বাজেট ২০২৫-২৬
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৫ ১৬:২১ পিএম
বাজেট হচ্ছে অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। এটা জাতির রূপরেখাও বলা যায়। এই রূপরেখাকে সামনে রেখে ২ জুন সোমবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। এটি দেশের ৫৪তম বাজেট। জুলাই অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে ভিন্ন বাস্তবতায় এবার সংসদের বাইরে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। অর্থ উপদেষ্টার বাজেট বক্তব্য রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভি ও বেতার সম্প্রচার করে। উল্লেখ্য, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে একইভাবে একই পরিস্থিতিতে এভাবে বাজেট পেশ করা হয়েছিল। বলে রাখা ভালো, এবার বাজেট তৈরি করছে এমন একটি সরকার, যার মেয়াদ সীমিত। কিন্তু জনপ্রত্যাশার পরিধি অপরিসীম। দেশে কার্যকর সংসদ নেই। নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বিরাজমান। জনমনে আস্থার সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে, রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি, বিদেশি ঋণ শোধের চাপ, মূল্যস্ফীতির অভিঘাতে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত।
গত পনেরো বছর প্রতিটি বাজেটের আকার ধারাবাহিক বৃদ্ধি পেলেও এবারই প্রথম আগের বছরের চেয়ে কমেছে বরাদ্দের পরিসর। এবার বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে গত অর্থবছরের চেয়ে বাজেটের আকার কমেছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এটিও গত বিদায়ি অর্থবছরের চেয়ে কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এডিপি ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জোগান দেবে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অন্যান্য খাত থেকে আসবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা বা মোট লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৩ দশমিক ৬২ ভাগ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে আসবে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঘাটতির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আর বিদেশি ঋণ থেকে আসবে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বা ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
৩ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশে ‘পুরনো ছকেই নতুন বাজেট’ শিরোনামের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এই চিত্র। প্রতিবারই জাতীয় বাজেট পেশের পর নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়ে থাকে। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। কারও মন্তব্য এটা জটিল সময়ে খুবই সাধারণ বাজেট, কেউ বলছেন করের জালে নিরুত্তাপ বাজেট। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের বাজেটেও তেমন কোনো চমক নেই। পুরনো ধাঁচের সেই গতানুগতিক বাজেট পেশ করা হয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি ও টাস্কফোর্সের সুপারিশও আমলে নেওয়া হয়নি। বাজেট-কাঠামোয় কোনো পুনর্মূল্যায়ন হয়নি। তাদের অভিমত, বিদ্যমান যে বাজেট-কাঠামো সেই পথেই হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থনীতিবিদদের দাবি ছিল, কর খাতের সংস্কারের মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানো। কিন্তু সরকার সেই পথে না গিয়ে যারা কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই কার্যত বোঝা বাড়ানোর নীতি নিয়েছেন। বাজেটে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে, কালোটাকা সাদা করার বিষয়টি। সরকার কর ফাঁকিবাজদের বিশেষ সুবিধা দিলেও সৎ করদাতাদের সঙ্গে বৈষম্য করতে পারে না। কার্যত ঘোষিত বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় প্রতিফলিত হয়নি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এবারই প্রথম আগের অর্থবছরের চেয়ে ছোট বাজেট। বাজেটে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় আগের অর্থবছরের চেয়ে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে জনপ্রত্যাশা পূরণে শঙ্কা রয়েছে। বরং এবার পরিচালন ব্যয় নিয়েই তারা চাপে থাকার কথা। রয়েছে সুদ ও বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি বিষয়টি। এমনিতেই আয়ের বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমাতে যে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে নানা রকম সংরক্ষণমূলক নীতি গ্রহণ করেও মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যায়নি। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে এবং জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ায় মানুষকে চাহিদার নিরিখে বাধ্য হয়েই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। বাজেটে নেই কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোন বার্তাও।
এ কথা সত্য যে, রাজস্ব আয়ের টার্গেট পূরণ না হলে সরকারকে ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশ থাকবে বলে আশা করা হয়েছে। গত এক বছর নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির নাভিশ্বাস উঠেছে জনমনে। তারপরও বাজেটে বাড়েনি করমুক্ত আয়ের সীমা। বরং আয় বাড়াতে কর কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আইএমএফের পরামর্শ বাড়াতে হবে করপোরেট করও। এতে ব্যবসার খরচ বাড়বে, এমন আশঙ্কায় ভুগছেন ব্যবসায়ীরা।
আসলে বাজেট বলতে সাধারণ মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কতটুকু বাড়লো বা কমলো। জীবনযাত্রার ব্যয় তার জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক-এসব বিষয়। বাজেট পাসের আগে সাধারণের বিষয়গুলো সরকারকে বিবেচনার অনুরোধ করছি। আশা করি, সরকার সবার আগে জনস্বার্থের বিষয়গুলো প্রাধান্য দেবে। সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করতে হবে।