× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অতি কাছের মানুষ

হরিপদ দত্ত

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৫ ১৬:০২ পিএম

হরিপদ দত্ত

হরিপদ দত্ত

সর্বজন শ্রদ্ধেয় বরেণ্য বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে আমার উপলব্ধি শিল্পের সঙ্গেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বোঝাপড়া। আমার মনে হয় বাংলাদেশের মার্কসীয় রাজনৈতিক সাহিত্যের সঙ্গে পাঠকের গভীর সম্পর্ক গড়ে না ওঠা কিংবা ক্রমাগত দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার পেছনে অন্য বহু কারণের সঙ্গে শিল্প না হয়ে ওঠা গদ্যও অনেকটা দায়ী। পার্টি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তত্ত্বীয় সাহিত্যগুলোর পাতা উল্টালে তা সহজেই অনুমান করা চলে। সেসব নিরস গদ্য তরুণকর্মীর হৃদয়ে পাঠাভ্যাসের প্রেরণা জোগায় না। আর একটি বিষয় পাঠকমাত্রই কৌতূহল প্রকাশ করবেন। সেটি হচ্ছে শাসক-শোষক শ্রেণির প্রতিনিধিদের শিল্পচর্চা। বাংলাদেশের বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা সুখপাঠ্য উল্লেখ করার মতো কোনো বই-পুস্তক অতীতেও লিখতে পারেননি, বর্তমানেও নয়। বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদী বিশ্বের দিকে তাকালে অবাক হতে হয় যে; সেসব দেশ মেধাবী, রুচিশীল, সংস্কৃতিবান, পরিশ্রমী বুদ্ধিজীবী জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে যারা স্বশ্রেণির স্বার্থে উচ্চাঙ্গের রাজনৈতিক পুস্তক লিখেছেন এবং লিখছেন। শাসনের উচ্চাসনে বসেও এ কাজটি তারা অনেকেই পরিশ্রমের সঙ্গে করেছেন। অন্যদিকে আমাদের মেধাশূন্য, অর্ধশিক্ষিত, অসংস্কৃত শাসক-শোষক শ্রেণি শিল্প চর্চার এই শূন্যতা পূর্ণ করছে পেশিশক্তির চর্চার দ্বারা। এরই মধ্যে নানা কলাকৌশলে ছাপানো যে দু’চারটে পুস্তক বাজারে দেখা যায় সেসবের গদ্য কেবল অবশিষ্টই নয়, রীতিমতো অবিশ্বাস্য মূর্খতায় পূর্ণ। ক্লান্ত রাজনীতিবিদ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের কেউ কেউ ইংরেজি-বাংলায় পুস্তক রচনা করছেন। এসবের ভাষা অত্যন্ত দুর্বল। এই প্রত্যাশাটা আমরা করতে পারি বাম রাজনীতিবিদদের কাছে। জনগণের মুক্তির ভাষাটি তাদের জানার কথা। কিন্তু সেখানেও তেমন একটা আশার আলো দেখা যায় না। তারা যতটা করেন রাজনীতির চর্চা, ঠিক ততটা করেন না রাজনৈতিক সাহিত্যের চর্চা। ফলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সাহিত্য চর্চার বিষয়টি ঐতিহ্য হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বলা যায়, এ বিষয়ে তারা অমনোযোগী। 

শিল্প চর্চার এই বিষয়টিতেই অন্য অনেকের সঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পার্থক্য। তিনি প্রতিনিয়ত যে চর্চা করেন তার প্রমাণ তার ক্রমবিকাশমান গদ্যশৈলী। কেবল কবিতা বা গল্পের ক্ষেত্রেই নয়, প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও অভিধানের মৃত শব্দের শিলাস্তূপ থেকে শব্দ বাছাই করে নিয়ে একজন সৃষ্টিশীল প্রবন্ধকারকেও গদ্যদেহে প্রাণ সঞ্চার করতে হয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চলমান রাজনীতির বহুমুখী সত্যকে নিছক জ্ঞানের বিষয় না করে ভাবের সঙ্গে বিষয় মিশিয়ে রস সৃষ্টিতে সক্ষম। তার প্রবন্ধের গদ্যশৈলী কবিতার মতো অলংকারবহুল। চিন্তার সঙ্গে যুক্তি এবং সূক্ষ্ম অনুভবের সঙ্গে যুক্ত করে কৌতুক। ‘দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা’ প্রবন্ধে পাকিস্তান প্রস্তাবের বিষয়টি লেখক এভাবে বর্ণনা করছেন, ‘হক সাহেবের প্রস্তাবটি তার নিজের ছিল না। ধারণা নয়, ভাষাও নয়, সবই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। মঞ্চে ওঠার আগে প্রস্তাবটি হক সাহেব দেখেনওনি, তিনি তৈরি প্রস্তাব পড়ে দিয়েছিলেন শুধু। বলা তাই সম্ভব যে তিনি এটি উপস্থাপন করেননি, তাকে দিয়ে উত্থাপন করিয়ে দেয়া হয়েছে, কণ্ঠ তার স্বর অন্যের।’ (নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ : পৃ. ৪৪) এই গদ্য পাঠক চিত্তে যেমনি কৌতূহল সৃষ্টি করে তেমনি তৈরি করে কৌতুক। অন্যদিকে ‘কণ্ঠ এবং স্বর‘ শব্দ দুটি গভীর ব্যঞ্জনা কবিতার মতো হয়ে ওঠে। লেখক গদ্যের শরীরের চিত্রকল্পের আবহ নির্মাণ করে কাব্যের কৌতুক রস পরিবেশনের ভিতর দিয়ে তীব্র শ্লেষ সৃষ্টিতেও দক্ষ। যেমনÑ ‘মুসলমান সমাজে মাকড়সার জাল বোনা অনেকটাই চলল; শাস্ত্র নিয়ে তর্ক হলো। পুঁথি সাহিত্যের চর্চা হলো। কিন্তু বুর্জোয়া বিকাশের উদার আলো তেমন দেখা গেল না।’ (বেকনের মৌমাছিরা : নির্বাচিত প্রবন্ধ : পৃ. ১৬২)।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যখন দূর বা নিকট অতীতের ইতিহাসের কথা লেখেন তখন তিনি নিছক তথ্যসন্ধানী ঐতিহাসিক ব্যক্তি হয়ে ওঠেন না। নিরাসক্তভাবে সমাজের চালচিত্রও রূপায়ণ করেন না। নিষ্পাপ দর্শকের মতো কেবল চোখ ভরে দেখেই যান না। ক্ষুধাতুরের মতো শুধু ইতিহাসের আস্বাদ গ্রহণ করেন না। তিনি ঘটনা বা তার কার্যকারণের ওপর আলোকসম্পাৎ করে পাঠককে নিজের বোধের অংশীদার করে নেন। যেমনÑ ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের কথা তিনি এভাবে বাণীবন্ধন করেন, ‘আমি উৎপাটিত নই, আমি বেড়ে উঠব বৃক্ষের মতো, শেকড় প্রোথিত থাকবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভূমিতে, আকাঙ্ক্ষা ছিল এটাও।’ (বায়ান্নর আন্দোলন : নিঃরাজনৈতিক পৃ. ৪১)। গদ্যের এই বাণীভঙ্গিটি আবেগাত্মক অথচ প্রত্যয় দৃঢ় বাণীর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। পাঠকের স্বপ্ন ও উত্তেজনা সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে যায় এই কারণে যে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিত্বও মিশে একাকার হয়ে গেছে। রচনার সঙ্গে লেখক ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধনের বিষয়টি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতিটি প্রবন্ধে ছড়িয়ে আছে। ‘লেনিন কেন জরুরী’ প্রবন্ধে তাকে পাওয়া যায় কী অসীম বিশ্বাসে দৃঢ়। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় লেখক চিত্তে ক্ষোভ-দুঃখ সৃষ্টি হয় কিন্তু আপন বিশ্বাসকে, ব্যক্তিত্বকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেন না তিনি। তিনি লিখলেন, ‘যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে ততদিন তিনি থাকবেন। মূর্তি ভাঙলেও তিনি অমর হয়ে রইবেন।...পৃথিবী যদি শোষণশূন্য হয় কখনও, লেনিন তখনও থাকবেন। তখন থাকবেন ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে।’ (নির্বাচিত প্রবন্ধ : পৃ. ২৭৬)। বাক্যটিতে বা অনুচ্ছেদটিতে কোথাও আবেগের উচ্ছ্বাস নেই, নাটকীয় বাণীবিন্যাসও নেই, রোমান্টিক অলীক স্বপ্নও নেই। আছে বিশ্ববাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে দূরদর্শী মানুষের চূড়ান্ত ব্যক্তিত্বের হিসেব। এই ব্যক্তিত্বই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার শিল্প মানসে। তাই তার গদ্য হয়ে ওঠে জনগণের শিল্প সম্পত্তি। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যের মধ্যে যে শব্দ ব্যঞ্জনা, সেখানে তার শিল্পের বহুমাত্রিকতা ধরা পড়ে। ‘বামদের পারা না-পারা’ প্রবন্ধে তিনি এভাবেই সাজান তার বাক্যকে অসাধারণ শব্দ ব্যঞ্জনায়, ‘উপমহাদেশের বিজ্ঞান তেমন এগোতে পারেনি। যন্ত্র এসেছে বিজ্ঞান ততটা আসেনি। তার কারণ গভীরভাবে প্রোথিত ভাববাদ।’ (বায়ান্নর আন্দোলন : নিঃরাজনৈতিক পৃ. ৯৯)। বাক্যস্থিত ‘যন্ত্র’ এবং ‘বিজ্ঞান’ শব্দ দুটির বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা পাঠককে গভীর তাৎপর্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ‘যন্ত্র’ আর্থিক উন্নয়ন ঘটায় আর ‘বিজ্ঞান’ ঘটায় আত্মার উন্নতি। ছোট একটি বাক্য এবং ক্ষুদ্র দুটি শব্দ মিলে লেখক যেভাবে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেন তা কেবল তার শিল্প মেধারই পরিচয় নয়, গভীর জীবন ও সমাজ প্রজ্ঞারও পরিচয়। লেখকের শিল্পের মাধ্যম এই নিজস্ব গদ্য স্টাইলটি ছড়িয়ে আছে তার অপরাপর রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধে। ‘বাঙালিকে কে বাঁচাবে’, ‘দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্যমিথ্যা’, ‘জাতীয়তাবাদের স্বভার চরিত্র’, ‘বাইরে বুর্জোয়া ভেতরে সামন্ত’, ‘সাতচল্লিশের স্বাধীনতা’ ইত্যাদি অসংখ্য প্রবন্ধের শিল্প-পোশাক এই গদ্যশৈলী। 

প্রবন্ধের শিরোনাম নির্বাচনেও লেখককে পাই আমরা অলংকার শাস্ত্রের ঋদ্ধ শিল্পী হিসেবে। ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন, সাম্যের ভয়’, ‘নোরা, তুমি যাবে কোথায়’ বা ‘বেকনের মৌমাছির’। প্রবন্ধের এ ধরনের কাব্যিক নামকরণ অবশ্যই বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের নতুন মাত্রা। 

রচনার স্টাইল রচয়িতার মানস ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। সেই ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। সেই ব্যক্তিত্বের কারণেই তিনি তার গদ্যের নির্মাণক্ষেত্রে কারিগরি বিদ্যাটি অর্জন করেছেন। তাই তিনি রাষ্ট্র আর সমাজকে নিজস্ব যে কৌশলে পর্যবেক্ষণ করেন, পাঠককেও দেখবার আর বুঝবার সেই ভঙ্গিটি শিখিয়ে দেন। বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধকারদের মতো তিনি অর্জিত পাণ্ডিত্য, মেধা, জ্ঞান নিয়ে জনগণের শ্রদ্ধা আর ভক্তির পাত্র সেজে আত্মজ্ঞানের প্রচারক হয়ে নিজেকে অসামান্য করে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারেন না। অন্যদিকে ভাবনিষ্ঠ প্রবন্ধকারদের মতো লঘুকল্পনা আর হাস্যরসের রসিকজনও সাজেন না। উভয়ের সংমিশ্রণে তিনি হয়ে ওঠেন আপন ব্যক্তিত্বের ভিতর দিয়ে সৃষ্টিশীল গদ্যের রূপকার। পাঠকের একেবারে চেনা মানুষ। আপন মানুষ। বুর্জোয়া নন, উদারবাদী বুর্জোয়া নন; সামাজিক ন্যায় ও ঔচিত্যবোধের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অতি কাছের মানুষ। 

আজ ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯০তম জন্মদিন। মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি, তাই এমন দিনে সশরীরে উপস্থিত থেকে বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবীকে শ্রদ্ধা জানাতে না পারার বেদনা বহন করছি। ভিনদেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান আমার এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়ত হবেও না আমৃত্যু। শ্রদ্ধেয় স্যারকে জন্মদিনে জানাই অফুরান শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। 

  • কথাসাহিত্যিক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা