পরিবেশ
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৫ ১৫:৫৭ পিএম
হোসেন আবদুল মান্নান
একসময়ে দেশের হাওরাঞ্চলে, খালে, বিলে-ঝিলে দেশীয় প্রজাতির হরেকরকমের মাছ ছিল। মাছের প্রাচুর্য নিয়ে, মাছের প্রকারভেদ নিয়ে, মাছ ধরার কলাকৌশল নিয়ে বিচিত্র ধরনের গল্পগাথাও রয়েছে। এদেশে মাছের নাম নিয়ে আছে অসাধারণ শ্রুতিমধুর জারি সারি গান। যা যুগ যুগ ধরে বাঙালিরা শুনে আসছে। অফুরন্ত আনন্দ-উল্লাসের খোরাক পেয়েছে।
মাছের গানের আসরে বাউলদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শুনেছে। এককালে গ্রামে বিনোদনের অন্যতম উপকরণ ছিল মাছ ধরা। মনে পড়ে, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় দেশীয় বাউল শিল্পীগণ মাছ নিয়ে নানা প্রকার গান বেঁধেছিলেন। যা বেহালায় সুর তুলে হাটে ঘাটে গেয়ে বেরিয়েছেন।
‘দেশে আইল বন্যার জল/ মাছের বাড়ল দ্বিগুণ বল’।/ তা ছাড়া ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ -এই অভিধাও এদেশে মাছের সহজলভ্যতাকেই প্রমাণ করে। গ্রামের ছোট ছোট নদীনালা, খাল-বিল ছিল মাছের অভয়ারণ্য। বর্ষার নতুন জলের সঙ্গে ভেসে আসত নানা জাতের মাছ। গ্রামীণ জনপদে একটা সময় ছিল, জলে নামলেই মাছের স্পর্শ পাওয়া যেত। মানুষ খালি হাতে পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরে নিয়ে আসত। মাছ আর বাঙালি যেন একে অপরের পরিপূরক। এ দৃশ্য এখন বিলুপ্তির পথে। দেশব্যাপী নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম। এর মূল কারণ যতটা না জনসংখ্যার আধিক্য এর চেয়ে অনেক বেশি কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং ডিমওয়ালা মাছ ধরে ব্যবসা করা, বিলে-ঝিলে অপরিকল্পিত বাঁধ দেওয়া ইত্যাদি। সম্প্রতি মাছ নিধনে আরও দানবীয় এবং অমানবিক চিত্র পাওয়া গেছে গ্রামের অবিবেচক, অশিক্ষিত নরপিশাচদের কর্মোণ্ডে।
তারা প্রথমে দরিদ্র কৃষকের কাছ থেকে হাওর-বাঁওড়ের এক ফসলি জমি লিজ বা ক্রয় করে নেয়। পরে বালু বিক্রির নামে জমিতে বিশাল ও গভীর গর্ত করে নেয়। এর ফলে পার্শ্ববর্তী মালিকের ফসলি জমি ভেঙে গর্তের ভেতরে চলে আসে। প্রতিবাদ করা মানে, মামলা মোকদ্দমার জালে আবদ্ধ হওয়া। ন্যায়বিচার চাওয়া সুদূরপরাহত। একপর্যায়ে পাশের জমিওয়ালাকে তার জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। এ দুর্বৃত্তরা স্থানীয় দুর্বল প্রশাসনকে হাত করে তখন বালু তোলার ব্যবসা পর্ব শেষ করে। এবং জমির মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকার বালু বিক্রি করে মনের আনন্দে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সামান্য নজরানা দেয়, তাদের জন্য গেট, তোরণ নির্মাণ করে, সভার সমিতির খরচপাতি, হোন্ডার তেল জোগান দিয়ে সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রভাব বিস্তারপূর্বক সকলই যেন মহাসুখে আছে। এবার দুর্বৃত্তরা তার নিজের সৃষ্ট বিশাল খাদে হাওরের মাছ আনার কৌশল নেয়। মৌসুমের একসময়ে মাছ ধরার আগে তারা দিবালোকে খাদের পানিতে বিষ প্রয়োগ করে থাকে। কারণ গভীর গর্ত হওয়ায় জাল দিয়ে মাছ ধরার অবস্থা তখন থাকে না। বিষ দেওয়ার ফলে কিছু সময়ের মধ্যেই এ এলাকার ছোট বড় মাছের পোনা এমনকি ডিম পর্যন্ত মরে যায় বা অর্ধমৃত অবস্থায় ভেসে ওঠে এবং এগুলো বাজারে বিক্রি করে অবলীলায় কামিয়ে নিচ্ছে অর্থ। দলীয় পদপদবি বাগিয়ে নিচ্ছে। রাতারাতি নেতা বনে যাচ্ছে। তারা ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশীয় জাতের হাওর-বাঁওড়, খালের মাছের বংশবিস্তারকে। নির্মূল করে দিচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ছোট মাছের জাতকে। একসময়ে হাওরের পাশের শত শত গ্রামবাসী সকালে-বিকালে টাকি ও শোল মাছের পোনা মারতে যেত। তখন উৎসবের মতো দৃশ্য ছিল। আজকাল এ চিত্র নেই বললেই চলে। তবে গ্রামের প্রবীণদের ধারণা, বিষপ্রয়োগ বন্ধ হলে আগামী দু’চার বছরেই হয়তো হরেকরকম মাছ দেখা যাবে। বিষপ্রয়োগকারীদের অপরাধ বহুমাত্রিক। যেমন- ফসলি জমি নষ্ট করা, গর্ত খুঁড়ে অন্যের জমি ফসলের অনুপযোগী করে দেওয়া, বিষপ্রয়োগে দেশি মাছের অস্তিত্ব শেষ করা, বিষাক্ত মাছ বাজারে পাঠিয়ে জনস্বাস্থ্যের পরিপন্থি কাজ করে চলেছে।
দেশে দিনের আলোতেই এগুলো হচ্ছে। সেভাবে পত্রপত্রিকায়, সামাজিক মাধ্যমে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কোথাও সংবাদ নেই। এ ক্ষেত্রে সবাই যেন নীরব, নিঃশব্দ, বোবা। সবকিছু চলছে প্রকাশ্যে যোগাযোগ করে, ম্যানেজ করে। সমাজে এখন ম্যানেজ শব্দটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কে কার বিরুদ্ধে, কার কাছে অভিযোগ করবে? কে ব্যবস্থা নেবে? কে বাঁচাবে আমাদের অতীতকে? কে দিবে আমিষের নিরাপত্তা? বর্তমান ও ভবিষ্যতের দরিদ্র গ্রামীণ প্রজন্মকে সুরক্ষা দিবে কে?
সকলেরই জানা আছে, ফসলি জমি থেকে বালু তোলা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। এর জন্য সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের চিঠিপত্র আছে, প্রজ্ঞাপন আছে, সভা আছে, সরকারকে নিয়মিত দাপ্তরিকভাবে অবহিতকরণ আছে। সবই আছে কিন্তু অপরাধগুলো দিব্যি সংঘটিত হয়ে চলছে। এতে মনে হয় কারও দায় নেই, কর্তব্য নেই, করণীয় নেই। সরকার বারবার বলছে, পরিকল্পিত ব্যবস্থায় মাছের চাষ করে মিঠা পানির বিভিন্ন জাতের দেশি মাছকে সুরক্ষা দিতে হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেশে মাছ চাষ জরুরি। মাছ চাষে দেশ অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করেছে। সরকারের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ এখন মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাছই আমিষের ঘাটতি পূরণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। তবে বিল-ঝিলে থাকা কৈ, শিং, মাগুর, বাইন, শোল, গজার, বোয়াল, ট্যারা, পুঁটি, টাকি, মলা, ঢেলা, চেলা, গুতুম ইত্যাদি মাছকেও রক্ষা করতে হবে। শুধুমাত্র চাষের মাছের ওপর নির্ভর করে এমন বিপুল বিশাল জনসংখ্যার একটা দেশ চলতে পারে না। তা ছাড়া চাষের মাছের তুলনায় বিলের, খালের মিঠাপানির মাছ যেমন সুস্বাদু তেমনি অধিকতর পুষ্টিগুণসম্পন্ন। এসব মাছের পোনা সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাগারও প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশি মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেশের মৎস্য বিশেষজ্ঞগণ নানা যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। তারা জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট জালের ব্যবহার, ফসলে কীটনাশক প্রয়োগ, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মৎস্যজীবীদের উদাসীনতা ইত্যাদি নানা বিষয় উল্লেখ করলেও বিষপ্রয়োগ করে মাছের বংশ নির্মূল করে দেওয়াকে সবচেয়ে গর্হিত অপরাধ বলে চিহ্নিত করা উচিত।
পানিতে তরল বিষ মিশিয়ে মাছ হত্যা করার বিরুদ্ধে কঠিন আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা এ সময়ের একটা অতি জরুরি দাবি। এর চেয়ে জঘন্য কাজ হতে পারে না। এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে বিশেষ করে ভাটি অঞ্চলের হাওর এলাকায় মোবাইল কোর্ট বসাতে হবে। আদালতে অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। এর কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। দেশের বিদ্যমান আইনেও শাস্তির বিধান আছে। তথাপি গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করে, মানুষকে সচেতন করার পর তা কার্যকর করা হলে তা বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে প্রতীয়মান হয়। যেমন, কারেন্ট জাল ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এটা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে নাটক-নাটিকা, স্ক্রল সংবাদ ইত্যাদিতে পরিবেশনের মাধ্যমে সর্বত্র প্রচার করায় জনমনে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। তেমনি মাছ ধরতে বিষ প্রয়োগের মতন এই অপকর্ম যে আত্মঘাতী এবং দেশ জাতি, গণবিরোধী তা জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। উল্লেখ করা যায়, যেকোনো প্রকার জাল, বড়শি বা অন্য উপকরণ দিয়ে খাল-বিলের মাছ ধরা হলে পোনাসহ সম্পূর্ণরূপে শেষ করা যায় না। এটা কখনও সম্ভব হয় না। কিন্তু বিষ দিয়ে শুধু মাছ নয়, অন্যান্য জলজ জীবজন্তুও ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। যাতে প্রকৃতিরও ভারসাম্য বিনষ্ট করে দিচ্ছে। জমির উর্বরতা ও ভালো ফসলের অনুকূলে জলে বাস করা অপরাপর জীবজন্তুরও সহায়ক ভূমিকা রয়েছে।
এহেন পরিস্থিতিতে, গ্রামবাংলার নদীনালা, খালবিল, জলাশয়ে মাছ ধরার নামে বিষপ্রয়োগ কঠোর আইনি পদক্ষেপে দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এটা জনস্বার্থে করতে হবে। অন্যদিকে মিঠাপানির স্বাস্থ্যসম্মত সুস্বাদু দেশীয় জাতের মাছ রক্ষার্থে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগকেও উৎসাহিত করা অতীব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হবে বলে মনে হয়।