চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৫ ১৬:১৯ পিএম
ফিরে এলো সেই রক্তাক্ত জুলাই। ২০২৪ সালের এই মাসে সরকারি চাকরির কোটা বাতিলের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের বিক্ষোভ-আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানীসহ সারা দেশ। গত বছরের এ মাসেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠুর-নির্দয়ভাবে পাখির মতো মানুষকে গুলি করে গণহত্যা চালায়। রংপুরের তরুণ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের পথ ধরে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, মজুরসহ শত শত মানুষ বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দাঁড়ানোর সাহস দেখান। এ সময়টায় ছাদের ওপর, ঘরের জানালায়, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে নারী-শিশুদের হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গণহত্যার পর পুড়িয়ে ফেলা হয় অনেক মৃতদেহ। শত শত মানুষের আত্মত্যাগে সফল হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান। জনজোয়ারে ভেসে যায় ক্ষমতার দম্ভ। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনে ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। পরিসমাপ্তি ঘটে টানা ১৫ বছরের স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনের। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শেষ হয় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এখন পর্যন্ত সরকারি গেজেট অনুযায়ী এই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ৮৩৪ জনকে হত্যা, হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করা হয়। যাদের আত্মত্যাগে সৃষ্টি হয় নতুন এক বাংলাদেশ।
১ জুলাই প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ফিরে এলো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সেই উত্তাল জুলাই’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। ওই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা সংস্কারের দাবিতে বড় বিক্ষোভ হয়। কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি করা হয়। ৪ অক্টোবর কোটা বাতিল বিষয়ক পরিপত্র জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ২০২১ সালে সেই পরিপত্র চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।
২০২৪ সালের ৫ জুন ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সরকারি প্রজ্ঞাপনকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন। এতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; যা মেধাবীদের প্রতি বৈষম্য। প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ২ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন। ৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৬ জুলাই রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ শহীদ হন। দেশের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৮ জুলাই আন্দোলনকারীরা সারা দেশে কমপ্লিট শাটডাউনের ডাক দেন। সেই দিন সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়, কারফিউ জারি করা হয় এবং আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার চলতে থাকে। ২৬ জুলাই আন্দোলনের তিনজন সমন্বয়ককে সাদা পোশাকধারী পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। ২৮ জুলাই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশের ঢল নামে। ৩১ জুলাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একযোগে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
১ আগস্ট গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণমিছিল কর্মসূচি পালিত হয়। ৩ আগস্ট ব্যাপক বিক্ষোভের পর শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনের অন্য নেতারা শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। ৪ আগস্টও পুলিশ প্রতিবাদী ক্ষুব্ধ জনতার ওপর আক্রমণ চালায়। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন অবরোধের জন্য ছাত্র সমন্বয়করা ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির আহ্বান জানান। ৫ আগস্ট সোমবার সকালেও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ চলে। সেদিনও গুলিতে বহু শিক্ষার্থী নিহত হন। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া লাখো মানুষের সমাবেশ দুপুর আড়াইটার দিকে যাত্রা করে গণভবনের দিকে। এরপর জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা বলেন সেনাপ্রধান। ৬ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তাব মেনে নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংসদ বিলুপ্ত করা হয়। ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ ১৪ জন উপদেষ্টাকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। এই টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনে তৎকালীন সরকার সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর যে নৃশংসতা চালায়, তা সত্যিই নির্মম ও বর্বর।
এ কথা স্বীকার করতে হবে, জুলাই আমাদের অনেক শিখিয়েছে। সাধারণ মানুষের ঐক্য পারে না এমন কিছুই নেই, এটাই জুলাইয়ের প্রথম শিক্ষা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার প্রেরণাও আমরা পাই জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে। ২০২৪ সালের জুলাই আর ২০২৫ সালের জুলাই সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভীতসন্ত্রস্ত একটি পরিবেশ থেকে আমরা মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে ফিরতে পেরেছি। গত জুলাইয়ে যে ধরনের অন্যায়-অবিচার ছিল, যে পরিমাণ মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, সেসব এখন কার্যত নেই। গণমাধ্যমসহ সবকিছুতে এখন অনেকটা মুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে এ কথা সত্য যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে ধরনের অরাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা নানা কারণে কিছুটা যেন বিচ্যুত হয়েছে। অথচ দেশ গড়ার জন্য সেই ঐক্যটা জরুরি ছিল। এখন জুলাইয়ে যারা অভ্যুত্থান করেছেন তাদের মধ্যে ঐক্যে ফাটল, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিধা বিভক্তি। এই বোঝাপড়াটা না থাকার কারণে জুলাই সনদ কিংবা জুলাই ঘোষণাপত্র আটকে আছে। এটি খুব দুঃখজনক। এই জুলাই সনদের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের তৈরির প্রেক্ষাপট নিহিত। আমরা মনে করি, দেশের গণতান্ত্রিক পথপরিক্রমার জন্য সেই ঐক্য ধরে রেখে ‘জুলাই সনদ’ খুবই জরুরি। অন্যথায় আগামীর রাজনীতিতে ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারের আবির্ভাব ঘটার পথ তৈরি হবে। তবে আশার কথা, এ সংস্কারের প্রশ্নে ঐকমত্যের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ঐকতানে সুর মিলছে। ফ্যাসিবাদ রুখতে আমরা এই ঐক্য ধরে রাখতে চাই। আমরা আশা করি, সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে প্রতিশ্রুত সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং গণহত্যায় অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াও এগিয়ে যাবে সমান তালে।
আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রুহের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করছি। জুলাই যোদ্ধাদের যারা দেশ গড়ায় কাজ করছেন, তাদের শ্রদ্ধা ও সালাম জানাই। রাষ্ট্র যেন শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশে থাকে, তাদের ঋণ যেন স্বীকার করে। আগামীর নতুন বাংলাদেশ গড়তে জুলাই চেতনা যেন আমাদের ঐক্যবদ্ধ রাখেÑ এটাই প্রত্যাশা।