× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিশু-কিশোর

মানবিক হয়ে উঠতে প্রয়োজন সংবেদনশীল সমাজ

শেলী সেনগুপ্তা

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৫ ১৬:৪০ পিএম

শেলী সেনগুপ্তা

শেলী সেনগুপ্তা

বয়ঃসন্ধিক্ষণ থেকেই শুরু হয় কৈশোরকাল। যেটা ধরা হয় ১৩ বছর বয়স থেকে। আর কৈশোরকাল পেরিয়ে শিশুর প্রাপ্তবয়সে পদার্পণ ঘটে ১৯ বছর বয়সে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ল্যান্সেট চাইল্ড অ্যাডলসেন্ট হেলথের একটি প্রকাশিত প্রবন্ধে বলা হয়েছে, এখন কৈশোর শুরু হয় ১০ বছর বয়সে। আর তা ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হয়। 

এ সময় কিশোর-কিশোরীর শরীরের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মনোজাগতিক জটিলতা দেখা দেয়। নানা আবেগীয় পরিবর্তন ঘটে। এ সময়টাকে বলা হয় জৈবিক গঠনিক পর্যায়। এ সময় ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করে এবং প্রাপ্তবয়ষ্ক হয়ে ওঠে। এই সময়ের মধ্যে শিশুর সকল প্রকার স্বভাবগত সু এবং কু পরিবর্তনগুলো ঘটে থাকে। এটাই সঠিক সময় শিশুর যাবতীয় গুণাবলির বিকাশ ঘটানোর। 

কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা পর্যন্ত শিশুর বিকাশের মূলে থাকে পারিবারিক ভূমিকা। একটি শিশু ভূমিষ্টের সময়েই থাকে অনেক চাহিদা। প্রতিটি শিশুই চায় ভালোবাসা, যত্ন, নিরাপত্তা ও অপার আনন্দ। শিশুর সুষ্ঠু বিকাশের জন্য এই সব চাহিদা পূরণ হওয়া দরকার। শিশুর দরকার যত্ন, আদর, শারীরিক ও আবেগ সংক্রান্ত নিরাপত্তা। এজন্য শিশুর সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে হবে, তার সঙ্গে খেলতে হবে। দেখা যায়, অনেক শিশুই নিজ পরিবারে নিরাপদ বোধ করে না। কারণ অনেক সময় শিশুর বিভিন্ন চাহিদার প্রতি পরিবার অমনোযোগী থাকে। কখনও কখনও তাদের অবজ্ঞা করা হয়। আবার কখনও অতি সুরক্ষাও শিশুরা পছন্দ করে না। শিশুর কাছে অতি প্রত্যাশাও তার ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক নয়। সমাজে নিজেদের সফল পিতা ও মাতা হিসেবে প্রকাশ করার জন্য শিশুর ওপর নিজেদের ইচ্ছার ভার তুলে দেওয়া হয়, যা বহন করতে গিয়ে শিশু মানসিকভাবে পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিশু মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। 

তা ছাড়া অন্য আরেক দল শিশু পরিবারের কঠিন চাপের বাইরে গিয়ে ভালো থাকার জন্য বেছে নেয় ভুল সঙ্গ, ভুল পথ। এরা ধীরে ধীরে অপরাধের পথে হাঁটতে শুরু করে। এমনকি এরা একসময় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। কৈশোরকালীন ছেলে কিংবা মেয়ের প্রতি পরিবারের সব সদস্যের সচেতন আচরণ করা উচিত। কারণ হলো, বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের শারীরিক, মানসিক ও আচরণগত পরিবর্তন হতে পারে। শিশুরা এই সময় কখনও অনেক কথাতে কিছু মনে করে না, আবার কখনও অল্প কথাতে রেগে ওঠে। তারা অজানা বিষয়ের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, সব বিষয়েই কৌতূহলী হয়ে সেভাবেই চলতে চেষ্টা করে। এ সময় তারা সমাজে সহিংসতাকে পুরুষত্বের নিদর্শন বলে মনে করে। সোশ্যাল মিডিয়াই দেখা অস্ত্রধারী হিরোদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে। তাদের মতো হতে চায়। প্রচেষ্টা তো করেই।

জীবনের এই ক্রান্তিকালে এসে তাদের মধ্যে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যেমন তারা অন্যের ওপরে নির্ভরশীলতা পরিহার করে আত্মনির্ভরশীল হতে চায়, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, নিজের প্রতি অন্যের আগ্রহ লাভের ইচ্ছা পোষণ করে, আবার ঘন ঘন মুড সুয়িং হয়, অর্থাৎ মানসিক অবস্থা খুব দ্রুত ওঠানামা করে এবং একই সঙ্গে মানসিক পরিপক্বতা লাভ করতে শুরু করে। এর বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে নানা ধরনের অসামাজিক কাজের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় তাদের মনের মধ্যে জয় পরাজয়, বিরোধ, হত্যা ইত্যাদি শব্দ ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া করে। তাই তারা নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রবৃত্ত হয়ে ওঠে। 

বদলে যাওয়ার সময়টিতে তারা একা থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পরিবারের সদস্যদের চেয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে। কারণ তারা সেখানেই নিজের জগৎ খুঁজে পায়। রহস্যময় এই বয়সটাতে ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের চাইতে বন্ধুবান্ধবের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। অনেকেই বাবা-মায়ের বাধা মেনে নিতে পারে না। এ বিষয়গুলো বাবা-মায়ের পক্ষেও মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু বাবা মায়ের তো ধৈর্য হারালে চলবে না। সন্তানের আচরণের প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে। সেভাবেই তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। 

আমরা জানি, বিদ্যালয় হলো প্রতিটি শিশুর দ্বিতীয় গৃহ। দিনের অনেকটা সময় কাটে এখানে। এখান থেকে শিশু সংগ্রহ জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রায় সব উপাদান। তারপরও দেখতে হবে শিশু এখানে নিরাপদ কি না। যদি শিক্ষকরা খুব বেশি কঠিন হন তাও শিশুর জন্য মঙ্গলজনক নয়। শিক্ষক অতি বন্ধুসুলভ হওয়াটাও প্রত্যাশিত হয়।  এ ছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে কোনো শিশু যেন তার সহপাঠীদের দ্বারা বুলিংয়ের শিকার না হয়। বন্ধুবান্ধবের জন্য বুলিংয়ের শিকার হলে বড় হয়ে শিশু প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। এইসব শিশু প্রচণ্ড রাগী হয়। তখন তারা যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতে পারে। এ বিষয়ে ভয়ভীতিমুক্ত হয়ে যায়। 

কখনও কখনও নিজের বন্ধুমহলে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে শিশুরা অনেক অপরাধমূলক কাজ করে ফেলে। এসব ঘটনা ঘটে বাবা-মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই। আবার এ কথাও ঠিক যে শিশুকে অধিক আদর কিংবা অতিরিক্ত শাসন করলেও পরিবারে বিপদ নেমে আসতে পারে। যেহেতু এটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তরকালীন সময়, তাই এই সময়টাতে ছেলে-মেয়ে, পরিবারের অন্য সদস্যসহ সমাজের সব পক্ষের উচিত নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন দায়িত্ব পালন করা। বিশেষ করে পরিবারের সব সদস্যকে এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে।

পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা এই সময়ে ছেলেমেয়েদেরকে স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ দিতে পারেন এবং কীভাবে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হয় সে বিষয়েও সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারেন। এই সময়ে ছেলেমেয়েরা হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে থাকে। এতে অনেক সময় অনেক বাবা মা রেগে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। এমনটি না করে অভিভাবকদের কৌশলী হয়ে তাদেরকে বোঝাতে হবে। তাদের মতামতের অসম্মান হয় এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়।  তাছাড়া বয়োসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের খুব দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে দেহে প্রচুর পুষ্টি ও সুষম খাবারের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় তাদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। 

এ সময়ে সন্তানের নিয়মিত খাদ্য তালিকার ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন দায়িত্ব পালন করা জরুরি। নিয়মিত খাদ্য তালিকায় যেন প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, কার্বোহাইড্রেট, জিংকসমৃদ্ধ শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

এই সময়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে অনেক মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তারা হঠাৎ করেই খিটখিটে মেজাজের হয়ে যেতে পারে। তাদের মানসিক পরিবর্তন বুঝতে তাদেরকে সময় দিতে হবে। এ ছাড়া বন্ধুদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ভুল পথে যাচ্ছে কি না সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে নেতিবাচক কিছু দেখলে হঠাৎ কিছু করে না বসে বুঝিয়ে বলতে হবে, সঠিক ও ভুলের পার্থক্য অনুধাবন করতে শেখাতে হবে। 

একটি সন্তান যে পারিবারিক আবহে বড় হয়, তার প্রভাব পড়ে তার চরিত্রে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে প্রতিটি পরিবার। কারণ পরিবার থেকে শিশু ভালো এবং মন্দের তফাত বুঝতে পারে। পরিবার থেকেই তারা নৈতিক শিক্ষা লাভ করে থাকে। তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে, যেন নিজেদের ভুল সিদ্ধান্তকে বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তা ছাড়া সবচেয়ে বেশি এবং সবার আগে দরকার প্রাণভরা ভালোবাসা। ভালোবাসলেই সংসারে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। আর কিশোর-কিশোরীরা তো নরম মাটি, তাদের ভালোবেসে সুন্দর মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে সহায়তা করা সম্ভব। প্রত্যেক অভিভাবকের দরকার শিশু সম্পর্কে সঠিকভাবে খবর রাখা। সন্তানকে বোঝা এবং সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা। পারিবারিক বন্ধন ও একটি সংবেদনশীল, সহমর্মী সমাজই পারে শিশু-কিশোরদের প্রকৃত মানবিক হয়ে গড়ে উঠতে সহায়তা করতে।

  • কলাম লেখক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা