমিও কিছু কিছু বলেছি, তবে এটা অবশ্য তাকে আরও বেশি গল্পের মধ্যে প্রবিষ্ট করানোর লক্ষ্যে। হঠাৎ করে দেখলাম, গাড়িটা জেলার সীমানা অতিক্রম করে যাচ্ছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে জানালাম।
স্যার, আমার সীমানা শেষ। মেঘনার ব্রিজের পরে ঢাকা বিভাগ। জেলা নয়, আমি আরেকটা বিভাগের অধীনে চলে যাচ্ছি।
তিনি বললেন, তাতে কী হবে? আপনি তো আমার প্রটোকলে আছেন। এ সবকিছু নয়, আপনার কমিটমেন্ট, সততা, দেশপ্রেমই আসল।
তাহলে শুনুন, পাকিস্তান আমলের কথা। আমি যখন বাগেরহাটের এসডিও আর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাঈদ গোপালগঞ্জের। দুজনই ব্যাচেলর। বহুবার নৌকায় মধুমতী নদী পার হয়ে গিয়ে দুই বন্ধু গল্প করে রাত কাটিয়েছি। আবার সকালে ফিরে গিয়েছি। পাকিস্তানে আমাদের যেহেতু কিছু হয়নি, আপনারও হবে না।
অগত্যা, কিশোরগঞ্জ জেলাধীন ভৈরব বাজারে গেলাম। যথারীতি নির্বাচন কমিশনের উপজেলা সার্ভার স্টেশন উদ্বোধন করা হলো। সঙ্গে থাকলাম, আবার আড্ডা হলো। এবং রাত ৮টার দিকে তাকে ভৈরব থেকে বিদায় জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে আসি।
দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভ করা মানুষটি ৮৩ বছর বেঁচেছিলেন। ১৯৪৩ সালের ১০ জুলাই ফরিদপুরে তার জন্ম এবং ২০২৫ সালে একই মাসের ৫ জুলাই তার প্রয়াণ। এটা সত্যি যে, নিশ্চয় তিনি দীর্ঘায়ু পেয়েছেন। তবুও মনে হয়, এ মানুষগুলোর ক্রমাগত প্রস্থানের শূন্যতা কখনও রাতারাতি ভরে উঠবে না। এ ক্ষতি মানে অপূরণীয় এবং অভাবনীয়।