জাতিসংঘ
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৫ ১৫:৪৮ পিএম
নিরঞ্জন রায়
নব্বইয়ের দশকে আমাদের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার বাধা পেরিয়ে ডাক পেয়েছিলাম সাক্ষাৎকারের জন্য। যেহেতু সব পরীক্ষা বেশ ভালো দিয়েছিলাম, তাই প্রত্যাশা ছিল স্বপ্নের বিসিএস চাকরিটা হয়তো পেয়ে যাব। পিএসসিতে (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) একটা প্রথা বা নিয়ম ছিল যে যতজন সদস্য থাকেন তাদের প্রত্যেকের নেতৃত্বে গঠিত হয় একেকটি সাক্ষাৎকার পরিষদ (ইন্টারভিউ বোর্ড)। আমাদের অগ্রজ যারা অতীতে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং যারা সফল হয়ে সরকারি কর্মকর্তা পদে চাকরি পেয়েছেন, তাদের কাছ থেকে এমনটাই জেনেছিলাম। কিন্তু আমরা মৌখিক পরীক্ষার দিন পিএসসিতে যেয়ে দেখলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। প্রত্যেক সদস্যের নেতৃত্বে সাক্ষাৎকার বোর্ড না রেখে পিএসসির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি বিশাল সাক্ষাৎকার বোর্ড করা হয়েছে, যেখানে পিএসসির সকল সদস্যসহ প্রায় দশ-বারোজন উপস্থিত ছিলেন।
সেই বিশাল সাক্ষাৎকার বোর্ডে প্রবেশ করেই এমন এক বিরূপ পরিবেশ আঁচ করতে পারলাম তাতে মনে হচ্ছিল যে আমি এখানে এসে অপরাধ করে ফেলেছি। অবশ্য বাংলাদেশে সব চাকরির মৌখিক পরীক্ষাই এ রকম, সেখানে গেলে মনে হবে যে যারা সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছেন তারা জমিদার বা লর্ড, আর যারা সাক্ষাৎকার দিতে এসেছেন, তারা স্লেভ বা দাস। যা-হোক সাক্ষাৎকার শুরু হলো এবং সম্মুখীন হলাম আরেক বিচিত্র অভিজ্ঞতার। আমি যেহেতু ফিন্যান্স নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তাই বোর্ডের চেয়ারম্যান কিছু সংখ্যা দিয়ে আমাকে বলতে বললেন যে সুদে-আসলে কত হবে। আমি যতই একটি সূত্র ব্যবহার করে তিন-মাস বা ছয়-মাস অন্তর সুদ প্রদান করলে সুদ-আসল কত হবে, তা হিসাব করে দেখানোর চেষ্টা করছিলাম, ততই তিনি বিরক্ত হয়ে আমার কাছ থেকে শুধুমাত্র সুদ-আসলের পরিমাণটি জানতে চাচ্ছিলেন। পরে বুঝলাম যে তিনি একটি উত্তর জেনে এসেছেন, যার সঙ্গে আমার উত্তর মিলিয়ে সঠিক না ভুল, তা নিশ্চিত হতে চাইছেন। একজন সদস্য আমার কাছে ব্যাংক রেট সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি একাধিক লেখকের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে ব্যাংক রেটের সংজ্ঞা দিয়েও সেই সদস্যকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি। তিনি তার জানা একটিমাত্র সংজ্ঞা খুঁজছিলেন, যা সেই মুহূর্তে আমার জানা ছিল না, ফলে বলতেও পারিনি।
পিএসসির আরেক সদস্য আমার কাছে জানতে চাইলেন, জাতিসংঘের কার্যাবলি অর্থাৎ কাজ কী। আমি বই পড়ে যতটুকু শিখেছি তা বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনি কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। বলতে দ্বিধা নেই যে আমি সেই বিসিএস মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি। যেহেতু দ্বিতীয়বার আর বিসিএস পরীক্ষার চেষ্টা করিনি, তাই জীবনে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সুযোগ হয়নি। তখন খারাপ লাগলেও পরে বুঝেছি বিসিএস চাকরি না হয়ে বেশ ভালোই হয়েছে। আর আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে তো নিশ্চিত করেই বলতে পারি সে সময় বিসিএস চাকরি না হওয়া ছিল আমার জন্য বড় আশীর্বাদ। যা-হোক সেটি একটি ভিন্ন আলোচনা। তবে সেদিন বই পড়ে জাতিসংঘের কার্যাবলি জানার চেষ্টা করলেও আমি সত্যিকার অর্থেই জানতাম না যে জাতিসংঘের কাজ কী। আমি জানি না যে আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া পিএসসির সেই কমিশনার মহোদয় এখনও বেঁচে আছেন কি না। থাকলে তার কাছে জানতে চাইতাম যে আসলে জাতিসংঘের কাজটা কী? কেননা আমি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে বিএসএস পরীক্ষা দেওয়ার সময়ও যেমন জানতে পারিনি জাতিসংঘের কাজ কী এবং আজও জানি না জাতিসংঘের আসল কাজ কী?
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রায় আশি বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনোরকম ভূমিকা রাখতে পেরেছেÑ এমন দাবি করার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিপুঞ্জ বা লিগ অব নেশনস। সেই প্রতিষ্ঠানও বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনোরকম ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর ১৯২০ সালে গঠিত হয়েছিল জাতিপুঞ্জ। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বে শান্তি রক্ষা এবং যুদ্ধ এড়াতে এই সংস্থা ভূমিকা রাখবে। জাতিপুঞ্জ গঠিত হওয়ার পর ২৬ বছর কার্যকর থাকলেও সে রকম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রখতে পারেনি। অবশ্য সে সময় ভূমিকা রখার সুযোগও সেভাবে ছিল না। কেননা তখন বিশ্বে অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির উত্থানের বিষয় নিয়ে সমগ্র বিশ্ব এক ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়।
১৯৩০ সাল আমেরিকাসহ ধনতান্ত্রিক বিশ্বে যে মহামন্দা (গ্রেট ডিপ্রেশন) দেখা দিয়েছিল, সেটা সামাল দিতে পশ্চিমা বিশ্বকে যথেষ্ট হিমশিম খেতে হয়। এ রকম অবস্থায় জাতিপুঞ্জ নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ সেভাবে পায়নি। মহামন্দার প্রভাব কেটে যাওয়ার পর যখন সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ এসেছিল, তখনও জাতিপুঞ্জ একটি চরম ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের মতো নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছে মাত্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে এই জাতিপুঞ্জ সৃষ্টি হয়েছিল, যাতে এই সংস্থা বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বে আর যেন কোনো প্রকার ভয়াবহ যুদ্ধ দেখা না দেয়, তা নিশ্চিত করাই ছিল জাতিপুঞ্জের উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই জাতিপুঞ্জই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে জাতিপুঞ্জের সমাপ্তি টেনে অধিকতর ক্ষমতা দিয়ে গঠিত হয় জাতিসংঘ (ইউনাইটেড নেশনস)।
বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যায় নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও এই সংস্থা বিশ্বে যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর আশি বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়নি ঠিকই। কিন্তু যুদ্ধ তো থেমে নেই। ছোট ছোট দেশের সঙ্গে যেমন অনেক যুদ্ধ হয়েছে, তেমনি বৃহৎ রাষ্ট্রের সঙ্গেও যুদ্ধ থেমে নেই। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, কোরিয়া যুদ্ধ, ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে। এ রকম ছোট ছোট দেশের মধ্যকার যুদ্ধ ছাড়াও বৃহৎ দেশ, বিশেষ করে জাতিসংঘে ভেটো পাওয়ার আছে এমন দেশও যুদ্ধ লিপ্ত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে চীনের যুদ্ধ, রাশিয়ার আফগানিস্তান আক্রমণ, আমেরিকার ইরাক আক্রমণ এবং ইংল্যান্ডের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন এবং রাশিয়া কোনো না কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে এবং এই চারটি দেশেরই আছে ভেটো পাওয়ার। এসব যুদ্ধ থেকে সংশ্লিষ্ট দেশকে বিরত রাখতে বা যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কোনোরকম ভূমিকা রাখতে পারেনি। যুদ্ধ বেধেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ আর জাতিসংঘ- যাদের যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকা রখার কথা ছিল, তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
জাতিসংঘের নির্লিপ্ততার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে সাম্প্রতিক কয়েকটি যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে একটি সুন্দর দেশ, ইউক্রেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের নামে ইসরায়েল সমগ্র গাজা ধ্বংস করে দিচ্ছে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এক ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পর্যায় চলে গিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে। এ যুদ্ধের মাঝে আমেরিকা আকস্মিক ইরান আক্রমণ করে বসলে তার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান যখন মধ্যপ্রাচ্যের ইউএস সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করে, তখন তো পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। সমগ্র বিশ্ব এক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল। সৌভাগ্যক্রমে সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ায় উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে এবং বিশ্ব কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছে। এই রকম ভয়াবহ অবস্থাতেও জাতিসংঘ কোনোরকম ভূমিকা রাখতে পারেনি।
যুদ্ধ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। সেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা রোধেও জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। আসলে বিশ্বে শান্তি বজায় রাখতে যা কিছু করা প্রয়োজন তার কিছুই জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত করতে পারেনি। অবশ্য জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা থাকায় অনেক ভাগ্যবানের এখানে চাকরি করে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের অনেকেই জাতিসংঘে চাকরির সুযোগ পেয়ে নিজেদের গর্বিত করে তুলতে পেরেছেন। তাদের অনেকেই বেশ গর্বের সঙ্গে বলেন যে তারা জাতিসংঘে চাকরি করেছেন। বিষয়টা কিছুটা আমার লেখার শুরুর উপমার মতোই, অর্থাৎ বিসিএস চাকরির মতো। আমাদের সমাজে কিছু মানুষের কাছে বিসিএস চাকরি যেমন বেশ গর্বের, তেমনি বিশ্বের কিছু মানুষের কাছে জাতিসংঘের চাকরিও অহংকার করার মতোই।
জাতিসংঘ বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে না পারলেও কিছু উন্নয়নশীল দেশের ওপর খবরদারি করতে যথেষ্ট পারদর্শী। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, আবার কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা ছাড়া এই সংস্থা মানুষের কল্যাণে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার মতো কিছু করেছেÑ এমন দাবি করা যাবে না। অথচ কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাজেট নিয়ে এই সংস্থা পরিচালিত হচ্ছে বছরের পর বছর। সদস্য দেশগুলোকে গুনতে হচ্ছে চাঁদার টাকা। ধনী দেশগুলোর জন্য সমস্যা না হলেও, গরিব দেশগুলোর জন্য এই প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক চাঁদা অবশ্যই একটি সমস্যা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যে জাতিসংঘ বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে কোনোরকম ভূমিকা রাখতে পারে না, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে পারে না, সেই প্রতিষ্ঠানের আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি নাÑ সেটাই এখন ভাবার বিষয়।