গণপিটুনিতে হত্যা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৬:৩১ পিএম
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া একটি গুরুতর অপরাধ। কিন্তু তার পরও দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। ফলে খুনখারাবিসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়েই চলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে; যা আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলছে। এমনই একটি ঘটনা কুমিল্লার মুরাদনগরের। সেখানকার এক গ্রামে মাদক বেচাকেনার অভিযোগে এক নারী ও তার দুই ছেলেমেয়েকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ওই নারীর আরেক মেয়ে। ৩ জুলাই উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, নিহত রুবির পরিবার দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা করে আসছিল। তাদের দাবি, এই গণপিটুনি এলাকার মানুষের দীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নিহত রাসেলের স্ত্রী জানান, সালিশে বিরোধের সময় তার পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা হয়। শিশু সন্তানের হাতও ভেঙে দেওয়া হয়। ঘটনার দিন সকালে শতাধিক লোকজন ধারালো অস্ত্র ও বাঁশ নিয়ে বাড়িতে হামলা চালায় এবং স্বামী-শাশুড়ি-ননদকে হত্যা করে।
ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও শঙ্কিত হওয়ার মতো। এ ধরনের ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল। হতে পারে সেটা দীর্ঘমেয়াদি আইনব্যবস্থার প্রতি তীব্র অনীহা থেকে। কিন্তু সভ্য সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আমরা মনে করি, নিহতদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক না কেন, আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তদন্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন একই উপজেলায় একটি গ্রামে বসতঘরের দরজা ভেঙে এক নারীকে ধর্ষণ ও মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সারা দেশে আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার সপ্তাহ না পেরোতেই তিন খুনের ঘটনা ঘটল। মুরাদনগরে আবারও যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, সেটা কাম্য ছিল না। এজন্য প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন অনেকে।
৪ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘মুরাদনগরে এবার মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে হত্যা’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত ২ জুলাই বুধবার স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষকের মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের পর। ছিনতাইয়ের সঙ্গে রুবির পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে গ্রামে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে সালিশে অংশ নিলে রুবি তাদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে রুবির লোকজন ইউপি সদস্যকে মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরদিন গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে রুবির বাড়িতে হামলা চালায় এবং পরিবারের চারজনকে ঘর থেকে বের করে পিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই রুবি, রাসেল ও জোনাকি মারা যান। এ সময় গুরুতর আহত অবস্থায় রুমা আক্তারকে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
দেশে মব কিলিং বা গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটা শুধু আইনের শাসনকে ভূলুণ্ঠিত করছে না, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলাও বিনষ্ট করছে। বিশেষ করে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানা সময়ে প্রশাসনকে ব্যাপক বেগ পেতে হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে সেনাবাহিনীকেও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন মাসে অন্তত ৪১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ৪৭ জন গুরুতর আহত হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহতের মধ্যে দুজনকে ডাকাতির অভিযোগে, তিনজনকে সন্দেহজনক চুরির অভিযোগে, একজনকে খুনের অভিযোগে, দুজনকে চুরির অভিযোগে এবং আরও দুজনকে শিশু নির্যাতন ও নারী ধর্ষণের অভিযোগে হত্যা করা হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আইনের প্রতি আস্থাহীনতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মানুষ এ ধরনের জঘন্য কাজ করতে পারে। এসব হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করতে না পারার সুযোগটি কাজে লাগায় অপরাধপ্রবণ লোকেরা। এ অবস্থায় গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা বন্ধ করার জন্য সচেতনতা গড়ে তোলা উচিত।
এটা মানতে হবে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘গণপিটুনি’ একটি বড় সমস্যা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে আগাম ঘোষণা দিয়েও এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা চলে, দেশের আইনশৃঙ্ক্ষলা পরিস্থিতি কার্যত অসহায়। যে কারণে এ ধরনের অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না। মুরাদনগরের গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর ব্যর্থতারই প্রমাণ মেলে। কিন্তু আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী ব্যর্থ হলে জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিতই রয়ে যায়। তাই এ ধরনের ঘটনার সূত্রপাত হওয়া কাম্য নয়। একজন অপরাধীকে সন্দেহে আটক করা যায়, কিন্তু তাকে শাস্তি প্রদান করা কোনোভাবেই সাধারণ জনগণের কাজ নয়। বরং আটক করার পর থানায় সোপর্দ করা সুনাগরিকের কর্তব্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার তদন্ত করা, আদালতের কাজ সুষ্ঠু বিচার করা। তাই সেখানকার পরিস্থিতি যেন আরও খারাপ না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে। গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
দেশে এ ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই তিন খুনের বিষয়ে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। যারা পিটিয়ে মানুষ হত্যা করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হতে পারে ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত। আমরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে গণপিটুনির বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সরকার এবং প্রশাসনকে বলব, গণপিটুনি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন। সবার আগে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।