× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মাছ চাষে আত্মকর্মসংস্থানের পথ মসৃণ হোক

আফতাব চৌধুরী

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০২:১৮ এএম

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ০২:১৯ এএম

মাছ চাষে আত্মকর্মসংস্থানের পথ মসৃণ হোক

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও কৃষিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেমন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাছ চাষে উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা পরিচালনা করছে। শহরে অনেক উদ্যোক্তাও মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। মাছ চাষের জন্য তারা গ্রামীণ জলাশয়কে বেছে নেন। বিশাল জায়গাজুড়ে মাছ চাষ করা যেমন সহজ তেমনি সাশ্রয়ী। শহরেও অনেকে কৃত্রিমভাবে মাছ চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে কাজটি বেশ সহজ। বাংলাদেশে নদীনালা, খালবিলের অভাব নেই। এসব স্থানে মাছ উৎপাদনের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও নানা কারণে এখনও মাছ উৎপাদন খুবই নিরাশাজনক। মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার নানা কারণ বর্তমান। যেসব চাষিগোষ্ঠী বিলে মাছ চাষ করেন, তারা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না যে কী পদ্ধতিতে চাষ করলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বছরের পর বছর এভাবে অনেক উৎপাদক গোষ্ঠী বিলে মাছ চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকার চাষাবাদে উৎসাহ বাড়াতে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা অনেকেই হতাশ হচ্ছেন। মূলত মাছ চাষের ক্ষেত্রে কী কী করণীয় তা অনেকেই জানেন না কিংবা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কারও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টাও করেন না। অথচ দেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাহায্য কেন্দ্র রয়েছে। তবুও কী কী কারণে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় সে সম্পর্কে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। 

ছবি : সংগৃহীত

সাধারণত বিলের পাড় উঁচু থাকে না এবং এগুলো প্রধানত অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত। বিলে এত বেশি জলজ আগাছার জন্ম হয় যে, সেগুলোর মড়ক হলে তার পচনক্রিয়ার ফলে কাদার পরিমাণ বৃদ্ধি হয়। ক্রমাগত কাদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় বটে, তবে সে কাদা তুলে এগুলোর সংস্কার করার পরিকল্পনা কদাচিৎ গ্রহণ করা হয়। এর মূল কারণ হলো অর্থ ও জানার অভাব। সেই কাদা ক্রমাগত থাকার দরুন এসব জলাশয়ে গ্যাসের সৃষ্টি হয়। ফলে মাছের বৃদ্ধি হয় না। প্রচুর কাদা থাকার ফলে পানির গভীরতা অনেক কমে যায় এবং বছরের পর বছর ক্রমাগত হ্রাস পায়। শুধু বর্ষার সময় পানির গভীরতা সামান্য বৃদ্ধি পায়, তবে বছরের অন্য সময় গভীরতা এক রাখা সম্ভব নয়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কীটনাশক ওষুধ ধুয়ে বিলে এসে পড়ে। কখনও কখনও পার্শ্ববর্তী শহরাঞ্চল থেকে অথবা কোনো কলকারখানা থেকে দূষিত পদার্থ বিলে এসে পড়ে। তার প্রতিক্রিয়া এ মাছগুলোর ওপর পড়ে, ফলে বিলের মাছের উৎপাদন কমে যায়। বর্ষার সময় পানি প্রবেশের বিভিন্ন পথ দিয়ে অসংখ্য মৎস্যভুক মাছ বিলে প্রবেশ করে। এগুলো পোনা মাছের চারা ভক্ষণ করে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এ জলাশয়গুলোর পোনা মাছের সংখ্যা ক্রমশ কমে যায়। এর ফলে পুকুরে পোনা মাছের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। 

অধিকাংশ বিলে মাছের পোনা মজুদের সংখ্যা ঠিক রাখা যায় না। প্রায় সর্বত্র অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের চারা মজুদ করা হয়। এ জলাশয়গুলোতে অবস্থিত মৎস্যভুক মাছ থাকার ফলে সেই চারা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, কাজেই মাছের উৎপাদন কমে যায়। মানে জলাশয়ে অবস্থিত মৎস্যভুক মাছ, সাপ ও বিভিন্ন প্রকারের পাখি ছোট আকারের মজুদ করা মাছের পোনা খেয়ে ফেলে, ফলে মাছের উৎপাদন কমে যায়। সব বিলে পানির গভীরতা এক থাকে না। গভীরতা অনুসারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মজুদ করা হয় না। গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাছের পোনা মজুদ হয় না। ফলে কোনো প্রজাতিরই মাছের বেড়ে ওঠা প্রত্যাশিত হয় না। মাছের উৎপাদন কমে যায়। প্রতিটি বিলে এক দফায় মাছের চারা মজুদ করা হয় না। যতদিন মাছের পোনা পাওয়া যায়, দফায় দফায় বিভিন্ন প্রজাতির এবং বিভিন্ন মাপের পোনা বিলে মজুদ করা হয়। এর ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের পোনার ক্ষতি হয়। কারণ ছোট মাপের পোনার সঙ্গে বড় মাপের পোনার খাদ্য এবং বাসস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। তাতে ছোট মাপের পোনার ক্ষতি হয়। সেগুলো খাদ্যাভাবে অপুষ্টিতে ভোগে এবং অবশেষে সেগুলোর মৃত্যু হয়। বিল সাধারণত অনেক বড় হয়। এত বড় জলাশয়ের পাড়গুলো পরিচর্যার অভাবে অনেক স্থানে ভেঙে যায়। সে পথ দিয়ে বিলের মাছ বাইরে বেরিয়ে যায় এবং বাইরের মৎস্যভুক মাছও বিলে প্রবেশ করে। ফলে বিলে চাষের উপযোগী চারা মাছের ক্ষতি হয়। অধিকাংশ বিল এত বড় হয় এবং এমন স্থানে অবস্থিত হয়, যেখানে এসব জলাশয় থেকে মাছ চুরি হয়। 

বিলে কাদা তোলার খরচ বেশি হলেও পর্যায়ক্রমে বিলের এক একটি অংশের কাদা তুলে ফেলুন। এর জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হবে, কয়েক বছর মাছ চাষ করার ফলে সে অর্থ বেরিয়ে আসবে। পাড়গুলো যেন যথেষ্ট মজবুত থাকে তা নিশ্চিত করা দরকার। না হলে চাষের উপযোগী পোনা মাছ বাইরে চলে আসবে এবং বাইরের মৎস্যভুক মাছ ও অন্যান্য প্রাণী বিলে ঢুকে পড়তে পারে। বিলের বিভিন্ন জায়গায় পানি প্রবেশ ও নিকাশের ব্যবস্থা থাকলে সেগুলোর মুখে জাল বসিয়ে দিতে হবে। ফলে বিলের মাছ যেমন বেরিয়ে যেতে পারবে না, তেমনি মৎস্যভুক মাছও বিলে প্রবেশ করবে না। যেকোনোরকম দূষণ বন্ধ করতে হবে। বিলে যদি পাট পচাতে হয়, তবে এ জলাশয়গুলোর এক একটি অংশে পাট পচানোর কাজ করবেন। বিলের যেকোনো জায়গায় পাট পচানো যাবে না। তাতে মাছের ক্ষতি হয়। কোনো কলকারখানা অথবা পাশর্^বর্তী শহরাঞ্চলের নালা-নর্দমার পানি যেন সরাসরি বিলে প্রবেশ না করে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ যেকোনো প্রকার দূষণ মাছের বাড়ের জন্য ক্ষতিকারক। কীভাবে বিলের পানির গভীরতা ঠিক রাখা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা আবশ্যক। এসব জলাশয়ের কাদা তুলে দিলে স্বাভাবিক কারণে এগুলোর গভীরতা বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া পার্শ্ববর্তী কোনো পানিধার থেকে পানির উৎস থেকে নিয়মিত পানি প্রবেশের ব্যবস্থা করা আবশ্যক, যাতে সারা বছরই বিলে পানির গভীরতা ঠিক রাখা যায়। যেহেতু যেকোনো বিলে মৎস্যভুক মাছ একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়, সেজন্য মাছের ভালো উৎপাদনের জন্য অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাছের পোনা মজুদ করুন। (১০-১৫ সে.মি.) পানির গভীরতা অনুসারে পোনা মজুদের হার নির্ণয় করতে হবে। পানির গভীরতা কম থাকলে সবকটি প্রজাতির পোনা মাছ চাষ করা যাবে না। তাতে কোনো পোনা মাছেরই ভালো ফলন পাওয়া যাবে না। বিলে সর্বদা এক দফায় মাছের চাষ করবেন। তাতে ভালো ফলন পাওয়া যায়। দফায় দফায় বিভিন্ন মাছের চারা দিলে পরের চারাগুলো ভালোভাবে বাড়তে পারে না। এর ফলে অর্থের অপচয় হয়। বছরের শেষে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না।

প্রকৃতিজাত মাছ কমে যাওয়ায় বিলে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত প্রজাতির মাছ মজুদ করা প্রয়োজন। বেশিরভাগ বিলে দেখা গেছে যে মাছের পোনা মজুদ করা হয় না। বিলের কোনো সংস্কার করা হয় না। যেসব বিল সরকারিভাবে লিজ দেওয়া হয়, সেগুলোতে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদনের ওপর লিজগ্রহীতা পুরো নির্ভরশীল। লিজ বাবদ যে টাকা ধার্য করা হয়, সেই টাকা মিলিয়ে যে লাভটুকু থাকল, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট। যতদিন পর্যন্ত না বিলের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, ততদিন মাছের অভাব থাকবেই। বিশ^ব্যাংকের সাহায্যে ০.০৩ হেক্টর থেকে ০.৪০ হেক্টর পর্যন্ত পুকুরে মাছ চাষ বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ হলেও মাছের উৎপাদন তেমন আশানুরূপ বৃদ্ধি পাবে না। প্রতিটি বিলের সমস্যা এক নয়। বিলের সমস্যা নির্ভর করে জলাশয়ের অবস্থান ও গুণাবলীর ওপর। সুতরাং বিলের সমস্যাগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেকোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কিছু খরচ অবশ্যই করতে হয়। মাছ চাষ একটি ব্যবসাভিত্তিক উদ্যোগ। সুতরাং এসব খাতে অর্থলগ্নি করলে বছরের শেষে মাছের উৎপাদন হয়ে সে লগ্নিকৃত টাকা বিনিয়োগকারীর হাতে ফিরে আসবে। বিলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য টাকা খরচ করলে ক্ষতি হবে না, বরং মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে উদ্যোক্তা লাভবান হবেন। 


লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা