এনবিআর
ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৫ ১৬:৩৮ পিএম
ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
রাজস্ব ঘাটতি যেন একটা মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তা পূরণ হয় না। বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যায়। সাধারণত অর্থবছরের শেষ মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় করে থাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এবার এপ্রিলের শেষ দিকে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুরু হওয়া আন্দোলনে কার্যত ঢিলেঢালা ছিল রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম। আন্দোলন শেষ হতে না হতেই শুরু হয় ঈদের টানা ১০ দিনের ছুটি। এতে বন্ধ ছিল রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম। সব মিলিয়ে প্রায় এক মাসের এই ঢিলেঢালা কার্যক্রমে রেকর্ড ঘাটতির মুখে পড়ছে এনবিআর। এছাড়া জুলাই আন্দোলন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় কমেছে রাজস্ব আহরণ।
এদিকে ঋণ অনুমোদনের আগেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর শর্ত দেওয়া হয়। এ শর্ত মেনেই ঋণ নেয় সরকার। চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাধ্য হয়েই এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করতে হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। তারা আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে এবারের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে বলেছে।
আইএমএফ বলেছে, রাজস্ব খাত সংস্কারের মাধ্যমে এনবিআরকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপির অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩ করতে হবে। এ শর্ত পূরণ করতে গেলে বর্তমানে আমাদের যে রাজস্ব আয় আছে, তার চেয়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করতে হবে। অথচ এরই মধ্যে এনবিআরের ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগামী অর্থবছর অর্থাৎ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে কর-জিডিপির অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে রাজস্ব থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতিরিক্ত আয় করতে হবে ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সর্বশেষ বছর অর্থাৎ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে বলেছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এ অর্থবছরে এনবিআরকে বর্তমান আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত আরও ৯৬ হাজার কোটি টাকা আয় করতে হবে। সব মিলিয়ে তিন অর্থবছর শেষে ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে এনবিআরকে।
সরকার এরই মধ্যে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে লক্ষ্যমাত্রা কাটছাঁট করেছে। তবুও বছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা কাটছাঁটের পরও রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করছেন খোদ এনবিআর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, অর্থবছরের শুরু থেকে রাজস্ব আহরণে ছিল বিরূপ পরিস্থিতি। তবুও কিছুটা স্বস্তি এলেও অর্থবছরের শেষ দুই মাসে রাজস্ব আহরণে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টানা আন্দোলন ও টানা বন্ধে রাজস্ব আহরণে রেকর্ড ঘাটতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। দেশের কর জিডিপি রেশিও বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। রাজস্ব ঘাটতি বেড়েই চলেছে। বছর শেষে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হবে। তাই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর ফাঁকির ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে জোর দিতে হবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বা মে মাস পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল লক্ষ্যমাত্রার হিসাবে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকার ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা হিসাব করলেও রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি জুনে আদায় করা অসম্ভব।
দেশের ইতিহাসে চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়বে এনবিআর। কারণ হিসেবে এই অর্থবছরের শুরু থেকে আন্দোলন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে নতুন করে যোগ হয়েছে এনবিআর পৃথকীকরণে চলা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন। এতে কার্যক্রম ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। এ ছাড়া ঈদের টানা বন্ধেরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। এসব কারণে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়বে এনবিআর। এ ছাড়া অলিখিতভাবে রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটনে অডিট ও প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রাজস্ব আহরণের গতিও কিছুটা কমেছে।
চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে খাতওয়ারি হিসাব করলে মে মাস পর্যন্ত কাস্টমস খাতে অর্থাৎ শুল্ক আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। আর ভ্যাট আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা এবং আয়কর আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া একক মাস হিসেবে শুধু মে মাসে তিন খাত মিলিয়ে মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩২ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। তার মধ্যে কাস্টমস খাতে ৯ হাজার ৪৬১ কোটি, ভ্যাট খাতে ১৩ হাজার ৩৭৪ কোটি ও আয়কর খাতে ৯ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে এনবিআর। একক মাস হিসেবে এর আগের মাস শুধু এপ্রিলে রাজস্ব আহরণ হয়েছিল ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। ওই মাসে আহরণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৫৮০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গড়ে প্রতি মাসে এনবিআরের তিনটি খাত মিলে রাজস্ব আদায় করে ৩০ থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এনবিআরকে আদায় করতে হবে তার প্রায় ৫ গুণ। আর এই ধরনের সক্ষমতা এনবিআরের নেই। এ ছাড়া বেসরকারি গবেষণা সংস্থাও চলতি অর্থবছরে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এনবিআর পৃথকীকরণের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের পর থেকে মূলত অনানুষ্ঠানিক আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরবর্তীতে ১২ মে গভীর রাতে এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ জারির পর আনুষ্ঠানিক আন্দোলনে নামে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অবস্থান ধর্মঘট থেকে শুরু করে আংশিক কলম বিরতিতে এবং কর্মবিরতিতে যান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতির ঘোষণার পর গত ২৫ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর পরেই অর্থাৎ গত ৫ জুন থেকে টানা ছুটি চলে। এই বন্ধের সময়ে প্রায় পুরোপুরি বন্ধই ছিল রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম। এই বন্ধ ও ঢিলেঢালা রাজস্ব কার্যক্রমের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক রাজস্ব আহরণে। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরের আরও মাত্র পনেরো দিন বাকি আছে। এই সময়ে বিশাল এই রাজস্ব আহরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে জানান এনবিআর সংশ্লিষ্টরা।
চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের যে পরিস্থিতি তাতে বিশাল এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব। এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও এক কথায় অসম্ভব। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনবিআরে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছিলেন। আশা করা হয়েছিল যে, নতুন চেয়ারম্যান রাজস্ব আদায়ে দক্ষতার পরিচয় দেবেন। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না বলেই মনে হয়। আসলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে যে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, সেটার যথেষ্ট ঘাটতির রয়েছে। বড় কথা হলো এনবিআরের দুর্নীতিই বন্ধ করতে পারছে না, যার ফলে রাজস্ব খাতে ঘাটতি বাড়ছেই। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হচ্ছে রাজস্ব খাতে।