× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খাদ্য নিরাপত্তা

অদৃশ্য বিপদের জালে স্বাস্থ্য সংকট

ড. আলাউদ্দিন

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৫ ১৭:২০ পিএম

ড. আলাউদ্দিন

ড. আলাউদ্দিন

আমাদের প্রতিদিনের খাবারের প্রতিটি গ্রাসে লুকিয়ে আছে অসংখ্য প্রশ্ন। আজকের নাশতায় যে পরোটা খেলাম, তাতে কী ধরনের তেল ব্যবহার হয়েছে? দুপুরের ভাতে মিশে থাকা সবজিতে কতটুকু কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে? সন্ধ্যার চায়ের সঙ্গে যে বিস্কুট খেলাম, সেটি কি আসলেই খাওয়ার উপযুক্ত ছিল? এসব প্রশ্ন কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়Ñ এগুলো আমাদের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি আজ এক গভীর ও বিস্তৃত সংকটের রূপ নিয়েছে। যে দেশ এক দিন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গর্ব করত, সেই দেশেই আজ প্রতিটি খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শুধু পরিমাণে নয়, গুণমানে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। এই পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি।

বিষাক্ত খাদ্যশৃঙ্খলের ভয়াবহ চিত্রÑ বাংলাদেশের খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ততার শুরু হয় একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকেই। কৃষকরা ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করছেন নিষিদ্ধ কীটনাশক, যা মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে পরিবেশকে দূষিত করছে। ফসল তোলার পর সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। পরিবহনের সময় খাদ্যপণ্য দূষিত হচ্ছে নোংরা পরিবেশে। আর বাজারে পৌঁছানোর পর ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ সময় পণ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করছেন ফরমালিন, কার্বাইডসহ নানা রাসায়নিক। ফলমূলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কলা, আম, পেঁপে থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ফলেই ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম পাকানোর রাসায়নিক। ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে ফল পাকানোর এই প্রক্রিয়া মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এসব রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি রোগ এবং স্নায়বিক সমস্যা সৃষ্টি করে। মাছ-মাংসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মাছ চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন। গরু-ছাগল মোটাতাজাকরণের জন্য ব্যবহার হচ্ছে স্টেরয়েড। মুরগির খামারে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার তৈরি করছে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসাক্ষেত্রে বড় সমস্যা সৃষ্টি করবে।

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজালের মহোৎসব : বাংলাদেশে দুধের বাজারে ভেজালের পরিমাণ এতটাই ব্যাপক যে, বিশুদ্ধ দুধ খোঁজা এক দুরূহ কাজে পরিণত হয়েছে। গরুর দুধে মেশানো হচ্ছে পানি, চিনি, লবণ এবং আরও ভয়ংকর হলো ডিটারজেন্ট পাউডার। দুধকে ঘন ও সাদা দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে স্টার্চ, ইউরিয়া এমনকি চক পাউডার পর্যন্ত। পাউডার দুধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। বাজারে প্রচলিত অনেক পাউডার দুধেই রয়েছে মেলামিন নামক বিষাক্ত রাসায়নিক, যা কিডনি পাথর এবং কিডনি বিকল্য ঘটাতে পারে। শিশুদের জন্য এই বিষাক্ত পাউডার দুধ বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ এটি তাদের বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। দই, পনির, ক্রিম এবং আইসক্রিমের মতো দুগ্ধজাত পণ্যেও ভেজালের মাত্রা উদ্বেগজনক। কৃত্রিম রঙ, ক্ষতিকর স্বাদবর্ধক এবং অতিরিক্ত সংরক্ষণকারী ব্যবহার করে এসব পণ্য তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ দিয়েও তৈরি হচ্ছে এসব পণ্য।

তেল ও মসলায় ভেজালের ভয়াবহতা: রান্নার তেলে ভেজালের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে, বিশুদ্ধ তেল পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সয়াবিন তেলে মেশানো হচ্ছে পাম অয়েল, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সরিষার তেলে মেশানো হচ্ছে আরজিমনি তেল, যা ড্রপসি নামক মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। অনেক সময় রান্নার তেল তৈরি হচ্ছে পুনর্ব্যবহৃত তেল দিয়ে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। মসলার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। হলুদে মেশানো হচ্ছে ক্রোমেট, যা কিডনি ও লিভার নষ্ট করে। মরিচের গুঁড়ায় মেশানো হচ্ছে ইটের গুঁড়া এবং কৃত্রিম রঙ। ধনিয়া, জিরা, এলাচের মতো মসলায় মেশানো হচ্ছে নানা ধরনের ভেজাল। এসব ভেজাল মসলা শুধু স্বাদ নষ্ট করে না, বরং গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে।

প্রক্রিয়াজাত খাবারের লুকানো বিপদ: বাজারে প্রচলিত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বেশিরভাগই রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিস্কুট, কেক, চিপস, চকলেট এবং অন্যান্য স্ন্যাকসে ব্যবহার হচ্ছে ট্রান্স ফ্যাট, যা হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। কৃত্রিম রঙ, স্বাদবর্ধক এবং সংরক্ষণকারী ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এসব খাবার। ইনস্ট্যান্ট নুডলস, জুস, কোমলপানীয়ের মতো খাবারে রয়েছে অতিরিক্ত সোডিয়াম, চিনি এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক। দীর্ঘমেয়াদে এসব খাবার গ্রহণে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, কিডনি সমস্যা এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

রাস্তার খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি: বাংলাদেশের কোটি মানুষের প্রধান খাবার হলো রাস্তার পাশের বিভিন্ন খাবার। ফুচকা, চটপটি, সিঙাড়া, সমুচা থেকে শুরু করে নানা ধরনের খাবার পরিবেশিত হয় রাস্তার পাশে। কিন্তু এসব খাবারের স্বাস্থ্য মান অত্যন্ত নিম্ন। দূষিত পানি, নোংরা পরিবেশ, মেয়াদোত্তীর্ণ উপাদান এবং অস্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতিতে তৈরি হয় এসব খাবার। ফুচকার পানিতে মেশানো হয় কৃত্রিম রঙ ও স্বাদবর্ধক। চটপটিতে ব্যবহার হয় সন্দেহজনক মানের তেল ও মসলা। জিলাপি, রসগোল্লার মতো মিষ্টিতে ব্যবহার হয় কৃত্রিম চিনি ও রঙ। এসব খাবার নিয়মিত গ্রহণে পেটের পীড়া, ডায়রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।

শিশুদের ওপর বিশেষ প্রভাব: খাদ্যে ভেজালের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তারা পাচ্ছে না। বরং ভেজাল খাবারের কারণে তাদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো শিশুখাদ্যে ভেজালের বিষয়টি। বাজারে প্রচলিত অনেক শিশুখাদ্যেই রয়েছে ক্ষতিকর উপাদান। কৃত্রিম রঙ, স্বাদবর্ধক এবং অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য খাবার। এসব খাবার শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সমাধানের পথ- একটি সমন্বিত উদ্যোগ : বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা সংকট সমাধানে প্রয়োজন সরকার, ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং সুশীল সমাজের সম্মিলিত প্রয়াস। 

সরকারি পদক্ষেপ : সরকারকে খাদ্য নিরাপত্তা আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা, ভেজাল বিক্রেতাদের কঠোর শাস্তি এবং খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত সব পর্যায়ে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি

ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কীভাবে ভেজাল খাবার চিনবেন, কোথায় অভিযোগ করবেন এবং নিরাপদ খাবার কিনবেনÑ এসব বিষয়ে ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্য পরীক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য খাদ্য পরীক্ষার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। উৎপাদনকারীদের দায়বদ্ধতা খাদ্য উৎপাদনকারী ও বিপণনকারীদের নৈতিক দায়বদ্ধতা বোধ জাগ্রত করতে হবে। মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান এবং ভেজাল খাদ্য উৎপাদনে নিরুৎসাহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

আগামীর প্রত্যাশা : খাদ্য নিরাপত্তা কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার সঙ্গে জড়িত। একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও সচেতন জাতি গঠনের জন্য নিরাপদ খাদ্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসের স্বপ্ন বাস্তবায়নে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ভেজাল, রাসায়নিক মিশ্রণ ও অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। একজন সচেতন ভোক্তা হিসেবে আমাদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া, উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সরকারের প্রতি কার্যকর খাদ্য নিরাপত্তা নীতিমালার দাবি জানানো অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও বাধ্য করতে হবে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আজকের সচেতনতা ও পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কেমন খাদ্য পাবে। নিরাপদ খাদ্যের অধিকার আমাদের মৌলিক অধিকার, আর এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্বও আমাদের সবার।

  • অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা