করোনাভাইরাস সংক্রমণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫ ১৬:০৫ পিএম
প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্ববাসী। সম্প্রতি সেই মহামারি আবার নতুন রূপে দেখা দিয়েছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে সম্প্রতি এই সংক্রমণ বাড়ছে। বাংলাদেশেও হঠাৎ বাড়তে শুরু করেছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি। জানা গেছে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ জনের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। ১০১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে এই ১৩ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। তবে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত কারও মৃত্যু হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে ২৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। মে মাসে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ৮৬। ৫ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজন মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সংক্রমণের সংখ্যা কম হলেও আগের সপ্তাহের তুলনায় ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এদিকে গত কয়েকদিনে বিমানপথ, নৌপথ, স্থলপথ দিয়ে ভারতে মোট ৬ হাজার ৪৯১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৬৫ জন। আমাদের নিকটবর্তী পশ্চিমবঙ্গেও করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে ৭৪৭ জন। প্রতিবেশী দেশের এই পরিসংখ্যান আমাদের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
টানা তিন বছর ভয়াবহভাবে বিশ্ববাসীকে দুর্ভোগে ফেলে, লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে করোনার সংক্রমণ বন্ধ হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, মারণঘাতী এই ভাইরাসটি হয়তো প্রাকৃতিকভাবেই নির্মূল হয়েছে। কিন্তু এর সংক্রমণ ফের দেখা দেওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো ৩ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর, ১৮ মার্চ দেশে করোনায় প্রথম একজনের মৃত্যু ঘটে। করোনা মহামারির সবচেয়ে ভয়াবহ সময় ছিল ২০২১ সালের আগস্ট। ওই বছরের ৫ ও ১০ আগস্ট দুই দিনে সর্বোচ্চ প্রতিদিন ২৬৪ জন করে মৃত্যুবরণ করেÑ যা ছিল দেশের করোনাকালের সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা।
১১ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ফের করোনার হানা, সতর্কবার্তা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার ওমিক্রণের নতুন সাব ভ্যারিয়েন্ট এলএফ.৭, এক্সএফজি, জেএন-১ ও এনবি ১.৮.১-এর সংক্রমণ বিভিন্ন দেশে বাড়ছে। যা আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরামর্শ দিয়েছে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভারত গমন না করার জন্য। পাশাপাশি জনসাধারণকে বাস, ট্রেন ও পাবলিক প্লেসে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে প্রবেশপথে থার্মাল স্ক্যানার ও ডিজিটাল হ্যান্ড হেল্ড থার্মোমিটারের মাধ্যমে যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিই মজুদ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়াতে করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রচারসহ এবং জনগণকে সংক্রমণপ্রবণ দেশগুলোতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর গবেষকদের তরফ থেকে এই পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দিনে সাতবার বা প্রয়োজনমতো অন্তত ২৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নাক-মুখ ঢাকতে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু বা কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে। অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা প্রতিরোধের উপায় হলো মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও টিকা নেওয়া। যেসব ব্যক্তি ইতঃপূর্বে একটি ডোজ নিয়েছে, তাদের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ডোজ নেওয়া জরুরি। যারা বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা, ভিন্ন কোনো জটিল রোগে ভুগছেন, তাদের জন্য তো বটেই, এমনকি যেসব ব্যক্তির সর্বশেষ টিকা নেওয়ার মেয়াদ ছয় মাস পার হয়ে গেছে, তাদেরও নতুন করে করোনার টিকা নেওয়া উচিত।
প্রকাশিত সংবাদে দেশে করোনা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিট না থাকার প্রসঙ্গটিও উঠে এসেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, তাদের হাতে এখন ৩১ লাখ ফাইজারের তৈরি করোনার টিকা আছে। এর মধ্যে গত দুই মাসে ১৭ লাখ ১৬ হাজার ৯০০ ডোজ ফাইজারের টিকা সব জেলায় পাঠানো হয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে ৬ আগস্ট। করোনার সম্ভাব্য বিস্তার রোধে অবিলম্বে কিটসহ পরীক্ষার সরঞ্জাম সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার বিকল্প নেই। ভুলে গেলে চলবে না, বিগত করোনা মহামারির সময় আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা। সেবার করোনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে আক্রান্ত এবং তাদের স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এবারও যাতে সে রকম পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
এটা স্পষ্ট যে, করোনা একবার হয়েছে, আর হবে নাÑ এই আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। নতুন এই ভ্যারিয়েন্টে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। তাই সবার মাস্ক পরতে হবে। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। স্কুলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস-পরীক্ষা নিতে হবে। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এই জনসচেতনতার কাজটি করতে হবে সর্বস্তরে এবং সবখানে। করোনার বিস্তার ঘটার আগেই সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।