চালের বাজার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৫ ১৭:২৩ পিএম
চালের দাম বেড়েই চলছে। ভরা মৌসুমে এই নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যটির দাম বেড়ে যাওয়া, জনমনে নতুন করে অস্বস্তি ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ চালের মৌসুমে দাম স্থিতিশীল থাকার কথা। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে সিন্ডিকেটকে। জানা গেছে, সরকারি গুদামে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বাজারেও দৃশ্যমান কোনো সংকট নেই। তবুও এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি ভোক্তারা। কারসাজি করে আগেই চক্রটি কম দামে কৃষকের ধান কিনে মজুদ করেছে। এখন কৌশলে সংকট দেখিয়ে মিল পর্যায়ে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে চালের বাজারে ক্রেতাসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে। সেই সঙ্গে দর বেড়েছে প্রায় সব নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যেরও। এ বছর বোরো মৌসুমে সারা দেশের কৃষক তার কাঙ্ক্ষিত ফলন পেয়েছেন, আগের মৌসুমের চিত্রও ছিল একই। তারপরও চালের বাজার অস্থির হওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে।
৩০ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘করপোরেটের দখলে চালের বাজার’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে ৫০ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। দেশের ধান ও চালের বড় মোকাম নওগাঁর মহাদেবপুরে আবারও বেড়েছে পণ্যটির দাম। প্রকারভেদে পাইকারি বাজারে বেড়েছে প্রতি কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা। খুচরায় তা দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৮ টাকা। উপজেলার সবচেয়ে বড় চালের মোকাম আখেরার মোড়ে চালবাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রকারভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ২-৪ টাকা বেড়ে জিরাশাইল ৬৮-৭০ টাকা, শুভলতা ৬০-৬২ টাকা, কাটারি ৭০-৭২, ব্রি আর-২৮ চাল ৬২-৬৪ টাকা এবং স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ৫৫-৫৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও পাইকারিতে জিরাশাইল ৬৪-৬৬ টাকা, কাটারি ৬৬-৬৮, শুভলতা ৫৭-৫৮, ব্রি আর-২৮ চাল ৫৯-৬০ এবং স্বর্ণা-৫ চাল ৫৩-৫৪ টাকা করে কেজি বিক্রি হয়েছিল। এ ব্যাপারে ভোক্তারা বলেন, ভরা মৌসুমে যদি এভাবে চালের দাম বৃদ্ধি দেখিয়ে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ খুঁজছে সিন্ডিকেট চক্র। পরিবহন সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্য, সরবরাহ কমÑ নানামুখী অজুহাত দেখিয়ে মজুদদাররা বাড়াচ্ছে চালের দাম।
অভিযোগ রয়েছে, করপোরেট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে প্রয়োজনমতো ধান পাচ্ছেন না স্থানীয় ছোট ও মাঝারি মিলাররা। ফলে বাজারের চাহিদামতো চাল সরবরাহ করতে পারছেন না তারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহের ঘাটতির কথা। তারা আরও বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার বিঘাপ্রতি ৪ থেকে ৬ মণ পর্যন্ত ধানের উৎপাদন কমে গেছে। ফলে বাজারে কিছুটা সরবরাহ কম এবং বড় বড় মিলাররা প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মজুদ করার উদ্দেশ্যে ধান কিনছেন। যে কারণে স্থানীয় ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের মিলাররা ধান কিনতে পারছেন না। ফলে চাল উৎপাদন করতে পারছেন না। যার কারণে উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক কারণে এবার ধান উৎপাদনে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও চালের দাম এতটা বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। নতুন ধানের প্রভাব নেই চালের বাজারে। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ তাদের।
দেশের খাদ্য ভান্ডার বলা হয় উত্তরাঞ্চলকে। বিশেষ করে ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এখানকার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাল সরবরাহ করা হয়। এখানে চালের সংকট না থাকলেও বাড়ছে চালের দাম। সেখানকার চিত্র যদি এমন হয় তাহলে সারা দেশের পরিস্থিতি হবে অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর সিন্ডিকেট ভেঙে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম কমার জনমনে যে প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল তা কার্যত হতাশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অবশ্য বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য পরিকল্পিতভাবে একটি মহল কারসাজি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে। এর আগেও ভরা মৌসুমে মিলারদের কারসাজিতে চালের বাজার বারবার অস্থির হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা যেন স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
প্রতিবছরই ধান ও চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু প্রত্যেকবারই সেই লক্ষ্য ব্যাহত হয় নানা কারণ দেখিয়ে। অথচ সরকার মৌসুমের শুরুতে কৃষকের কাছ থেকে বেশি বেশি ধান ও চাল কিনলে মজুদদাররা সুবিধা করতে পারতেন না। ফলে কৃষক ভালো দাম পেতেন। বরাবরই কৃষকের হাতে যখন ফসল থাকে মজুদদাররা কম দামে ধান কেনার ফন্দি আঁটেন। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার কৃষকের হাত থেকে পণ্যটি চলে গেলে, তারা দাম বাড়িয়ে দেন। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাফিলতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। এ কথা সত্য যে, ইতোমধ্যে মিলমালিক ও আড়তদারদের কাছে যে চাল চলে গেছে, সেটা হয়তো ফেরত আনা যাবে না। কিন্তু সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালের সরবরাহ বাড়িয়ে কিংবা বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে খোলাবাজারে চাল বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়ানো। যেকোনো উপায়ে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হবে। কারণ চালের দাম বাড়লে সব শ্রেণির মানুষের সমস্যা হয়। সবচেয়ে দুর্ভোগ বাড়ে নিম্ন-আয়ের মানুষের। তাই চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে তদারকি জোরদার করা হোক। যেকোনো মূল্যে নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেট মুক্ত করতে হবে।