× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিবেশ

রাজধানী ঢাকা কতটা নাগরিকমুখী

রহমান মৃধা

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৫ ১৭:০৮ পিএম

রহমান মৃধা

রহমান মৃধা

ঢাকা শহরকে কি আমরা আজ শুধুই একটি রাজধানী হিসেবে দেখি? নাকি এটি হয়ে উঠেছে এমন এক প্রতীকী স্থান। যেখানে দেশের সব ব্যর্থতা, কৃত্রিম উন্নয়ন আর রাজনৈতিক প্রহসনের প্রতিচ্ছবি জমা হয়েছে? প্রশ্নটা বড়, কিন্তু উত্তরটা হয়তো আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে- ধোঁয়ায়, ধ্বংসে, দুর্ভোগে।

রাজনীতির রাজধানী- এই অভিধাটি ঢাকার গায়ে বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে যায়। সংসদ ভবন থেকে সচিবালয়, মন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় অফিস, সবই এই শহরে। এখানে প্রতিদিন লাখো মানুষ মিছিল করে, ব্যানার ধরে, স্লোগানে মুখর করে তোলে রাজপথ। শহরের প্রতিটি মোড়, প্রতিটি পার্ক, প্রতিটি দেয়াল যেন রাজনীতির পোস্টার-আবৃত নাট্যমঞ্চ। কিন্তু এই রাজনীতি কতটা নাগরিকমুখী? কতটা দায়িত্বশীল? এর নেপথ্যে যারা আছেন, তাদের কতজনের মূল উদ্দেশ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো আর কতজন শুধুই ক্ষমতার পালাবদলের খেলোয়াড়?

আজ ঢাকা যেন হাজার হাজার পেশাদার বেকার রাজনীতিবিদের ভাড়াটে সেনাদলে পরিণত হয়েছে; যারা প্রতিদিনই কোনো না কোনো ইস্যুতে অবরোধ করে, মিছিল করে, গলা ফাটায়। কিন্তু কজন তাদের সেই শক্তি নিয়ে মানুষের জন্য কিছু করে? এত মানুষ যদি প্রতিদিন একটি করে গাছ লাগাত, একটি খাল পরিষ্কার করত, একটি রাস্তা সংস্কারে শ্রম দিতÑ ঢাকা কি সত্যিই নর্দমায় পরিণত হতো?

এই প্রশ্ন যখন মনে আসে, তখনই চোখে পড়ে বুড়িগঙ্গা নদীর অবস্থা। এমন এক নদীর তীরে শহর গড়ে উঠেছিল, যার সৌন্দর্য ছিল অপূর্ব, যার প্রবাহ ছিল জীবনের প্রতীক। আজ সেই বুড়িগঙ্গা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেÑ দখল, দূষণ, বর্জ্যে পূর্ণ। অথচ কেউ কি কখনও এই নদীটির জন্য একটি মিছিল করেছে? একটি স্লোগান দিয়েছে? হয়তো দেয়নি, কারণ নদী নিয়ে রাজনীতি হয় না, নদী বাঁচিয়ে পদের নিশ্চয়তা মেলে না।

কেউ কি জোর গলায় বলে, এই দেশ দুর্নীতিবাজদের না, এই দেশ ভাড়াটে রাজনৈতিক কর্মীদের পৈতৃক সম্পত্তি না! এই দাবি কেন আমরা করি না? কোথায় সেই জনতার চিৎকার, যে বলবেÑ এই দেশ বিক্রি করে খাওয়া যাবে না, রাজনীতির নামে মানুষ ঠকানো যাবে না?

ঢাকা শহর ডেঙ্গুর শহর হয়ে উঠেছে। প্রতিবার বর্ষা এলেই আতঙ্ক নামেÑ শিশু মারা যায়, বৃদ্ধ কাঁপে, হাসপাতাল কানায় কানায় পূর্ণ হয়। অথচ কেউ সেই যন্ত্রণার বিরুদ্ধে স্লোগান তোলে না। কেউ টুঁশব্দ করে না মশার বিষের নামে কোটি টাকার লুটপাটে, কিন্তু কে মেয়র হতে পারল না, তা নিয়ে নগর ঘেরাও হয়। এই যদি হয় আমাদের রাজনৈতিক চেতনা, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই বলিÑ লজ্জা শুধু আমাদের ছেড়ে যায়নি, আমরা একে আগেই কবর দিয়েছি।

আমরা উন্নয়নের নামে গড়েছি শুধু কংক্রিটের ফাঁদ। শহরের ফুটপাত নেই, গাছ নেই, খাল নেইÑ শুধু রাস্তায় রাস্তায় যানজট আর দেয়ালে দেয়ালে ব্যানার। অথচ ঢাকা ঘিরে আছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানÑ রাজউক, ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন। নাম শুনে মনে হয়, যেন এই শহরের জন্য শত শত হাতে গড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাস্তবে? এসব প্রতিষ্ঠান যেন সমন্বয়ের নামে প্রতিযোগিতায় লিপ্তÑ কে কত দ্রুত দায় এড়িয়ে যেতে পারে।

একসময় ঢাকায় আসা মানে ছিল গর্বÑ ভর্তি পরীক্ষা, চাকরি, আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে আসা। এখন ঢাকায় আসা মানে এক দীর্ঘশ্বাস। অথচ গ্রামে তো সুযোগ নেইÑ চিকিৎসা নেই, শিক্ষা নেই, চাকরি নেই। ফলে বাধ্য হয়ে ঢাকায় ছুটে আসে সবাইÑ অর্ধশিক্ষিত, শিক্ষিত, নিরক্ষর। শহর ঠাসা হয়ে পড়ে, নাগরিকরা নিঃশেষ হয়ে যায়।

আমরা জানি, এই পথ বিপজ্জনক। আমরা জানি, শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ এই নগরটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। কিন্তু তবু আমরা উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলাই না। আমাদের উন্নয়ন মানে এসি রুম, বহুতল ভবন, গ্লাসের ঝলক। আমরা ভুলে যাই, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন,  কেবল অবকাঠামো নয়।

ঢাকা আজ শুধু একটি শহর নয়, এটি  রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান ; যেখানে রয়েছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, রাজনৈতিক বিবেক, পরিকল্পনার মানবতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা। এটি একটি অশ্রুপাতের নাম, একটি স্থবিরতার প্রতীক; যেখানে হাজারো মানুষের গলা ফাটে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য, কিন্তু একটি নদীকে বাঁচাতে কেউ একবার চিৎকার করে না।

তবু সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বিকেন্দ্রীকরণ হতে হবে বাস্তবে, ঢাকার বাইরে তৈরি করতে হবে জীবনযোগ্য শহর। গ্রামকে গড়তে হবে সম্মানজনক জীবনের উপযোগী করে, যেন একজন মানুষ আত্মমর্যাদায় নিজের শহরেই থাকতে পারে। রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনতে হবে জনসেবায়, কর্মসংস্থানের মুখোশ থেকে মুক্ত করতে হবে। উন্নয়নের সংজ্ঞা পুনরায় আবিষ্কার করতে হবে- যেখানে মানুষ থাকবে, প্রকৃতি থাকবে, নদী থাকবে, গাছ থাকবে এবং সবচেয়ে বেশি থাকবে বিবেক।

ঢাকার ক্লান্তি আমাদের সবার ব্যর্থতার দলিল। যদি আমরা এখনই না বদলাই, তবে এই শহর এক দিন কাউকেই ফিরিয়ে দিতে পারবে না; শুধু গিলে খাবে, নিঃশেষ করে দেবে সব আশাবাদ।

  • কলাম লেখক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা