× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতিতে অধিকারের সাম্য ও পরমতসহিষ্ণুতা জরুরি

ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০২:৩৭ এএম

রাজনীতিতে অধিকারের সাম্য ও পরমতসহিষ্ণুতা জরুরি

বিএনপির আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশ নিয়ে যখন স্থান বিতর্ক চলছে, তখনই ঘটে গেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ৭ ডিসেম্বর ঢাকার নয়াপল্টনে পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষে একজনের প্রাণহানি ও আরও কিছু মানুষ আহত ও গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা জনমনে অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি সম্প্রতি সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পাচ্ছে-এটি সরকারের তরফে গণতান্ত্রিক আচরণের পরিচয় বলেই মনে করি। কিন্তু একই সঙ্গে দুর্ভাবনারও কিছু বিষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশের পর ঢাকায় গণসমাবেশের আগেই বিএনপির সভাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নানা নেতিবাচক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। লক্ষ্য করা গেছে, এর আগে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে বিএনপির জনসমাবেশের আগে হঠাৎ করে পরিবহন বন্ধ করে দেওয়াসহ আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। অনেকেরই মনে আছে, চলতি বছর ২২ আগস্ট দুপুরে খুলনা মহানগরীতে বিএনপির গণসমাবেশ শুরুর পরপরই বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। সেবার বলেছিলাম, এ ধরনের ঘটনা বিএনপিকে জনসমাবেশ করতে সরকারের অনুমতি দানের বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সম্প্রতি ঢাকায় ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনাটি থেকে একই আশঙ্কা পুনর্বার ব্যক্ত করছি। 


আমরা জানি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের অধিকার রয়েছে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করার। মিছিল-মিটিং-জনসমাবেশও এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কিন্তু ঢাকায় বিএনপির জনসমাবেশের আগেই যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেল, তাতে প্রশ্ন দাঁড়ায়-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংজ্ঞার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এমন কর্মকাণ্ড কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথটাই অমসৃণ করে তুলবে না? রাজনীতি হলো মানুষের অধিকার, কল্যাণ কিংবা মঙ্গল নিশ্চিত করার মাধ্যম। রাজনীতিবিহীন যেকোনো সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো। স্বাধীনতার পূর্বাপর দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রক্তদানতো বটেই, আত্মত্যাগের নজিরতো ইতিহাসের বড় অধ্যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এরপরও রাজনৈতিক অঙ্গনে অধিকারের মাঠ সমতল করা এখনও সম্ভব হয়নি। 

আমরা জানি, দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বিএনপি এবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। শুধু বিএনপি কেন, আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলোও এই লক্ষ্যে কর্মসূচি শুরু করেছে। নির্বাচনের আগে এমনটি প্রত্যাশিতই। কিন্তু এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, তা মোটেও স্বাভাবিক নয়। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের প্রতি যদি রাজনীতিকরা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় হচ্ছে একে অপরের প্রতি গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ দেখানো এবং পরমতসহিষ্ণুতা। উল্লেখ্য, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে সভাসমাবেশ করার তথা রাজনীতির মাঠে নামার সুযোগ পায়নি। কিন্তু এখন সুযোগ পেয়েও তাদের অধিকারের পথ মসৃণ হয়ে ওঠেনি। আমরা দেখেছি, বিগত দিনের কর্মকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুটি রাজনৈতিক দলের আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব ও তিক্ততা এতই পুষ্ট হয়েছে, যা কবে স্বাভাবিক হবে এটি বড় প্রশ্ন বটে। 

আওয়ামী লীগ দেশের অত্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক দল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আগেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতার পূর্বাপর দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এই দলটির ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান দখল করে আছে। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবার জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে স্বার্থান্বেষীরা যে পথে নিয়েছিল, এর মাশুল দেশের মানুষকে নানাভাবে গুনতে হয়েছে। গণতন্ত্রতো বটেই, মানুষের অধিকার সম্পর্কিত আরও অনেক কিছুরই ক্রমান্বয়ে যবনিকাপাত ঘটতে থাকে। সেই ধারা থেকে দীর্ঘদিন পর রাজনীতি সুপথের সন্ধান পেলেও তা ফের নানারকম প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। টানা কয়েক মেয়াদে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দেশের রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে বিদ্যমান অনেক অন্ধকার অধ্যায়ের অপসারণ করলেও গণতন্ত্র এখনও কাক্সিক্ষত মাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এর জন্য কমবেশি দায় প্রগতিশীল প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরই রয়েছে। 

রাজনীতিতে যদি শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠিত না হয়, একই সঙ্গে সবার জন্য মাঠ সমতল না হয় এবং রাজনীতির নামে দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে যেসব রাজনৈতিক দলের ভূমিকা রয়েছে তাদের রাজনীতির পথ রুদ্ধ না হয়, তাহলে সুস্থ রাজনীতির বিকাশ দুরূহ। অনেকেরই মনে থাকার কথা, ময়মনসিংহ এবং খুলনায় অনুষ্ঠিত বিএনপির জনসমাবেশকে কেন্দ্র করে হঠাৎ গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি কোন অদৃশ্য ইশারায় হয়েছে-এ প্রশ্নটি সঙ্গত কারণেই সামনে এসেছিল। অস্বীকার করা যাবে না, বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি হয়েছে অনেক। ইতিবাচক অনেক কিছুই দৃশ্যমান হলেও কারও কারও অদূরদর্শী কিংবা সুনীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরকারের অনেক অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আমি মনে করি, সরকারের অর্জনের এই বিসর্জনে যেটুকু ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেওয়ার সময় তাদের রয়েছে। বিএনপি কিংবা তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারের পথ সুগম করে দিলে সরকারের জন্য তা লাভেরই হবে বলে মনে করি।

সরকার ভিন্নমতের প্রতি যতটা শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং ভিন্নমত প্রকাশে উদার হবে, তাতে তাদের রাজনৈতিক খতিয়ানে অনেক কিছু যুক্ত হবে এবং তাদের জন্য সুফলই বয়ে আনবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দমনপীড়নের কোনো অবকাশ নেই। অধিকার ও সুযোগের সাম্য এবং রাজনীতিকদের মানসিকভাবে গণতান্ত্রিক হওয়া এবং থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ সবই শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও বিকাশকেই নিশ্চিত করে না, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও আলোকিত করে। তাই প্রয়োজন হচ্ছে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য সংগঠিত হবে, আর্থিক সুবিধার জন্য নয়। নিজেদের একটি আদর্শগত অবস্থান থাকবে। তারাতো বটেই, রাজনীতিকদেরও এই প্রত্যয় থাকতে হবে। দেশটা সবার এবং আমরা নানাদিকে আলোকিত দেখতে চাই। আমরা আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্রটিকে এইভাবে গঠন করতে চাই। ওই রাজনীতি যখন থাকবে, তখন বর্তমানে যে পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা অদৃশ্য হবে বলেই বিশ্বাস করি। 

বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগই শুধু নয়, প্রত্যেকটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলকে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হবে। ক্ষমতার জন্যই শুধু সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া নয়, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য এক কাতারে দাঁড়ানো। নির্বাচনের বাইরে তাদের সঙ্গে জনগণের অবশ্যই গভীর সংযোগ থাকতে হবে। গণতন্ত্র বলতে নানা মত আছে বটে, কিন্তু গণতন্ত্র যে একটি পরিপূর্ণ অধিকারের ক্ষেত্রে সাম্যের সংস্কৃতি তা অস্বীকারের পথ নেই। গণতন্ত্র পরিচিত শাসনব্যবস্থার মধ্যে সর্বোত্তম, এ নিয়েও মতবিরোধ খুব একটা নেই।

গণতন্ত্র কেবল ব্যক্তিকেই মর্যাদা দেয় না, ব্যক্তির অধিকার, তার স্বার্থ এসব বিবেচনা করে একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে এবং এর সুফল সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গঠনমূলক মতবিরোধ থাকবে এবং এই মতবিরোধ সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়কও বটে। কিন্তু মতবিরোধকেন্দ্রিক সহিংসতা কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উপসর্গ যাতে সৃষ্টি না হয়, এর দায় সর্বাগ্রে সরকারের। বিরোধী দলেরও এক্ষেত্রে ভূমিকা কম নয়। যদি জনগণের হাতে ক্ষমতা থাকে, তাহলে শাসকদের জবাবদিহির পথ রুদ্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। গণতন্ত্রের অনুষঙ্গগুলো সংশ্লিষ্টরা কোনোভাবেই যেন ভুলে না যান। ময়মনসিংহ কিংবা খুলনায় যে নেতিবাচক পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল, ভবিষ্যতে যাতে এরকমটি না ঘটে সেই নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে। সরকার সবার-এ কথাটি তাদের বিস্মৃত হওয়া চলবে না। আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অধিকারের মাঠ যদি সমতল করা যায়, তাহলে নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টির পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়বে। 

আওয়ামী লীগ যেহেতু আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হওয়া রাজনৈতিক দল, সেহেতু তাদের কাছে আমরা সঙ্গতই শোভন ও গঠনমূলক সবকিছু প্রত্যাশা করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কখনও কখনও যেরকম অশোভন রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা হয়, তা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এও মনে করি, আইনের শাসন যেমন জরুরি, তেমনি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার জবাবদিহিও জরুরি। গণতন্ত্রের মূল কথাটিই হলো জবাবদিহি। গণতন্ত্র কেবল ভোটে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশে সংবাদমাধ্যম এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যম অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল কিংবা ইতিবাচক ভূমিকায় মানুষের মনে যেমন আশার সঞ্চার হবে, তেমনি রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরাও রাজনীতির জন্য মসৃণ পথ তৈরি করতে মনোযোগী হওয়ার তাগিদ পাবেন। রাজনীতিতে অধিকারের সাম্য এবং পরমতসহিষ্ণুতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আমরা রাজনীতি চাই, কিন্তু রাজনীতির নামে কোনোভাবেই ‘শক্তির খেলা’ প্রত্যাশা করি না।


লেখক : শিক্ষাবিদ, নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা