বিশ্লেষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৫ ১৫:৫৮ পিএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৫ ১৬:০৪ পিএম
মহিউদ্দিন খান মোহন
‘মগের মুল্লুক’ একটি বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদ। এ জোড়া শব্দের দ্বারা কোনো অঞ্চলের বিশৃঙ্খল বা অরাজক পরিস্থিতিকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এর আক্ষরিক অর্থ অবশ্য মগদের দেশ। তবে এ প্রবাদের উৎপত্তির পেছনে রয়েছে বঙ্গীয় অঞ্চলে মগ জাতির (বর্তমানে উপজাতি) অত্যাচার, অনাচার ও লুণ্ঠনের ইতিহাস। সেজন্যই এখনও কোথাও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পেশিশক্তির ব্যবহারে যা খুশি করতে চাইলে মানুষ বলে ‘মগের মুল্লুক’।
মগদের আদি নিবাস আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে। যেটাকে পূর্বে বলা হতো আরাকান। এদের পেশা ছিল দস্যুতা। মোগল শাসকদের সঙ্গে শত্রুতার কারণে এরা পর্তুগিজ জলদস্যুদের সঙ্গে যোগ দিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ তৎকালীন বঙ্গদেশ বা বাংলায় অবাধ লুণ্ঠন, অপহরণ, নারী নির্যাতন এবং উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নর-নারী-শিশুদের ধরে নিয়ে পর্তুগিজদের কাছে বিক্রি করে দিত। মগদের বর্বরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, ‘মগ জলদস্যুরা জলপথে বাংলাদেশের ভুলুয়া, সন্দ্বীপ, সংগ্রামগড়, বিক্রমপুর, সোনারগাঁ, বাকলা, যশোর, ভূষণা ও হুগলী লুণ্ঠন করত। তারা হিন্দু-মুসলিম নারী-পুরুষ ও বড়-ছোট নির্বিশেষে ধরে নিয়ে যেত। হাতের তালু ফুঁড়ে বেত চালিয়ে গরু ছাগলের মতো বেঁধে নৌকার পাটাতনে ঠাঁই দিত। মুরগিকে যেভাবে দানা ছিটিয়ে দেওয়া হয় তাদেরও তেমনি চাউল ছুড়ে দেওয়া হতো। এ অবহেলা ও পীড়নের পরেও যারা বেঁচে থাকত, তাদেরকে ভাগ করে নিত মগে-পর্তুগিজে।’
ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরাকান-রাজের সেনাবাহিনীর মধ্যে অনেক মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যু ছিল। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে নবাব শায়েস্তা খাঁ সেনাপতি হোসেন বেগের সহযোগিতায় আরাকানরাজকে সম্পূর্ণ পরাজিত করে মোগলদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি ওমেদ খাঁ ও হুসেন বেগ সম্মিলিত অভিযানে চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ দখল করেন। মোগল আমলে মগের রাজ্য ধ্বংস হলেও মগরা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয় না। ঢাকায় ‘মগবাজার’ নামে যে এলাকাটি আছে, তার পেছনেও জড়িয়ে রয়েছে মগদের ইতিহাস। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে মগরা সুবে বাংলার কেন্দ্রস্থল ঢাকা শহরে আক্রমণ করে। বাংলায় তৎকালীন মোগল সুবেদার ইব্রাহীম খান ফতেহজং মগদের পরাজিত করে তাদের প্রায় চার হাজার যুদ্ধ নৌযান দখল করে নেন। এরপর বাংলার সুবেদার দ্বিতীয় ইসলাম খাঁ (১৬৩৫-১৬৩৯) চট্টগ্রামে নিযুক্ত আরাকান রাজার ভ্রাতুষ্পুত্র ও গভর্নর মুকুট রায়কে পরাজিত করে চট্টগ্রাম জয় করেন।
পরাজিত মুকুট রায় ও তার অনুসারীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে ইসলাম খাঁ তাদেরকে ঢাকা শহরের যে এলাকায় বসবাসের অনুমতি দেন, সেটাই মগবাজার নামে পরিচিত লাভ করে। অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে আরাকান থেকে অনেক মগ ব্রিটিশ-বাংলায় আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের একজন ছিলেন মগ সর্দার কিং ব্রিং। কিং ব্রিং ও তার সঙ্গী প্রায় পঞ্চাশজন মগকে ব্রিটিশ সরকার ঢাকার যে স্থানে বসবাসের অনুমতি দেয়, সে জায়গাটিই পরবর্তী সমেয়ে মগবাজার নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
আমার এ রচনার উদ্দেশ্য মগদের ইতিহাস বর্ণনা বা মগবাজার নামের উৎপত্তি নিয়ে কাসুন্দি ঘাঁটা নয়। অনেকেই এ ইতিহাস জানেন। ধান ভানতে যেমন শিবের গীত গাওয়া হয়ে থাকে, তেমনি মূল প্রতিপাদ্যে যাওয়ার আগে একটু গৌড়চন্দ্রিকার অবতারণা। অনেকটা পালাগানের বয়াতিদের মূল গান গাওয়ার আগে গুরু বন্দনার মতো। আসলে কথা বলতে চাচ্ছি মগের মুল্লুক নিয়ে। এখন মগরা আমাদের দেশে বিলুপ্তপ্রায় এক উপজাতি। তাদের আগের সেই ডাকাতি-হার্মাদির জোর যেমন নেই, দাপটও নেই। এখন আর মগদের ভয়ে এই বাংলায় কেউ তটস্থ থাকে না। মগ বা পর্তুগিজ জলদস্যুরা আর লুণ্ঠন করতেও আসে না। তাদের সে ভয়ংকর দস্যুতার ইতি ঘটলেও ‘মগের মুল্লুক’ প্রবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
তবে মগের মুল্লুক বিলুপ্ত হলেও নতুন যে উপদ্রব সাম্প্রতিক সময়ে আবির্ভূত হয়েছে তাকে দেশবাসী আখ্যায়িত করছে ‘মবের মুল্লুক’ হিসেবে। বিশেষত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পতিত ফ্যাসিস্ট কিংবা তাদের সহযোগীদের ‘নগদ শাস্তি’ একশ্রেণির মানুষ আইনকে অবলীলায় হাতে তুলে নিচ্ছে। এদের কাছে রাষ্ট্রীয় আইন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালত হচ্ছে উপেক্ষিত। ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে এরা যে কাউকে আদালতের বাইরেই শাস্তি দিয়ে ফেলছে। কেবল বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব দেশেই ‘অপরাধীকে শাস্তি দেবে আদালত’Ñ এই নীতিটি মেনে চলা হয়। আমাদের দেশেও সরকার সর্বদা আইন হাতে তুলে না নিতে জনসাধারণেকে নসিহত করে থাকে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর সরকারের সে নসিহতকে একটি গোষ্ঠী ধর্তব্যের মধ্যে আনছে বলে মনে হয় না। যে কারণে বেশ কয়েকটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো ‘মব জাস্টিস’। ইংরেজি ‘মব’ শব্দের অর্থ ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতা’। আর জাস্টিস শব্দের অর্থ বিচার বা ন্যায়বিচার। ‘মব জাস্টিস’ বলতে বোঝানো হয় আইন আদালতের বাইরে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন কাউকে শাস্তি দেওয়া। তবে আমার মতে, ওইসব ঘটনাকে মব জাস্টিস না বলে ‘মব ইনজাস্টিস’ (সম্মিলিত অবিচার) বা ‘মব ভায়োলেন্স’ (সম্মিলিত সন্ত্রাস) বলাই যুক্তিযুক্ত। কেননা একটি বেআইনি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জাস্টিস বা বিচার শব্দটির প্রয়োগ সংগত নয়।
বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এই মব ভায়োলেন্সের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। তখন যাকে-তাকে রাজাকার বা পাকিস্তানিদের দালাল অ্যাখ্যা দিয়ে পথেঘাটে হেনস্থা করা হতো, কখনও কখনও পিটিয়ে মেরেও ফেলা হতো। মব ভায়োলেন্স তখন এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, এর বিরুদ্ধে শক্ত হাতে কলম ধরেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন। গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা যখন দিন দিন বাড়ছিল তখন তিনি দৈনিক বাংলায় লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কলাম ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। তার সে লেখা তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সে সময়। সরকারও সতর্ক হয়েছিল, মব ভায়োলেন্সও কমে এসেছিল। তারপরও মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির অবসান হয়নি আমাদের দেশে। কোথাও কোনো চোর বা ছিনতাইকারী ধরা পড়লে উপস্থিত জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর স্বহস্তে বিচার করার জন্য। অথচ একজন মানুষ, সে যদি খুনিও হয়, তারও অধিকার রয়েছে আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশে মব ভায়োলেন্সের যে প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তার সর্বশেষ শিকার সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা। গত ২২ জুন একটি মামলায় পুলিশ তাকে রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করার আগে একদল উচ্ছৃঙ্খল লোক তার বাসায় চড়াও হয়ে তাকে হেনস্থা করে। এর আগে গত ২২ জুন দুপুরে আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনসমূহে অনিয়মের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবুল ইসলাম, কেএম নুরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়ালকে আসামি করে রাজধানীর শেরে বাংলানগর থানায় বিএনপির পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। এরপরই উত্তরায় নুরুল হুদার বাসায় হামলা করে একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি। তারা সাদা টি-শার্ট ও লুঙ্গি পরিহিত নুরুল হুদার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়, কেউ কেউ তার গালে পাদুকা দিয়ে আঘাতও করে। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করে তারা। পুলিশ নুরুল হুদাকে গ্রেপ্তার করলেও নিরাপত্তার কারণে তাকে থানায় না নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়।
এদিকে নুরুল হুদাকে শারীরিক লাঞ্ছনার ভিডিওচিত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই নুরুল হুদার লাঞ্ছনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এটাকে তার প্রাপ্য বলে মন্তব্য করে। কিন্তু সচেতন ব্যক্তিরা বলেছেন, নুরুল হুদার অপরাধ বিবেচনায় তাকে শাস্তি দেবেন আদালত, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়। এ নিয়ে সর্বত্র নিন্দার ঝড় উঠলে টনক নড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের। সন্ধ্যায় সরকার এক বিবৃাতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার আদালত করবে, তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা বেআইনি এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি ও ফৌজদারি অপরাধ। সরকার বলেছে, মব সৃষ্টি করে উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টিকারী সবাইকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও একই কথা বলেছেন।
দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নেমেছিল এ দেশের মানুষ। লক্ষ্য ছিল স্বৈরশাসন হটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণের নিরাপত্তা তথা আইনের শাসন অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী যুগের অবসান হলেও মব সৃষ্টি করে সরকারের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে দাবি আদায়সহ নানা অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে চলেছে। অথচ অজ্ঞাত কারণে সরকার এই মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে পারছে না। সবকিছু দেখেশুনে অনেকেই মন্তব্য করছেন, বাংলাদেশ কি তাহলে মবের মুল্লুকে পরিণত হলো?