× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিবেশ

বাংলার প্রাণ সুন্দরবন

আফতাব চৌধুরী

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৫ ১৬:১৩ পিএম

আফতাব চৌধুরী

আফতাব চৌধুরী

গভীর গহিন অরণ্য। সুন্দরী গরান বিটপীর সমারোহ। এই নামেই সুন্দরবন। সুন্দরবন নামটি শুনলেই মানুষের মনে ভিড় করে হাজারো সহস্র, অজস্র কৌতূহল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ হলো সুন্দরবন। গঙ্গা-মেঘনার মধ্যবর্তী ভূ-ভাগই হলো সুন্দরবন। সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবন নামের সৃষ্টি বলে অনেকেই মনে করেন। সুন্দরী গাছ সাধারণত মিষ্টি জলে জন্মায়। সম্প্রতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সুন্দরবনের জলে লবণের ভাগ বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমে আসছে। সারা পৃথিবীতে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বলতে যা বোঝায় তা খুব কমই আছে। সুন্দরবনের ষাট ভাগই বাংলাদেশে আর মাত্র চল্লিশ ভাগ পশ্চিমবঙ্গে। 

সুন্দরবনের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এই জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশের জীবিকা কৃষিকর্ম। এখানকার মানুষজনকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে নিত্যদিন লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়। মানুষের সভ্যতা তো নদী আর জলের ইতিহাস ঘিরে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও মানুষকে আকর্ষণ করে। আদিম যুগে মানুষ প্রকৃতির নানান অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে গুহাকে নিরাপদ আশ্রয় করে গুহাবাসী হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সভ্যতার ছোঁয়ায় গুহাবাসী হয় গৃহবাসী। এই গৃহবাসী মানুষও কি আজ নিরাপদ? আগেই বলেছি, সুন্দরবনের অধিকাংশ মানুষই কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী। তাদের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। সুন্দরবনের ভূমি নিচু, জঙ্গলে ভরা, স্বাস্থ্যকর নয়। মধু সংগ্রহও এখানকার বড় অংশের মানুষের রুটি-রুজির প্রধান অবলম্বন। আবহাওয়ার পরিবর্তন সুন্দরবনের মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এ বছর মউলেদের মাথায় হাত। চৈত্র মাসে দক্ষিণদিকে হাওয়া বয়। এই হাওয়ায় মৌমাছিরা জড়ো হয় জঙ্গলে। বিগত কয়েক বছর থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে এক বিরাট পরিবর্তন। তাপমাত্রা হুহু করে বেড়ে চলেছে। কখনও প্রয়োজনের তুলনায় প্রবল বৃষ্টি, কখনও অনাবৃষ্টি। প্রয়োজনের তুলনায় প্রবল বৃষ্টিতে কখনও দুর্বিষহ মানুষের জনজীবন।

পরিবেশ যেন টিউমারে আক্রান্ত। অতি দ্রুত মানুষ সজাগ না-হলে ক্যানসার আক্রান্ত হতে বেশি সময় লাগবে না। বিজ্ঞান মানুষের চাহিদা বাড়িয়েছে। মানুষের হাতের মুঠোয় এখন উন্নত মানের প্রযুক্তি। এই উন্নত প্রযুক্তির অতি ব্যবহারে আজ মহাসমুদ্রে তলদেশে আবর্জনায় ভরে উঠেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা, বায়ুমণ্ডলে মানুষের দ্বারা গ্রিনহাউস গ্যাসের অতি ব্যবহার পৃথিবীকে উষ্ণায়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রিনহাউস গ্যাস কী ? যে গ্যাস ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপরশ্মিকে শোষণ করে অথচ তাপরশ্মিকে বাইরে বেরিয়ে যেতে দেয় সেই গ্যাসকে বলে গ্রিনহাউস গ্যাস। তার মধ্যে প্রধান কার্বন ডাই-অক্সাইড। এর ফলস্বরূপ পৃথিবী ভয়াবহ প্রাকৃতিক পরিবেশের মুখোমুখি দাঁড়াতে চলেছে। সে বিষয়ে ইতোমধ্যে সতর্কও করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা তাদের সমীক্ষায় জানিয়েছেন, ৩০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেদিন ৭ ডিগ্রি ছুঁয়ে যাবে সেদিন পৃথিবীর বুকে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে। সেদিন কিন্তু বিজ্ঞানের চরমসীমায় পৌঁছানো মানুষও রেহাই পাবে না প্রকৃতির সেই নিষ্ঠুরতা থেকে। 

ধ্বংস হলেও এখনও পৃথিবীতে উদ্ভিদসহ বেশকিছু বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী টিকে আছে তাদের বাঁচার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। উন্নত জীব হিসেবে মানুষেরই উচিত তাদের নিজেদের পৃথিবীতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এই পৃথিবী তো মানুষ ছাড়া উদ্ভিদসহ অন্য প্রজাতির প্রাণীদেরও বসবাসের স্থান। মানুষ তার নিজ বুদ্ধিবলে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে সবার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে বসবাস করছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন পৃথিবী দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং তার ফলে কী কী ঘটতে চলেছে। 

বাড়বে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ। টর্নেডো, আয়লা প্রভৃতির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও খামখেয়ালিপনা বাড়বে। পরিবেশ ও প্রকৃতির সংরক্ষণ নিয়ে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কাজ করে চলেছে তারাই এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, এর পরিণাম হতে চলেছে ভয়াবহ। 

 ভারতসহ হিমালয়ের বড় বড় হিমবাহগুলো প্রায় পুরোটাই গলে যাবে। প্রথমদিকে বরফ গলে বন্যা হবে, তারপর পুরোপুরি বরফগলা শেষ হলে নদীর জলও শেষ হয়ে যাবে। ফলে কৃষিকাজ বন্ধ, তীব্র জলসংকট, পৃথিবীজুড়ে জলের জন্য বাধবে যুদ্ধ, ধ্বংস হবে উদ্ভিদ ও জীবজগৎ। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিনই নিঃশেষ হচ্ছে অরণ্য। মানুষের স্বেচ্ছাচারিতার ফলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ হুহু করে বেড়ে চলেছে। গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণই সব থেকে বেশি। বিজ্ঞানে প্রমাণিত, জলীয়বাষ্প ব্যতীত পৃথিবী অচল। ব্রাজিলের রিও সম্মেলনে গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি ও বিশ্ব উষ্ণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আলোচনার বিষয় ছিল, পরিবেশজনিত সহনশীল বিশ্ব-অর্থনীতি। সেদিনের আলোচনায় সতর্ক করা হয়েছিল, বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইডের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পৃথিবীকে উষ্ণায়নের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাই হোক, মানুষ উন্নত সভ্যতার নামে যে গরল উদগিরণ করে চলেছে সেই গরলই হয়তো তার সমাধি রচনা করবেÑ অপমৃত্যু ঘটবে। 

প্রকৃতি কারও একাধিপত্যকে সহ্য করেনি কোনো দিন।এর জ্বলন্ত উদাহরণ নেপাল। পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে চিরস্থায়ী টিকে থাকার অধিকার কারও নেই। সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী হোক না কেন? প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মনুষ্যজাতিকে একদিন চিরতরে নিশ্চিহ্ন হতেই হবে। কিন্তু মানুষ উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে আরও দ্রুত নিজেকে শেষ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এক কথায় বলা যায়, একদিকে উন্নয়নের নামে বিজ্ঞানের অপব্যবহার, অন্যদিকে মৃত্যুকে ডেকে আনা। সভ্যতার নামে প্রকৃতির ওপর অবিরাম অত্যাচার করে চললে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে আবহাওয়ায় মারাত্মক পরিবর্তন আসবে। রোগের প্রভাব ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পাবে। অরণ্য ও জলের অভাবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য বলে আর কিছু থাকবে না। 

সমুদ্রে দূষণ বাড়াচ্ছে খনিজ তেলও। এই তেলের দূষণ আরও ভয়াবহ। অতিরিক্ত ভটভটি চলাচলের জন্য জলে মিশছে পোড়া তেল, মবিলÑ এর কারণে জল দূষিত হচ্ছে। জল থেকে আকাশ সর্বত্রই পৃথিবী আজ দূষণের শিকার। তবুও সুন্দরবনই বাঁচাতে পারে পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে। 

সুন্দরবনের বাদাবনই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানুষ ও জীবজগৎকে রক্ষা করতে এক প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক সময় সাইক্লোন, টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে জীবজগৎকে বাঁচাতে রুখে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন চরিত্রের অরণ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে যে, প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য বাদাবনের বিশেষ ক্ষমতা আছে। 

বিজ্ঞানীরা আশার বাণী শোনাচ্ছেন, আগামীদিনে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যে সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়বে, বাড়বে ঝড়-সাইক্লোন-সুনামি ও আয়লার মতো ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যার মোকাবিলা করতে পারবে একমাত্র সুন্দরবনের এই বাদাবনই। তাই একে রক্ষা করা খুবই জরুরি। 

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা নিরলস গবেষণায় জানাচ্ছেন, ব-দ্বীপ হিসাবে সুন্দরবনের পরিকাঠামো বা গঠন সেটা যেমন এখনও শেষ হয়ে যায়নি, তাই হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠছে চর। হিমালয়ের মিষ্টি জলের সঙ্গে নিত্যনতুন পলিমাটি এসে জমেছে। ফলে জলস্তর বেড়ে গিয়ে কোথাও যেমন বাদাবন নষ্ট হচ্ছে, অনুরূপভাবে নতুন বাদাবনের জন্মও হচ্ছে।

  • সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার স্বর্ণপদক প্রাপ্ত 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা