প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৫ ১৫:৫২ পিএম
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ফাইল ফটো
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গত ৬ জুন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি ভাষণে গত সাড়ে ৯ মাসে তার সরকারের অর্জনগুলো জাতির সামনে তুলে ধরেন। জুলাই সনদ, মানবিক করিডোর, বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে আসে তার ভাষণে। সেই সঙ্গে আগামী বছরের এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধের যেকোনো একটি দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ নির্ধারণ করেছেন। সম্ভাব্য মাস ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচনী রোডম্যাপের আপাত নির্দেশনা পাওয়া গেল। আশা করা যায়, এই ঘোষণার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিবেন। নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে জোরালো অবস্থানে ছিল বিএনপিসহ দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তবে প্রধান উপদেষ্টা বরাবরই বলে এসেছেন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সময়টা হবে বাংলা সনের চৈত্র মাসের শেষ দিকে। তথ্য মতে, আগামী ঈদুল ফিতর হবে ১৯ বা ২০ মার্চ। এসএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ মে মাসে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে খুব সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
প্রধান উপদেষ্টার স্পষ্ট উচ্চারণÑ সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন এই তিনটি ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। তবে সরকারের বড় দায়িত্ব হলো পরিচ্ছন্ন, উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ, বিপুলভাবে অংশগ্রহণের পরিবেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এজন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। যেই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সেগুলোতে যদি সুশাসন নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যাহত হবে। তার আশাবাদ, দেড় যুগ পরে দেশে সত্যিকারের একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ গঠিত হবে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ এবার জীবনে প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। দেশবাসীর প্রতি প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান, সব রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আদায় করা, যেন আগামী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যেসব সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য অর্জিত হয়েছে তা অনুমোদিত হয়। আগামী নির্বাচনটি যে শুধু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার বিষয় নয়। এটা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার নির্বাচন- নেই বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচনে পরিচিত দলগুলোই থাকবে। কিন্তু ভোটারকে বের করে আনতে হবে প্রার্থীরা কে কতটুকু ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার জন্য প্রস্তুত।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে আরও বলেন, ‘আমরা একটা যুদ্ধাবস্থায় আছি। আমাদের একতাবদ্ধ থাকতে হবে যেকোনো মূল্যে। কারণ, পতিত ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা নতুন বাংলাদেশ গড়ার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা নানামুখী অপপ্রচারেও লিপ্ত। তারা চাইবে জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৈরি হওয়া জাতীয় ঐক্যের শক্তিকে পরাভূত করতে, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে লাইনচ্যুত করতে এবং বাংলাদেশকে পুনরায় করায়ত্ত করতে।’ তার আশাবাদ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে সকলের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
এখানে মনে রাখা জরুরি, স্বাধীনতার পর থেকে দেশ যতবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছে তার সবগুলোরই প্রধান কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বারবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল বর্বর ফ্যাসিস্টে পরিণত হয়েছিল। এই ধরনের নির্বাচন যারা আয়োজন করে তারা জাতির কাছে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। তবে এপ্রিলে ভোট আয়োজনের ঘোষণায় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভক্তি রয়েই গেছে। নির্বাচনের সময়সূচি ঘিরে সরকারের সঙ্গে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের টানাপড়েন এখনও দৃশ্যমান। তারা চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন চাচ্ছে। ফলে এই টানাপড়েন সামনে আরও ঘনীভূত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। আমরা মনে করি, এই সংকট শুধু সময়ের নয়, এটি বিশ্বাস ও বৈধতার সংকটও বটে। তাই সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের বাস্তবভিত্তিক আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ছাড়া এই জট খুলবে বলে মনে হয় না।
আসলে নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অতীত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে আর দ্বন্দ্ব-সংঘাত নয় বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আরেকটা বিষয় আইনি জটিলতায় পতিত আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকছে। হয়তো বাইরে থাকবে তাদের অন্য জোটগত দলগুলোও। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে পতিত ফ্যাসিবাদ ও তাদের দোসরদের নিয়ে যে শঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন তা ধর্তব্যে নিয়ে বলতে হয়Ñ সকলের ঐক্যই পারে একটি শঙ্কামুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনও ভোট দিতে পারেননি। কাজেই সবাই মিলে একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা গণতন্ত্র চাই। আর কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশপ্রেমিক, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও যোগ্য সরকার দরকার। পাশাপাশি একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলও প্রয়োজন। আমরা আর পেছনে ফিরতে চাই না, সামনে এগোতে চাই। আমরা চাই, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।