× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পবিত্র আশুরা

সত্যের মহিমায় ভাস্বর ঐতিহাসিক দিবস

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৫ ১৬:৩৯ পিএম

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

আজ ১০ মহরম, পবিত্র আশুরা। আশুরা মুসলিম ইতিহাসের আলোচিত, বরকতপূর্ণ ও অবিস্মরণীয় একটি দিন। এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুসলিম বিশ্বের নানা ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ। তবে হাল সময়ে সবকিছু ছাপিয়ে কারবালার প্রান্তরে নবী দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদতের কথাই বেশি উচ্চারিত হয়ে আসছে। আশুরা উপলক্ষে দুটি রোজা রাখা ও দান-খয়রাত অনেক সওয়াবের কাজ। তবে, আশুরার দিনের ইতিহাস ও বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে বলা যায়, আশুরা হলো মুক্তিকামী মুসলমানদের বিজয়ের দিন। ইমানওয়ালা ও পরকালে বিশ্বাসী মুসলমানদের শক্তি ও সাহস সঞ্চারের দিন। তাবৎ অন্যায়-অবিচার, ক্ষমতা কুক্ষিগত ও অপব্যবহার শেষ হওয়ার দিন। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং আশুরাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিস শরিফ ও ইতিহাসের কিতাবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মহরম হিজরি সনের প্রথম মাস। ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অবতারণা ১০ মহরম তথা আশুরা দিবসে ঘটেছে। সংগত কারণেই আশুরার তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। আশুরার গুরুত্ব সব নবীর যুগেই স্বীকৃত ছিল। ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত ঘটনাগুলো এ মাসে সংঘটিত হয়েছে। বলা হয়, বিপুল ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী আশুরা।

প্রাচীনকালের নানা জনগোষ্ঠীর কাছেও আশুরা পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয় ছিল। ইহুদিদের কাছে আশুরা জাতীয় মুক্তি দিবস হিসেবে পরিচিত। আশুরার মর্যাদা ইসলামেও স্বীকৃত। মুসলমানরা রোজা পালনের মাধ্যমে আশুরার মাহাত্ম্য স্মরণ করেন। মদিনায় হিজরতের পর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) লক্ষ করেন, ইহুদিরা আশুরা দিবসে রোজা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কোন দিন, যাতে তোমরা রোজা রেখেছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস, যেদিন আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি প্রদান করেছিলেন, ফেরাউনকে তার সম্প্রদায়সহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই হজরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এদিন রোজা রাখেন, এজন্য আমরাও রোজা রাখি। এ কথা শুনে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আ.)-এর অধিকতর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী। অতঃপর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। -সহিহ মুসলিম : ১/৩৫৯

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, রমজানের পর সব রোজার (নফল) মধ্যে আশুরার রোজা সর্বশ্রেষ্ঠ। তিরমিজি : ১/১৫৬

এই হলো হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছে আশুরার গুরুত্বের মূল তাৎপর্য। এখান থেকেই আশুরার রোজা ও অন্যান্য আমলের উৎপত্তি। এ ছাড়াও পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে মহরমের ১০ তারিখে, যা আশুরার দিনকে আরও তাৎপর্যময় করে তুলেছে। আমরা জানি, পৃথিবী সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই চলে আসছে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব। শাসক ও শাসিতের শ্রেণিবিভাজন। এসব অন্যায়-অবিচার থেকে মানবজাতিকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে যুগে যুগে আল্লাহতায়ালা অসংখ্য নবী-রাসূল (আ.) দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তাদের অন্যতম হলেন হজরত মুসা (আ.)। এরপর যত নবী-রাসূল (আ.) দুনিয়ায় এসেছেন তাদের প্রত্যেকেই হক-বাতিলের লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন। যেমন- হজরত ইবরাহিম (আ.) লড়েছেন অত্যাচারী শাসক নমরুদের বিরুদ্ধে, হজরত শোয়াইব (আ.) স্বার্থান্বেষী সমাজপতিদের বিরুদ্ধে, হজরত ঈসা (আ.) লোভী বকধার্মিকদের বিরুদ্ধে। যুগে যুগে এসব ঘটনা মুসলমানদের অনুপ্রেরণা, সাহস আর শক্তি জুগিয়ে এসেছে। আমাদের বিশ্বাস, আশুরার অন্তর্নিহিত শিক্ষা মুসলিম সমাজ লালন করলে তারা আরও শক্তিশালী হবে।

তবে আশুরা দিবসে ইমাম হোসাইনের বিয়োগান্তক শাহাদতের ঘটনা এ দিবসকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.) চতুর্থ হিজরির ৩ শাবান, শনিবার মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অসত্যের বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সত্যপথযাত্রীদের প্রাণের সান্ত্বনা। স্বৈরশাসক ও জালিম শাহির পতন আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল আপসহীন। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, দুঃশাসনের জগদ্দল পাথর সরিয়ে জাতির কল্যাণে মানবতাবাদীদের সামনে এগিয়ে যেতে হয়। ৬১ হিজরির ১০ মহরম সপরিবারে তাকে নির্দয়ভাবে শহীদ করে দেওয়া হয়। 

কারবালা প্রান্তরে হজরত হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদত আশুরাকে তাৎপর্যমণ্ডিত করে। খেলাফত-ব্যবস্থার পুনর্জীবন ছিল হজরত হোসাইন (রা.)-এর সংগ্রামের মূল লক্ষ্য। মুসলিম জাহানের বিপুল সমর্থন ছিল তার পক্ষে। হজরত হোসাইন (রা.)-এর গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ। মূলত হজরত হোসাইন (রা.) কে শহীদ হতে হয়েছিল জালিম শাসক ইয়াজিদ সরকারের বিচ্যুতির প্রতিকার চাইতে গিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন শাসনব্যবস্থাকে তার সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসতে। তিনি চেয়েছিলেন মজলুম মানবতার মুক্তি। 

অন্যভাবে বলা যায়, হজরত হোসাইন (রা.)-এর সংগ্রাম ছিল একটি মুক্তিযুদ্ধ। সেটি ছিল মানবতার মুক্তি, দুঃশাসন থেকে মুক্তি। এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে যে কখনও আপস হতে পারে না, জোট হতে পারে না। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের স্মৃতিবিজড়িত আশুরার ঘটনা এটাই শিক্ষা দেয়। জাতির স্বাধীনতা হরণ করা হলে গর্জে উঠতে হয়, তা-ই শেখায়। 

কারবালার ইতিহাস থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা রয়েছে। এ ইতিহাস আমাদের সাহসী হতে শিক্ষা দেয়। জাতি যখন দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছিল না, সত্য উপলব্ধি করার পরও যখন তারা অনিয়ম, নির্যাতন নীরবে হজম করে চলছিল, তখন হজরত হোসাইন (রা.) মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সাহসের সঙ্গে বলিষ্ঠ উচ্চারণে বলেন, কোনো প্রকারের জুলুম বরদাশত করা হবে না। তাই তো জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের মহিমায় ভাস্বর ঐতিহাসিক দিবসের নাম আশুরা। পৃথিবীর ইতিহাসে সত্য প্রতিষ্ঠাকারীদের মিছিলে হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতের ঘটনা বাতিলের বিরুদ্ধে হকের চিরন্তন সংগ্রামের এক নবতর সংযোজন বিশেষ। এর আবেদন ফুরাবার নয়। বস্তুত কারবালার প্রান্তরে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় হজরত হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ ও স্বার্থত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত মুসলিম ইতিহাসে নতুন প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে রয়েছে।

কারবালার আত্মত্যাগ কোনো মৃত ঘটনা নয়; বরং জীবন্ত একটি ঘটনার উদগিরণ। প্রতি বছর সেই কারবালা দিবস আমাদের যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শেখায়। প্রয়োজনে বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের শিক্ষা দেয়। উল্লেখ থাকে যে, আশুরাকে কেন্দ্র করে চলমান সমাজে এমন কিছু কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয় যা শরিয়ত সমর্থিত নয়। হজরত হোসাইন (রা.) কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কত বেশি ভালোবাসতেন, তার বর্ণনা মেলে বিভিন্ন হাদিস ও ইতিহাস গ্রন্থে। শিশু হোসাইনের কথাই ধরা যাক। কী গভীর সম্পর্ক ছিল নানাজির সঙ্গে তার। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজ আদায় করছেন আর হজরত হোসাইন (রা.) মওকা খুঁজছেন নানাজির সঙ্গে একটু খেলাধুলা করার। এ সুযোগটি এসে যায় হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সিজদায় চলে যান। নবীজিকে সিজদারত পেয়ে হোসাইন (রা.) চড়ে বসেন মহানবী (সা.)-এর পৃষ্ঠদেশে। আর দয়ার সাগর মহানবী তখন নড়াচড়া করতেন না। মাথা ওঠাতেন না সিজদা থেকে। শিশু হোসাইন (রা.) তার পৃষ্ঠদেশ থেকে নেমে না আসা পর্যন্ত পড়ে থাকতেন তিনি সিজদায়। 

অন্য আরেক হাদিসে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হে প্রভু! আমি হোসাইনকে ভালোবাসি, তুমি তাকে ভালোবেস। আমার কলিজার টুকরা হোসাইনকে যারা ভালোবাসবে, তাদেরও তুমি ভালোবেস।’ প্রিয় নবী (সা.)-এর এমন ভালোবাসা যার প্রতি ছিল তাকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে, হজরত হোসাইন (রা.)-কে ভালোবাসতে গিয়ে ইসলাম তথা কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থি কোনো কাজে জড়িয়ে যেতে হবে। এমন কাজ করতে হবে, যার অনুমতি নবী করিম (সা.) দিয়ে যাননি। এটা ভালোবাসা নয়। এমন কাজের অনুমতি ও বৈধতা ইসলাম দেয়নি। অতএব মহরম মাসে আলোকসজ্জা, আতশবাজি, হালুয়া-রুটি বিতরণ, কালো কাপড় পরিধান করে শোক মিছিল, বক্ষে-পিঠে-মাথায় ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত হওয়া- এগুলো ভালোবাসার প্রকাশ নয়। এসবের সঙ্গে আশুরার কোনো সম্পর্ক নেই বরং এসব বিদাতি কর্মকাণ্ড। এসব কাজ আশুরার ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে শুধু ম্লান নয় বরং প্রশ্নবিদ্ধ করে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। 

  • শিক্ষক ও ধর্মীয় গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা