বাজেট-২০২৫-২৬
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৫ ১৬:১৯ পিএম
নিরঞ্জন রায়
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বাজেট জাতির সামনে পেশ করেছেন। সব সময় বাজেট ঘোষণার পর বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা এবং লেখালেখি হয়। এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা ব্যতিক্রমী বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন যে অতীতের যেকোনো বাজেটের তুলনায় এবারই প্রথম বাজেট বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে। জানি না অর্থ উপদেষ্টার এমন মন্তব্য ইতিবাচক, না নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হবে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাজেট বরাদ্দ হ্রাস ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। কেননা বাজেট বরাদ্দ হ্রাস করার অর্থই হচ্ছে দেশের অর্থনীতির গতিকে থামিয়ে দেওয়া বা পেছনে ফেলে দেওয়া। এ কারণেই পরিস্থিতি একেবারেই সংকটাপন্ন না হলে কোনো রাষ্ট্রই সংকোচনমূলক বাজেটে যেতে চায় না।
অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে অর্থনৈতিক মন্দা বা অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করলে বাজেটে কিছুটা সমন্বয় করতে হয়। অবশ্যই করতে হয়। তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় বা আপওয়ার্ড অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হয়। অনেক সময় বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়। কিন্তু মোট বাজেট বরাদ্দ সবসময়ই অতীতের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের অর্থনীতি যখন মন্দা বা স্থবির অবস্থায় থাকে, তখনই সম্প্রসারণমূলক বাজেটের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বাজেটে যদি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিচালনা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হ্রাস করা সম্ভব হতো বা রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করে বাজেট ঘাটতি ব্যাপক হারে হ্রাস করা সম্ভব হতো, তাহলে হয়তো বাজেটকে ব্যতিক্রমী বলা বেশি যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সে রকম কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ না রেখে শুধু বাজেটের আকার সামান্য হ্রাস করার কারণে বাজেটকে ব্যতিক্রমী দাবি করা কঠিন।
অর্থ উপদেষ্টা আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন, যা চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা কম। এবারের বাজেট বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২.৭%। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯%। বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দই রাখা হয়েছে পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের জন্য, যার পরিমাণ ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ যে পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তার পুরোটাই চলে যাবে পরিচালনা ব্যয় মেটানোর জন্য। বরং যেভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এবং পরিচালনা ব্যয় বাজেটে রাখা হয়েছে, তাতে যদি রাজস্ব বাজেটে ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কেননা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একেবারেই অনিশ্চিত একটি বিষয়।
অতীতে কখনই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, উল্টো সব সময়ই ঘাটতি থেকেছে এবং কোনো কোনো বছর এই ঘাটতির পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধিও পায়। পক্ষান্তরে পরিচালনা ব্যয় মোটামুটি নিশ্চিত একটি বিষয়। পরিচালনা ব্যয় মূলত বেতন-ভাতা প্রদান এবং ঋণের ওপর সুদ পরিশোধ করতে শেষ হয়ে যায়। এই দুটো অত্যাবশ্যক ব্যয় সরকারকে মেটাতেই হবে এবং এই ব্যয়ের জন্য সরকার রাজস্ব আদায়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ এবং পরিচালনা ব্যয় যেহেতু প্রায় সমান। তাই যতটুকু রাজস্ব আদায় কম হবে, ঠিক তটটুকুই রাজস্ব বাজেটে ঘাটতি হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই খাতে কিছুটা বাফার রেখে রাজস্ব আদায় এবং পরিচালনা ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধানটা একটু বেশি রাখতে পারলে ভালো হতো।
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬%। খালি চোখে দেখলে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো অবস্থা। বাজেট ঘাটতি দেশের জিডিপির মাত্র ৩.৬%। এর চেয়ে ভালো অবস্থা আর কী হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মোট বাজেটের আকারই যেখানে জিডিপির ১২,৭%, সেখানে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬%, যা নিশ্চয়ই আত্মতুষ্টির মতো বিষয় হতে পারে না। যদি বাজেটের আকার জিডিপির ২৫ থেকে ৩০% হতো, তখন বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬% একটা খুশির খবর হতে পারত। এখন যে অবস্থা, তাতে মোট বাজেটের ৩০% ঘাটতি। এবারের বাজেটে উন্নয়ন বাজেটের আকার রাখা হয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বাজেট থেকে খুব বেশি হ্রাস করা হয়েছে, তা বলা যাবে না। বাজেটের এই তথ্যগুলো যদি আগের কয়েকটি বাজেটের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন বা ব্যতিক্রম কিছুই নেই। বরং বলা যেতে পারে যে আগের কয়েকটি বাজেটের ধারাবাহিকতাই রক্ষা হয়েছে এবারের বাজেটে। অবশ্য আমাদের দেশের বাজেটের ধরনই এ রকম। সব সময়ই প্রস্তাবিত বাজেটে আগের বাজেটের ধারাবাহিকতায় তৈরি করা হয়েছে।
বাজেট প্রণয়নের আগে যতটুকু আলোচনা সংবাদ মাধ্যমে এসেছিল তাতে একটা ধারণা হয়েছিল যে এবারের বাজেটে যথেষ্ট কাটছাঁট হতে পারে। বাজেট ঘোষণার পর দেখা গেল যে সে রকম বড় মাপের কাটছাঁট হয়নি। মোট বাজেট বরাদ্দের দিক থেকে তো সেই মাত্রার সংকোচন নেই বললেই চলে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের পরিমাণ ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা কম। কিন্তু বাজেটে কাটছাঁটের হিসাবটি অন্যত্র। আমরা লক্ষ করেছি যে প্রতিবছরই বাজেট বরাদ্দ সাধারণত ৫০ হাজার কোটি টাকা থেকে এক লাখ কোটি টাকা বৃদ্ধি হয়ে থাকে এবং এভাবে প্রতিবছর বৃদ্ধি পেয়েই বাজেটের আকার প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সেই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরেই বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। সেটা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে এবং এটাই মূলত প্রস্তাবিত বাজেটের বড় কাটছাঁট হিসেবে গণ্য হবে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা জনগণের জীবনমান উন্নয়নের কথা বলেছেন। এমনকি তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে এবারের বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর ওপরে মানুষকে স্থান দেওয়া হয়েছে। সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতি চমৎকার মন্তব্য। কিন্তু অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমেই মানুষের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব। বেশি বেশি অবকাঠামো নির্মাণের অর্থই হচ্ছে বেশি বেশি বিনিয়োগ। আর বেশি বেশি বিনিয়োগ মানেই বেশি বেশি কর্মসংস্থান। অর্থনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে যে উন্নতি করতে হলে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তারপরও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নীতি বা ফিসক্যাল পলিসি সেভাবে বাজেটে লক্ষ করলাম না। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে পারে সে রকম কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাজেটে দেখিনি।
এ কথা ঠিক যে বাজেটের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ খুব কম। এজন্য প্রয়োজন মুদ্রানীতি, যা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করে থাকে। কিন্তু বাজেটে যদি পর্যাপ্ত সুযোগ বা স্কোপ না থাকে, তাহলে মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এমন পদক্ষেপ বাজেটে সেভাবে নেই। এ কথা অনস্বীকার্য যে সরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ খুবই সীমিত। বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের মতো নতুন প্রজেক্ট হাতে নিলে কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া সরকারি খাতে সেভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় বেসরকারি খাতে। আর বেসরকারি খাতে যত বেশি গতি আসবে এবং যত বেশি বিনিয়োগ হবে, তত বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ কারণেই আধুনিক বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার জন্য বিশেষ কিছু ফিসক্যাল পলিসি নেওয়া হয়, যা প্রস্তাবিত বাজেটে সেভাবে নেই।
প্রস্তাবিত বাজেটের একটা ভালো দিক হচ্ছে যে এখানে জনভোগান্তি সৃষ্টি করতে পারে সে রকম কোনো ফিসক্যাল-বহির্ভূত পদক্ষেপ নেই। আগের বাজেটে কখনও বিশেষ কিছু সেবা গ্রহণের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা, বাধ্যতামূলক আবগারি শুল্ক বা এরকম কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ মানুষকে অহেতুক ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সে রকম কোনো পদক্ষেপ প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। এখন পর্যন্ত আমি অন্তত দেখিনি। এ ছাড়া এই বাজেট থেকে জনগণ যে খুব বেশি লাভবান হবে বা স্বস্তি পাবে এমন আশা করা কঠিন। আসলে বাজেট প্রণয়ন করা হয় জনগণের কথা বলে, অথচ সেই জনগণই বাজেট থেকে কোনো রকম সুবিধা পায় না। উল্টো প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার পর জনগণই প্রথম ক্ষতির মুখে পড়ে। কখনও বেশি কর দিতে হয়, আবার কখনও দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। তাই বাজেট থেকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা জনগণ একরকম ছেড়েই দিয়েছে।
বর্তমান সময় বাজেট প্রণয়নের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। দেশের অভ্যন্তরে এখনও রাজনৈতিক আস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি নেই। বিদেশি বিনিয়োগে যেমন ভাটা, তেমনি দেশি বিনিয়োগও সেভাবে হচ্ছে না। দেশের ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজারের অবস্থা মোটেই বিনিয়োগবান্ধব নয়। এর ওপর আছে আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা। বিশেষ করে ট্রাম্পের সৃষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধের এখনও সেভাগে সুরাহা হয়নি। এ রকম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে এবং নানামুখী চ্যালেঞ্জের মাঝে অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাজেট প্রণয়ন যারপরনাই কঠিন কাজ। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা কাজটা করতে পেরেছেন, সেটাই বড় কথা।