ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ
মো. ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৫ ১৬:০০ পিএম
মো. ইলিয়াস হোসেন
ইসরাইল সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে গত ১৩ জুন ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায়। ইরানের ভূখণ্ডে অতর্কিতভাবে একটি সুপরিকল্পিত ও নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে ইতোমধ্যে ইরানের অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও। ইরান কর্তৃপক্ষ তাদের সেনাবাহিনী প্রধানসহ রেভল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং অন্তত সাতজন পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তেহরানের একাধিক সামরিক, গোয়েন্দা ও গবেষণা স্থাপনায়ও বিমান এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থিরতার মুখোমুখি।
ইরান তৎক্ষণাৎ এই হামলাকে ‘যুদ্ধ ঘোষণার সমান’ বিবেচনা করে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে ইসরায়েলের হাইফা, তেলআবিবসহ দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। যদিও ইসরায়েলের সরকারি মিডিয়া এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশে কড়াকড়ি আরোপ করায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো অজানাই রয়ে গেছে। উভয় পক্ষের এই আক্রমণাত্মক ভূমিকার জন্য যুদ্ধ এখন সরাসরি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দু’পক্ষই অনমনীয় আচরণ করছে। ইতোমধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েল সীমান্তে রকেট হামলা শুরু করেছে। সিরিয়া ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা ইসরায়েলি ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইয়েমেনের হুতিরাও রেড সি-তে ইসরায়েলি জাহাজ ও বন্দরগুলোর দিকে হামলার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পাল্টাপাল্টি বিমান হামলায় ইসরায়েল ও ইরানের সাধারণ জনগণের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা চাইছে তাদের পক্ষে আমেরিকাকে যুদ্ধের মাঠে নামাতে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেও দেশটির মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যুক্তরাজ্য বিষয়টিতে কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে চাইছে। তারা ইসরায়েলকে এখন আর বন্ধু মনে না করে বরং একটি বোঝা মনে করছে। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে তার নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করেছে এবং বি-৩২ বিমান দিয়ে ইরানের তিনটি পরমাণুকেন্দ্রে বোমা হামলা করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিষয়টি সত্যি হলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টিই প্রমাণ করে।
অপরদিকে ইরানের বন্ধুরাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া উভয় দেশই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং নেপথ্যে কূটনৈতিকভাবে ইরানকে সহায়তা করার ইঙ্গিত দিয়েছে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ইরানের প্রতি কিছুটা নৈতিক সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এমতাবস্তায় যুদ্ধ বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক করলেও ভেটোর কারণে তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এমনি একটা বিস্ফোরোন্মুখ পরিস্থিতির কারণে ইরান ও ইসরায়েল উভয় দেশের জনজীবনে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি সংঘর্ষ বাড়ে, তাহলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। ইতোমধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০১১ সালে আরব বসন্তের পর সর্বোচ্চ। ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে তেলের দাম হবে আকাশচুম্বী। বিশ্বের অর্থনীতি প্রবল ধাক্কা খাবে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল অবকাঠামোতেও চরম বিপর্যয় নামবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন আরও ভেঙে পড়বে, আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে তীব্র পতন লক্ষ করা যাবে। এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এটি শুধু ইরান-ইসরায়েল নয়, বরং তা এক বিশাল পরমাণু ছায়ায় ঢাকা আঞ্চলিক ও বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিগত অবস্থান যদি আগ্রাসী হয়, তাহলে চীন-রাশিয়ার জোটবদ্ধ প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। মুসলিম বিশ্বে উত্তেজনা ও প্রতিবাদ বাড়তে পারে, বিশেষত পাকিস্তান, তুরস্ক ও আরব বিশ্বের জনগণের মধ্যে। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবে, যার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই যুদ্ধের প্রভাব গোটা বিশ্বের ওপর পড়বে এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিকে নড়িয়ে দিতে পারে। এটি হতে পারে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা কিংবা ধ্বংসের রূপায়ণ। এ যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হবে। ইরানের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠী ইসরায়েল ও পশ্চিমা দেশগুলোয় হামলা চালাতে পারে। সাইবার হামলায় ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ সম্ভাবনা হলো পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতা। ইরান যদি পরমাণু অস্ত্রের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে সৌদি আরব, তুরস্ক বা মিসরও নিজেদের অস্ত্রায়ন শুরু করতে পারে। ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠবে এক বিপজ্জনক বারুদের স্তূপ। এ ছাড়া যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি হবে। সিরিয়া, ইরাক, লেবাননসহ নানা দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ পশ্চিমা দেশে যাবে, ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।
এ যুদ্ধে ইসরায়েল যদি জয়লাভ করে, তাহলে তা শুধুমাত্র একটি সামরিক বিজয় নয় বরং এক বৃহৎ ভূরাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিশ্বশাসন করার চেষ্টা করবে। এটি বিশ্বরাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে এবং আগামী কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা কৌশলে প্রভাব ফেলবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। নিষেধাজ্ঞা ও অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে ইরান খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসাসামগ্রী সংকটে পড়বে। জাতীয় মুদ্রার মান ভেঙে পড়বে, হাইপার ইনফ্লেশন দেখা দেবে, ফলে খামেনি রিজিমের পতন হবে এবং নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের তাবেদারি করবে। অন্যান্য ‘বিদ্রোহী’ রাষ্ট্রর ওপরও পশ্চিমা বিশ্বের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। সমগ্র মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এদিকে রাশিয়া-চীন ইরানকে হারালে তাদের ভূকৌশলগত বাধা তৈরি হবে। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে ইরানকে হারিয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হবে। হয়তো চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়াসহ অন্যান্য উদীয়মান রাষ্ট্র মিলে একটি বিপরীত মুখী জোট তৈরি হবে। তবে আশার কথা হলো, চীন যুদ্ধ ঠেকাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেবে, কারণ ইরানের তেলের ওপর তার ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে পশ্চিমা জোটকে বিভ্রান্ত করতে ইরানকে সামরিক বা গোয়েন্দা সহায়তা দেবে।
অপরদিকে এই যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হলে, তা হবে শুধু একটি সামরিক জয় নয়, বরং পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী বিপ্লব। এতে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে, সরকার পতনের আশঙ্কা তৈরি হবে। সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে; সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠন ও প্রতিরোধে বিশাল ব্যয় হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণভাবে জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতার আশঙ্কা বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের পরাজয় মার্কিন নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রমাণ করবে, ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান নতুন করে পর্যালোচনা করতে বাধ্য হবে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি বাড়বে এবং ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ প্রশ্নে নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হবে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের কৌশলগত মেরূকরণ তৈরি হবে। এই যুদ্ধে ইরান জয়লাভ করলে বিশ্বরাজনীতির শক্তির কেন্দ্র একদিকে হেলে যেতে পারে এবং বর্তমান পশ্চিমাধিপত্য বিশ্বব্যবস্থায় এক নতুন মেরূকরণের সূচনা হতে পারে।
বর্তমানে বিশ্ব এক চরম ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই যুদ্ধ শুধু দুটি দেশের সীমায় আবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে; না হলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। আবার এমনটিও বলা যায়, শেষ পর্যন্ত বিশ্ব একাধিক শক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। কেউ এককভাবে দাপট দেখালেও প্রকৃত ক্ষমতার ভারসাম্য বহু দিক থেকে আসতে পারে। বর্তমানে চলমান এই ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ সেই ভারসাম্যের পরীক্ষাক্ষেত্র হয়েও উঠতে পারে।