পরিবেশ
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৫ ১৬:০২ পিএম
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
শালবনে আবার শালগাছই ফিরিয়ে আনা হবে। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এমন আশাই প্রকাশ করেছেন। শালবন, টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে অবস্থিত। মধুপুর গড় নামে পরিচিত। এর আয়তন ৪ হাজার ২৪৪ বর্গকিমি। মধুপুর গড়ের প্রধান গাছ হলো শাল। এই কারণে একে শালবনও বলা হয়। একে ঝরাপাতার বনও বলা হয়। কারণ শীতকাল শেষ হলে শালগাছের পাতা ঝরে যায়। পাতা পচে সার হয়। সেই সারের পুষ্টি পেয়ে আবার নতুন গাছ হয়। এটি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যানও বটে। টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় এর অবস্থান। একে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয় ১৯৬২ সালে। মধুপুর অন্যতম পর্যটন স্থান হিসেবেও পরিচিত। যে গাছটির নামে এই বন, সেই শালগাছ ধ্বংসের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। মধুপুরে আগে জুম চাষ হতো। ১৯৫৫ সালে সেখানে জুম চাষ নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫৬ সালে প্রাকৃতিক বন কেটে গাছের চারা রোপণ করা শুরু করে বন বিভাগ। উডলট গাছ লাগাতে লাগাতে এটি হয়ে উঠে উডলট বন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে অর্থায়নে সাড়ে সাত হাজার একরজুড়ে চাষ করা হয় উডলট ও এগ্রোফরেস্ট্রি বাগান। এই উডলট প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ১০ বছর। এখানে সাত হাজার পাঁচশ তিন একর বনভূমিতে রাবার চাষ হয়। ১৯৮৬ সালে মধুপুরে রাবার চাষ শুরু হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ৭৮০০ একর জমিতে রাবার চাষ হয়। এর ফলে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো হারাতে শুরু করে। এখানে আনারস ও কলা চাষও হয় অনেক। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে টাঙ্গাইল জেলার আনারস উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৩৫২ মেট্রিক টন। এর অধিকাংশই চাষ হয়েছে শালবনে। মধুপুরে ১৬ হাজার ৫৭৫ একর জমিতে আনারস চাষ হয়। এ ছাড়া কলা চাষেও মধুপুর এখন এগিয়ে। ২০১৬-১৭ সালে টাঙ্গাইল জেলায় কলা উৎপাদনের পরিমাণ ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬১৫ মেট্রিক টন। এর বেশিরভাগই উৎপাদিত হয়েছে মধুপুর বনে। ১৯৯৭ সালে মধুপুর বনে কৃষি বনায়ন শুরু হয়। ২০০০ সালে এখানে সামাজিক বনায়ন প্রকল্পও করা হয়। সামাজিক বনায়ন সাধারণত যেখানে গাছ নেই সেখানে গাছ লাগানো হয়। তা না হয়ে বরং উল্টোটা ঘটেছে। যেখানে গাছ আছে সেসব গাছ কেটে অন্য গাছ লাগানো হয়েছে।
সামাজিক বনায়নে স্থানীয় জাতের গাছ না লাগিয়ে আগ্রাসী উদ্ভিদ লাগানোর ফলে অনেক ক্ষতি হয়েছে বনের। এ ছাড়া মধুপুর বনে আনারস, কলা চাষ করার কারণে অনেক কৃত্রিম হরমোন ও রাসায়নিক সার দিতে হয়েছে। কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছে কৃষককে। এসব ব্যবহারের কারণে বনের প্রাকৃতিক পরিবেশেরও পর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে। শুধু গাছ পরিবর্তন হয়নি। মানুষও বদলে গেছে এখানে। এর এক-তৃতীয়াংশ দখলে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। ৪৫ হাজার ৫৬৫ দশমিক ১৭ একর বনের ভেতর জবরদখলকৃত বনের পরিমাণ ১৪ হাজার ৮৮০ দশমিক ৯৬ একর।
মধুপুর গড় পুরোটাই বন দিয়ে বিস্তৃত ছিল ৫০ বছর আগেই। কিন্তু গাছ কাটার ফলে এখন বনভূমি হয়েছে মাত্র ৬০০ বর্গকিলোমিটারের। বনায়ন করা হলেও শাল না লাগিয়ে লাগানো হচ্ছে আকাশি আর ইউক্যালিপটাস গাছ। এর ফলে কমে যাচ্ছে পাখি প্রজাতি। মধুপুর জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের বৃহত্তম শালবন। এ ছাড়া একটি তথ্য মতে, গত ৩০ বছরে মধুপুর শালবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সম্প্রসারণের কারণে। নগরায়ণের বড় প্রভাব পড়েছে এতে।
মধুপুর বনে প্রায় ১৭৬ প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ রয়েছে। এসব উদ্ভিদের মধ্যে ৭৩ প্রজাতির বৃক্ষ, ২২ প্রজাতির গুল্ম, ২৭ প্রজাতির ক্লাইম্বার, ৮ প্রজাতির ঘাস, ৪৫ প্রজাতির বিভিন্ন ঔষধি গাছ। এখানে শাল, মহুয়া, বহেড়া, আমলকী, আমড়া, জিগা, অশ্বত্থ, সর্পগন্ধা, শতমূলী, হাড়জোড়া প্রভৃতি নানা জাতের গাছ। শালগাছ বেশি বলে একে শালবন বলা হয়। এ ছাড়া বুনুডুমুর, মনকাটা, খেজুর, দামন, তিতিজাম, কাশিগোটা, তিতফল, দুধকুরুজ, জারুল, শতমূলী প্রভৃতি নানা দেশীয় গাছ ছিল। শালবনে কিছু গাছের নাম বলা যাবে, যা এখন দেখা যায় না বললেই চলে। এগুলো হলোÑ আনাইগোটা, শিলকড়ই, সাদা কড়ই, ওলটকম্বল, শিরীষ, হরীতকী প্রভৃতি।
বন বিভাগ শালবনকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। বনটির সীমানা চিহ্নিত করছে। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণির মতো আগ্রাসী গাছ না লাগিয়ে শাল ও স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর কাজ করছে। হিন্দুদের দেবতা বিষ্ণুর প্রিয় গাছ এই শাল। বলা হয় এই গাছ বিষ্ণুর আশীর্বাদপ্রাপ্ত। আবার বুদ্ধদেব মহানির্বাণ লাভ করেছিলেন এই শাল বৃক্ষের নিচেই। শালবনে এমন বৃক্ষের ছেয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বোধ করি আমরা সবাই দেখি।