ইরান-ইসরায়েল সংঘাত
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫ ১৬:০১ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের রাজধানী তেহরানে পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাকে মূল লক্ষ্যবস্তু করে ইসরায়েল একাধিক হামলা চালিয়েছে। এর পাল্টা জবাবে ইরানও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলের ওপর। এর আগে গত বছর উভয় দেশ একে অন্যের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে। কিন্তু অতীতের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে এবারে ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের দেওয়া পাল্টা জবাব অনেক বেশি বিস্তৃত।
পৃথিবীর দুই প্রান্তে এখন দুটি প্রত্যক্ষ যুদ্ধ চলছে। ইউরোপে চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চলছে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসন। সম্প্রতি উপমহাদেশেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল ভারত-পাকিস্তান। চিরবৈরী এই দুই দেশও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেÑ এমন শঙ্কা দেখা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সে আশঙ্কা সত্যি হয়নি। ফলে পারমাণবিক শক্তিধর দুটো দেশ টানা কয়েক দিনের হামলা-পাল্টা হামলার পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিশ্ব নেতারা, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে ইতিবাচক ভূমিকা দেখা গেছে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে তা অনুপস্থিত। অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে গর্বের উত্তরাধিকার হবে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভূমিকা।’ কিন্তু ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে তার অবস্থান শান্তি প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতবাহী নয়। কারণ ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালানোর পর ট্রাম্প যেভাবে ইরানের প্রতি ‘আরও ভয়াবহ হামলা আসছে’, ‘চুক্তি করো, নইলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’ এবং ‘আমরা সব আগেই জানতাম’ ইত্যাদি বলে নিজের যে অবস্থান জানান দিয়েছেন, আমরা মনে করি তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্বকে একটি বিপজ্জনক অবস্থার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ওমানের রাজধানী মাস্কটে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ষষ্ঠ দফা পরমাণু আলোচনা হওয়ার যে কথা ছিল পাল্টাপাল্টি হামলার পর সে আলোচনা বাতিল হয়েছে। ফলে বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগও কমে গেল। অথচ মানব ইতিহাসে সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে একটি দাবিই স্পষ্ট হয়েছেÑ যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই দাবির প্রতি রাষ্ট্রনায়করা যথাযথ সম্মান দেননি। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতায় এখনও পুড়ছে পৃথিবীর নানা প্রান্ত।
বিশ্বের যে প্রান্তেই যুদ্ধ হোক না কেন, এর অভিঘাত থেকে কেউই মুক্ত নয়। এ পরিস্থিতিতে আমরাও নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারি না। বর্তমান পৃথিবীতে প্রতিটি দেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধের অভিঘাতে কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তা কারও অজানা নয়। বিশ্বের এক প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলে তার ঢেউ অন্য প্রান্তেও পড়ে। তাই আমরা মনে করি, হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মানসিকতা পরিহার করে বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা জরুরি। রণক্ষেত্রে শক্তি পরীক্ষা শুধু অসংখ্য নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের প্রাণই কেড়ে নেবে। দিন শেষে সাধারণ মানুষের জীবনে বিপর্যয়ই ডেকে আনবে। অর্থনৈতিক ক্ষতিও শুধু বিবদমান দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তার নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে পুরো বিশ্বেই।
এই পরিস্থিতিতে শুধু ইরান-ইসরায়েল নয়, আমরা প্রত্যাশা করি বিশ্বের নানা প্রান্তে চলমান যুদ্ধেরও অবসান হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিটি এলাকার বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে শান্তির আলোচনা শুরু হবে। আমরা চাই, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের কারণগুলো নির্মূল হোক। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ফেরানোর ব্যাপারেও বিশ্ব নেতারা উদ্যোগী হবেন। উপমহাদেশে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়াতে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতার ভূমিকায় এগিয়ে এসেছিলেন তেমনিভাবে ইরান-ইসরায়েল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসন থামাতেও বিশ্ব নেতারা এগিয়ে আসবেন। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকাও জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে না এলে চলমান যুদ্ধগুলো থামবে না। বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধগুলোর মত আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ভার বর্তমান পৃথিবী কতটা সইতে পারবে, সে বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুধাবন করতে হবে।
আমরা আশা করি, ইরান-ইসরায়েলের পাশাপাশি রাশিয়া, ইউক্রেন, ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্বের মধ্যেও শুভবুদ্ধির উদয় হবে। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে আমরাও একাত্ম হয়ে বলতে চাই, অবিলম্বে ইরান ও ইসরায়েলের পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ হোক। বিশ্বে শান্তি বজায় থাকুক। আমরা চাই না যুদ্ধের অভিঘাতে পৃথিবীর আর কোথাও কোনো মানুষ প্রাণ হারাক, কেউ বাস্তুচ্যুত হোক। যুদ্ধের ভয়াবহতা নয়, শান্তি চাই।